ঢাকা, বুধবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ | ২৫ রবিউল-আউয়াল ১৪৩৯

এমন দৃশ্য আমরা আকাঙ্খা করি না

গোঁসাই পাহ্লভী
গোঁসাই পাহ্লভী : বাহাত্তর সালের সংবিধানও রচিত হয়েছিলো বিরোধীদল ছাড়া। সুতরাং রাজনীতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে অভেদ রচিত হলো এবং জনগণ কেবল প্রজাবিশেষ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সূচনা হলো। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে । হত্যার কারণ কি? সোজা কথায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। এবং ধর্মকে কাজে লাগিয়ে এখানকার বাঙালিকে মুসলমান বানিয়ে ফেলা। এখানকার বাঙালিরা মুসলমান হলো এবং মুসলমানের পক্ষ-বিপক্ষও সৃষ্টি হলো। আওয়ামী লীগ আজকে যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগ মুসলমানদের এই পক্ষ-বিপক্ষের মুখোমুখি। তাহলে একটা প্রশ্ন সতত দাঁড়িয়ে যাবে,আওয়ামী লীগের অবস্থান কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে বঙ্গবন্ধুর,‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!’ —এই বাক্যে । এখানে ‘আমাদের’ বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন। বলেছেন, ‘এই বাঙলায় হিন্দু-মুসলমান-বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই।’ ভাষণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখানকার লোকজনদেরকে বাঙালি, জনগণ এবং মানুষ দিয়ে বুঝিয়েছেন। বলেছেন, ‘এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।’
আওয়ামী লীগ কখনো একাত্তরে ধর্মীয় আইডেনটিটির উপরে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করেনি। আওয়ামী লীগ সংস্কৃতিকে তার আইডেনটিটি ধার্য করে দিয়েছে। সেই সংস্কৃতির ধারা-উপধারা আছে, সে বিষয়ে পরবর্তীতে কোথাও বলা যাবে। মূলত, এখানকার মুসলমানদের অনেকগুলো পক্ষ আছে। সব পক্ষকে সব পক্ষ চেনেও না, এমনও উদাহরণ আছে। এমন একটা পক্ষ আছে যাদের গুরু মুসলমান। কিন্তু শিষ্যকূলের সংখ্যাগরিষ্ঠই হিন্দুধর্মাবলম্বী। ধর্ম কতোটা উদার হলে রমেশ শীল মাইজভাণ্ডারের ভক্ত হন, সেটা মর্মে অনুধাবনের বিষয়। যা হোক, মোটাদাগে মুসলমানদের মধ্যে দুটি পক্ষ।
একটি পক্ষ আব্বাসীয় উমাইয়া খেলাফতে ইসলামের মধ্যে দিয়ে আওরঙ্গজেবের আমল থেকে ধীরে ধীরে রসদ নিয়ে ওহাবি আন্দোলন হয়ে ৪৬ এর দাঙ্গা এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে পলিটিক্যাল ইসলাম আকারে হাজির। এই যে ভারতবর্ষ হয়ে পাকিস্তান পর্ব, এবং বাঙলাদেশে পলিটিক্যাল ইসলামের যে চেহারা বাঙলাদেশ পর্বের বাইরে, এই পলিটিক্যাল ইসলামকে কখনোই মুসলমানদের দ্বারা ফেস হতে হয়নি। অর্থাৎ মুসলমানদের মধ্যে থেকে পলিটিক্যাল ইসলামের এই স্প্রিটের মুখোমুখি হতে হয়নি। রাজনীতিতে ওহাবি আন্দোলনের বাইরে মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসাবে কারা ছিলো, এই তথ্যকে বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে যে লাহোর প্রস্তাব কিছুটা খোলাশা করেছে। এরপর দ্বিজাতি তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে মুসলমানরা পলিটিক্যালি অনেক বেশি ভিজ্যুয়াল। ফলে দ্বিজাতি তত্ত্বের রাজনীতি এখানকার পলিটিক্যাল ইসলামকে আবার মুসলমানদের কাছে ভিন্নভাবে হাজির করলো। এখানেও পলিটিক্যাল ইসলামের বিরোধীতার লক্ষণগুলোকে সুপ্ত থাকতে হলো।
পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব বাঙলা যখন পূর্ব পাকিস্তান হলো তখনই ধীরে ধীরে পলিটিক্যাল ইসলামের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের একটা বোঝাপড়ার পিরিয়ড শুরু হয়ে গেলো। দেখা যাচ্ছে যুক্তির বদলে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এবং দেখা গেল যে, সেই ঘটনা থেকে একটা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। উনিশশো একাত্তর সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মোটাদাগে এভাবে বলা যায় যে, যুদ্ধটা ছিলো আসলে পলিটিক্যাল ইসলামের সাথে মুসলমানদের লড়াই। যে মুসলমানদের সাথে বাঙালীর সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। যে লড়াই পাকিস্তান পিরিয়ডে আত্মপ্রকাশ করেছে, অথচ অবিভক্ত ভারতে কিন্তু এই প্রশ্নটা দেখা দেয় নাই। ফলে আজকে বাংলাদেশে পলিটিক্যাল ইসলাম এবং মুসলমান এই দু’টি পক্ষই আছে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী শক্তি আজ এই দুই পক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই দুই পক্ষের ভেতরকার লড়াই-সংগ্রাম আছে। সেদিকে আমরা যেতে পারবো না। তবে এটা ঠিক যে, এখানকার জাতিয়তাবাদী শক্তি পলিটিক্যাল ইসলাম এবং মুসলমানদের মধ্যকার যে বাহাস, সেই বাহাসের ক্যারেক্টারকে বুঝতে পারেন নাই। এবং নিজেদের প্রয়োজনে পলিটিক্যাল ইসলামের তত্ত্ব নিজেদের ভেতর আত্মিকরণের ফলে এই দুই ধারার তর্কটা জমেনি।
পূর্বেই যদি জাতিয়তাবাদী শক্তি এই দুই ধারার ভেতর তর্কের ধারাটাকে নিজেদের গতির মধ্যে দিয়ে ফেস হতে দিতো, তাহলে পলিটিক্যাল ইসলাম রাষ্ট্রের দিকে তাকানোর সুযোগ এতো দ্রুত পেতো না। এবং যখন সে রাষ্ট্রের দিকে তাকাতো, তখন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের দিকেও যদি তাদের অভিপ্রায় হতো, তাহলে জাতিয়তাবাদী শক্তিকে পলিটিক্যাল ইসলামের সাথে কথা বলতে ততোটা বেগপেতে হতো না। কারণ, ইতমধ্যে জাতিয়তাবাদি শক্তি পলিটিক্যাল ইসলামকে আত্মিকরণ করেছে, একটা পকেট হিসাবে গ্রহণ করেছে। ফলে সে তখন তার এই আত্মিকরণকে কাজে লাগিয়ে একপ্রকার ডায়লগ প্রচলন করতে পারতো, ঘটনাটা এভাবে ঘটেনি। ফলে পলিটিক্যাল ইসলাম আজ জাতিয়তাবাদী শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে এখানকার যে মুসলমানতত্ত্ব, সেটা নানানভাবেই নিজেদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে জাতিয়তাবাদী শক্তিকে সাহায্য সহযোগীতা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সামনে এই দুই ধারার মধ্যে ব্যালেন্স রেখে, পলিটিক্যাল ইসলামকে মোকাবেলা করা সত্যিই অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়।
শুরুতেই বলেছি যে, বাহাত্তরের সংবিধান বিরোধীদলহীন অবস্থায় বানানো হয়েছে। বর্তমানে বিরোধীদল হিসাবে যারা সংসদে আছেন, তাদের বিষয়ে জনগণ ভালো বোঝে। সরকার বিরোধীদলহীন অবস্থায় থাকায়, রাষ্ট্রকে টার্গেট করতে বেশি বেগ পেতে হয় না। ফলে রাষ্ট্র টার্গেট হয়েছে বহুবার। স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রের কর্তারাও তাতে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা যেটা বলতে চাইছি , আওয়ামী লীগের জন্যে এমনকি বাঙলাদেশের জন্যেও আজ সব থেকে বেশি প্রয়োজন একটি বিরোধী দল। বিরোধী দলেরও টার্গেট থাকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং সরকারী দলকে আঘাত করা। কিন্তু সেই আঘাত যতটাই মাত্রাক্রস করুক না কেন পলিটিক্যাল ইসলামের নামে আত্মঘাতি হয়ে হাজির হয় না। পলিটিক্যাল ইসলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এক দিকে পেট্রন হয়েছে অন্য দিকে আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু এবং ব্যানড হয়েছে। ফলে মতামত এবং বাকস্বাধীনতার পথ রুদ্ধ হয়ে আত্মঘাতিতে পর্যবেশিত হয়েছে। বাঙলাদেশেও তাই পলিটিক্যাল ইসলাম যুগপৎ আত্মঘাতির মধ্যে দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার তৎপরতা চালাচ্ছে। মনে রাখতে হবে যে, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক আফগানিস্তান যুদ্ধ, এখানকার পলিটিক্যাল ইসলামকেই কেবল আন্দোলিত করেছে এমন নয়, মুসলমানদের মনের বৃহৎ ক্ষত সৃষ্টি করছে। সুতরাং পলিটিক্যাল ইসলাম এখানে মুসলমানদের কাছে নিজেদেরকে আফগানিস্তানের প্রেক্ষিতে যখন হাজির করে, তখন সেটা এখানকার বাঙালী মুসলমানকেও কিছুটা হিপনোটাইজ করে। ফলে এই পক্ষের প্রতি ধীরেধীরে মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের টলারেন্সি সৃষ্টি হচ্ছে। কিছুটা দরদও প্রকাশ পাচ্ছে। এভাবেই পলিটিক্যাল ইসলামের এক্টিভিটিস বাড়ছে। আপনারা আওয়ামীলীগের শাসনামল যদি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে দেখবেন যে, তারা শুরুতে পলিটিক্যাল ইসলাম এবং কমিউনিস্টদের দ্বারা প্রতিরোধের স্বীকার হয়েছে। পচাত্তর পরবর্তী পলিটিক্যাল ইসলামিক মিলেটেরি ফোর্স দ্বারা, এবং নব্বইয়ের পরে এখন পর্যন্ত লীগের বিরোধীতার ইতিহাস পলিটিক্যাল ইসলামের বিরোধীতা। বর্তমানেও এর ব্যতিক্রম নয়। যুদ্ধাপরাধ এবং নানান ইস্যুতে আওয়ামীলীগের বিরোধীতার মাত্রা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসছে পলিটিক্যাল ইসলামের দপ্তর থেকে। এই বিরোধীতা আত্মঘাতির বিরোধীতা।
ফলে বিরোধী দল হিসাবে আত্মঘাতি পলিটিক্যাল ইসলাম আওয়ামী লীগের মুখোমুখি দাঁড়ানোর পূর্বেই আওয়ামী লীগের উচিৎ দ্রুত নির্বাচন দিয়ে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারী বা বিরোধী দল সৃষ্টি করা। অন্যথায় এই ভ্যাকুমে আত্মঘাতি পলিটিক্যাল ইসলাম বিরোধী দল হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলে রাষ্ট্র, সরকার, জনগণ এবং লীগ সকলের জন্যেই একটা দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের সূত্রপাত হবে। ফলে ওয়ার অন টেরর থিউরি যদি এখানে প্রয়োগ হওয়া শুরু হয়, তাহলে প্রথমে দু’টি গ্রুপে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ চলবে,  পরে, ধীরে ধীরে একটা পক্ষ সৃষ্টি হয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে পলিটিক্যাল ইসলাম, জাতিয়তাবাদী শক্তি এবং মুসলমান তত্ত্ব সকলকেই এককাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধটা করে যেতে বাধ্য হবে। এমন দৃশ্য আমরা আকাঙ্খা করি না।
আজ/জিপি/৩০২
  • রাফসান গালিব

    “এখানে ‘আমাদের’ বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন। বলেছেন, ‘এই বাঙলায় হিন্দু-মুসলমান-বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই।’”

    সেই ‘নন-বাঙ্গালি’দেরই তিনি আবার বলেছিলেন – ‘বাঙ্গালি হয়ে যাও’

  • Pingback: এমন দৃশ্য আমরা আকাঙ্ক্ষা করি না – The School of Gonshai Pahlavi()