ঢাকা, শনিবার , ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, | ৮ আশ্বিন ১৪২৪ | ২ মুহাররম ১৪৩৯

কায়েমী স্বার্থান্বেষী ছাড়া সবাই কওমী সনদের স্বীকৃতি চান |ইয়াহইয়া মাহমুদ

sikriti

প্রিয় গণমাধ্যমকর্মীবৃন্দ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এ যুগে ও বার বার প্রমাণিত হয়েছে যে, নীতি- নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা দ্বারা মানুষ কখনো প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। পক্ষান্তরে এ কথা জলন্ত সত্য যে, সুযোগ্য প্রশিক্ষকের মাধ্যমে ওয়াহি লব্ধ জ্ঞানের স্পর্শেই কেবল একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে সক্ষম। তাই তো এই মিশন দিয়েই পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রসূল। মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের মাধ্যমে এই মিশন পূর্ণতা লাভ করেছে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক পিয়ারে হাবিব রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যক্ষ পরিচর্যায় নববী উদ্যান থেকে আসহাবে রাসূল নামক ফুটন্ত ফুলগুলো ঐ আদর্শের সুঘ্রাণ নিয়ে সমগ্র বিশ্বকে মাতোয়ারা করে দিয়েছিলেন। ফলে আলোকিত মানুষের এক সৌধ রচিত হয়েছিল প্রত্যন্ত জনপদেও। এ উপমহাদেশও তার ছিটেফোঁটা থেকে বঞ্চিত হয়নি, গুজরাটের সুরাতে এই শিক্ষা ও আদর্শের পাল তুলেই সে মহান জামাতের উপস্থিতি ঘটেছিল এই উপমহাদেশের মানুষকে আলোঝলমল মানুষ বানানোর জন্য। চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে এর ধারাবাহিকতা চলে আসছিলো অসাম্প্রদায়িক এই মহাদেশে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ব্যবসার নামে আগমন করে সা¤্রাজ্যবাদি শক্তি ব্রিটিশের কালো থাবায় ও আগ্রাসনে উপমহাদেশের তাহযীব তামাদ্দুন, সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ও আদর্শ সবই ভেঙে পড়েছিল এমন কি সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বীজও তারা বপণ করে দিয়েছিলো প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে। তখন ধর্ম, দেশ ও জাতি রক্ষার নিমিত্তে ১৮৬৬ সালে ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সূচনা হয় কওমী মাদরাসা শিক্ষার। ব্রিটিশ বেনিয়াদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো এই কওমী মাদরাসার উত্তরসূরীরা। দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি বাঁচানোর আন্দোলনে কওমী মাদরাসার অবদানের কথা ইতিহাস সচেতন যে কেউ মানতে বাধ্য।

প্রিয় সংবাদিক বন্ধুগণ
শত্রুদের রাহুগ্রাস থেকে উপমহাদেশকে মুক্ত করার জন্য হক্কানী উলামায়ে কেরাম যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, জীবন ও সর্বস্ব বিলীন করে মাতৃভূমি রক্ষা করেছিলেন। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মানবতাবিরোধী সন্ত্রাস, জঙ্গিাবাদ ও মওদুদীবাদ মুক্ত রাখতে দেশের হক্কানী উলামায়ে কেরাম অতন্দ্র প্রহরীর মতো যে সংগ্রামি ভূমিকা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন তা জাতির সামনে স্পষ্ট, দেশ প্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনে এ শিক্ষার বিকল্প নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধে কওমী অঙ্গনের অনেকে অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সুতরাং দেশ গঠন, সমাজ বিনির্মাণ ও সুনাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কওমী মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

শ্রদ্ধেয় সাংবাদিকবৃন্দ
আজ দেশজুড়ে পনের হাজারেরও অধিক কওমী মাদরাসা বিদ্যমান। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসব মাদরাসাগুলো থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশ বিদেশে বিভিন্ন সেবা ও পেশায় নিয়োজিত হন। বিশেষত দেশের লক্ষ লক্ষ মসজিদসহ ধর্মীয় সেক্টরে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় হলো যে, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পরেও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত এসব সুনাগরিক রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় শিক্ষিত মানুষের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। ফলে এত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ও যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও এক দিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অনেক ক্ষেত্রে সেবাদান থেকে তারা হচ্ছেন বঞ্চিত অপর দিকে দেশও অনেক যোগ্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় হচ্ছে ব্যর্থ। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রাজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন ‘কওমী মাদরাসা শিক্ষাসনদের মান’ আদায়ের জন্য।
অনেক চড়াই উৎরাইয়ের পর ১১ আগস্ট ২০১৬ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার আয়োজনে একলক্ষ আলিম, মুফতি ও ইমামের স্বাক্ষরসম্বলিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী শান্তি ফতওয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে অর্পণ উপলক্ষে উলামা সম্মেলনে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ-এর আহ্বানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমী মাদরাসা শিক্ষাসনদের স্বীকৃতিদানের যে আশ্বাস ব্যক্ত করেছেন তাতে কওমী শিক্ষাঙ্গণে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। স্বীকৃতি প্রদানের আশ্বাস ব্যক্ত করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

প্রিয় সংবাদকর্মীবৃন্দ
কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে দারুল উলূম দেওবন্দের আট মূলনীতির উপর ভিত্তি করে স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে ‘কওমী শিক্ষাসনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর দাবিসমুহ নিম্নরুপ।
এক. কওমি মাদরসাার নেসাব ও নেযামে তালীমে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
দুই. আহলে সুন্নাহত ওয়াল জামায়াতের আকিদা সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণœ রাখতে হবে।
তিন. মাদরাসার পরিচালনা পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
চার. কওমি মাদরাসা কখনও এমপিওভুক্ত হবে না।
পাঁচ. কোনো মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এতদসংক্রান্ত নীতিমালা প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কমিটি প্রণয়ন করবে।
ছয়. প্রচলিত কওমি মাদরাসা বোর্ডসমূহ তাদের স্ব-স্ব বিধান অনুযায়ি পরিচালিত হবে।
সাত. ২০১৬ সালের ভেতরই স্বীকৃতিদান কার্যক্রম সুসম্পন্ন করতে হবে।

বন্ধুগণ
শিক্ষার মান না দিয়ে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। একটি নতুন বাংলাদেশ পেতে যুদ্ধ করা হয়েছিলো নাগরিকের অধিকার আদায়ের জন্যই। সুতরাং লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলা চলবে না। কতিপয় লোক রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে স্বীকৃতির বিরোধিতা করে চলেছে। তাদেরকে আমরা হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, অসতদুদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি অগ্রসর জাতির ভাগ্য উন্নয়নে বাঁধা হলে- এর পরিণাম ভালো হবে না। মূলত মওদুদীবাদি ও তাদের দোসররাই কওমী স্বীকৃতির বিরোধিতায় তৎপর।
আলহামদুলিল্লাহ! সারা দেশের প্রায় সব জেলাতেই আমরা গণসংযোগ করেছি, স্বীকৃতির পক্ষে গণজোয়ার দেখে আমরা অভিভূত। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ময়মনিসংহ, ঢাকা ও রাজশাহীর নব্বই ভাগ কওমী মাদরাসা ও এর দায়িত্বশীলগণ সনদের স্বীকৃতি চান। ইতোমধ্যে সিলেট এদ্বারা, চট্টগ্রামের আঞ্জুমান ইত্তিহাদুল মাদারিস, উত্তরবঙ্গের তানযীমুল মাদারেস, গওহারডাঙ্গা বোর্ড স্বীকৃতির পক্ষে জোরদার সমর্থন জানিয়েছে এবং এই সংগ্রামে শরীক হয়েছেন। অলিকূল শিরোমনি হযরত মাওলানা আহমদ শফী দা.বাও বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, আমি সনদের স্বীকৃতির প্রয়োজন অস্বীকার করি না।
আপনারা জানেন, কায়েমী কিছু স্বার্থান্বেষী জামাত-শিবিরের অনুসারী ষড়যন্ত্রকারী সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুযুর্গ হযরত আহমদ শফী দা.-এর নামে নামের ছদ্মাবরণে বেফাকের নাম ভাঙিয়ে কওমী মাদরাসা সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে হীন ষড়যন্ত্র করে চলেছে। আমরা এই ষড়যন্ত্রকারীদের স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি প্রয়োজনে আমরা এই স্বার্থান্বেষীদের বাদ দিয়ে বেফাকের কমিটি পুনঃগঠিত করবো এবং সকলকে নিয়ে এগিয়ে যাবো। এই স্বীকৃতির দাবি বাস্তবায়ন করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।
বেশক’টি জায়গায় স্বীকৃতির বিরোধিতা করতে যেয়ে বিব্রত অবস্থায় পড়েছেন চক্রান্তকারীরা। ষড়যন্ত্রকারীদের এই ষড়যন্ত্র থেকে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।
কারো চোখ রাঙ্গানিকে পরওয়া না করে এ দেশের কওমী শিক্ষার্থীদের অধিকারটুকু সরকারকে বাস্তবায়ন করতেই হবে। এ বিষয়ে কোনো টালবাহানা জাতি সহ্য করবে না।

কর্মসূচি
আজকের সংবাদ সম্মেলন থেকে আমরা স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষে আগামী দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করছি-
ক. সনদের স্বীকৃতি আদায়ে জনমত তৈরির জন্য কওমী মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ।
খ. আগামীতে রাজধানীতে সেমিনার ও একটি মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ. রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি।

সম্মানিত গণমাধ্যমকর্মীবৃন্দ
সংবাদকর্মীগণ সবসময় মানবতার পক্ষে কথা বলেন। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করেন আপনারা। দেশের এই লাখো লাখো শিক্ষার্থীদের এই অধিকার আদায়েও আপনারা সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও সহযোগী। আমরা আশা করবো, স্বীকৃতি আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত আপনাদের কলমের সহযোগিতা চাই। এ দেশের সবধরনের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সহযোগি আপনারা। কওমী মাদরাসা শিক্ষাসনদের বাস্তবায়নেও আপনাদের সহযোগিতা একান্তভাবেকাম্য।
কষ্ট স্বীকার করেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ওয়া আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

—————————————————-
ইয়াহইয়া মাহমুদ
সদস্য সচিব, কওমী শিক্ষাসনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদ
শাইখুল হাদিস ও মুহতামিম, জামিআ আজমিয়া দারুল উলূম রামপুরা, ঢাকা