ঢাকা, রবিবার , ১৯ আগস্ট ২০১৮, | ৪ ভাদ্র ১৪২৫ | ৭ জিলহজ্জ ১৪৩৯

অসহিষ্ণু অনলাইন এবং কিছু রুঢ় বাস্তবতা

অনলাইন অসহিষ্ণুতায় জীবননাশের হুমকির মত বিষয়গুলা খুব সাধারণ হয়ে উঠেছে সমসাময়িক বাংলাদেশে। যা রুঢ় বাস্তবতা হয়েই ধরা দিয়েছে।। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক/ ধর্মীয় গোঁড়ামি কেই এর মুল কারন হিসেবে ধরা যেতে পারে। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক বলা হলেও  মূল্যবোধ এখনো অনেকটা সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামিতে পরে আছে । সমসাময়িক অনেক ব্লগার হত্যাকান্ড, প্রকাশক শাজাহান বাচ্চু ও অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা এই দিকপ্রকৃতিকেই নির্দেশ করে। তদন্ত হচ্ছে ঠিকই তবে অনেক ঘটনাই ইতিমধ্যে চাপা পড়ে গেছে। আর আক্রান্ত হয়েও বেঁচে যাওয়ারা হয় নিরবে দেশ ছাড়ছে কিংবা অনেকটাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। রাষ্ট্রের সুরক্ষা এক্ষেত্রে অনেকটাই অকার্যকর। না প্রশাসনিক ভাবে না সামাজিক ভাবে।

নিষিদ্ধ ঘোষিত জে এম বি সহ লুকিয়ে থাকা আরও উগ্র ধর্মীয় সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে। সাধারনভাবে বাক্মুক্তি অথবা মতামতের প্রকাশের অধিকার আইনিভাবে থাকলেও জনমনে এর গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অথবা ধর্মীয় সহিংসতা বলতে মুসলমানদের হিন্দুদের উপর নির্যাতনের  ধরনকেই বলা হোতো। এর নতুন সংসর্গ হয়ে দাড়িয়েছে অনলাইনে ভিন্ন চিন্তার ওপর সরাসরি আঘাত। আর রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুর ব্যবস্থার কারনে কেউ পালিয়ে যাচ্ছে আবার কেউ নীরবেই নির্যাতনের সহ্য করে যাচ্ছে । তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এভাবে কাউকে হুমকি দিয়ে খুন করা খুব  সচারচর চোখে পরছে । এর মধ্যে গত সপ্তাহে প্রকাশ হওয়া “বাশেরকেল্লা যাত্রাবাড়ী” নামক একটা ফেসবুক পেজে ছিল দেশিও অস্ত্র হাতে মুক্ত চিন্তার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে হত্যার হুমকির বিষয়টা।

সেই পাবলিক পোষ্ট যাদের কে টার্গেট করে লেখা হয়েছিল তারা হলেন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির  ফাইনাল ইয়ার ফাইন আর্টস এর ছাত্রী তন্দ্রা , ইউল্যাব ইকনমিক্সের এর সিহান , সিটি ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের প্রাক্তন ছাত্র সফিকুল  ইসলাম এবং ইউ আই ইউ এর মার্কেটিং সাদ্দাম।

এদের অধিকাংশই সক্রিয় / অসক্রিয়ভাবে গণজাগরণমঞ্চের সাথে জড়িত ছিল।  কেমন আছে তারা? দেশে আছে কি? চেষ্টা করেছি তাদের সঙ্গে যোগাযোগের। জেনেছি এদের কয়েকজন দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন। আর কয়েকজন দেশে  আছেন তবে অনেকটা পালিয়ে থাকার মত।

এখন এভাবে চলছে।  শিক্ষিত প্রথাবিরোধী যুবকদের এক অংশের মেধা ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সমর্থন না পেয়ে। যদিও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশে এমনটি হওয়ার কথা ছিলনা। দেশের রাজনীতি-অর্থনতী দিন দিন যেন এক অপ্রস্তুত সমাজের কাছে চলে যাচ্ছে। যে সমাজ এ দেশ চালানোর জন্য প্রস্তুত না। বরং যারা দেশটাকে চালাতে পারত তারাই দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ২০১৪ তে সিটি ইউনিভারসিটি ইংরেজি সাহিত্যর ছাত্র সফিকের করা প্রজেক্ট ‘ক্লিনিং ঢাকা’ দেশজুড়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আজ সে দেশে থাকলে দেশ পরিচ্ছন্নতার দিকে আরো এগুতে পারত নিঃসন্দেহে বলা যায়। অনলাইন অিসহিষ্ণুতার ধ্বংসাত্মক প্রয়োগে সে সম্ভাবনার বিনাশ ঘটেছে।

বাংলাদেশ আজ সেই সংকটে পড়েছে  যেমন করে আমেরিকার উত্থানকালে ইউরোপ পরেছিল।। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারনে অনেক প্রটেস্ট্যান্টরা পারি জমিয়েছিলেন অ্যামেরিকাতে ১৭ শতাব্দিতে , আর তাদের হাত ধরেই রাইজ অফ অ্যামেরিকা অথবা আমেরিকার উত্থান হয়। আর এদের অভাবটাও ইউরোপ বিশ্ব যুদ্ধয়ের সময় টের পেয়েছিল ।

ভিন্ন চিন্তার মানুষদের সমাজ থেকে ফেলে দিয়ে সমাজ করা জায়না কারন ভিন্ন চিন্তাই সমাজ সংস্কার করে , যেমন ভিন্ন চিন্তার কারনেই সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়েছিল আর ভিন্ন চিন্তাই ভারতে শিক্ষা ব্যাবস্থার প্রবর্তন করেছিল। ভিন্ন চিন্তাই বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল । অনলাইন অসহিষ্ণুতায় ভিন্ন চিন্তার বিকাশ রুদ্ধ না হোক। আইনি ব্যবস্থার উন্নতি ও কঠোর প্রয়োগ করে সরকারের উচিত এ ধরনের আগ্রাসন থেকে সৃজনশীল তরুন সমাজের  জীবন নিশ্চিত করা।

(লেখা লেখকের নিজস্ব অভিমত।)

লেখক : স্বপন মৃধা, সাবেক প্রগতিশীল ছাত্রনেতা ও ব্যবসায়ী


%d bloggers like this: