ঢাকা, সোমবার , ২৫ জুন ২০১৮, | ১১ আষাঢ় ১৪২৫ | ১০ শাওয়াল ১৪৩৯

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৬

আরিফ রহমান ● পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন সর্ম্পকে লক্ষ বীরাঙ্গনাদের মাঝে প্রথম যে বীরাঙ্গনা পৃথিবীর সামনে মুখ খোলেন তার নাম ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তিনি আশা করেছিলেন; তার দেখা-দেখি হয়তো অনেকেই মুখ খুলবেন কিন্তু তিনি তেমন কাউকেই আজও পাশে পাননি।

১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া একুশে পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আজ লক্ষ লক্ষ আমি আর আমাদের আম্মা। শাহাবাগের নাম যিনি দিয়েছিলেন- ‘প্রজন্ম চত্বর’। যিনি কপালে লাল টকটকে টিপ দিয়ে সবুজের ভেতর লাল বৃত্তকে ধারণ করে আছেন সারাটা জীবন। যার জীবনের সাথে মিশে আছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, মিশে আছে বীরাঙ্গনাদের দুর্বিষহ জীবনগাঁথা।

আম্মাই প্রথম বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন- “যুদ্ধের শিকার হয়েছে যে নারী তার তো নিজের কোনো লজ্জা নেই।”

প্রখ্যাত ব্লগার সুব্রত শুভ এবং ফড়িং ক্যামেলিয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আম্মা তাঁর ওপর পাক বাহিনীর নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ বয়ান দিয়েছেন। আজকের দিনের ছেলে মেয়েদের ঘটনাগুলো জানা দরকার, খুবই দরকার।

আরিফ রহমান এবং ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ০৪ FERDOUSI-PRIYABHASHINI

সেই সাক্ষাৎকারের কিছুটা সম্পাদনা করলাম। সম্ভব হলে পড়বেন। আমাদের এত রাগ ক্রোধের উৎস সরাসরি শুনুন আম্মার মুখেই-

“পাকিস্তানি সৈন্যরা কতো তারিখে আমার বাসায় এসেছিলো তা আমার মনে নেই কারণ আমি যে ডায়েরিটা লিখতে শুরু করেছিলাম কিন্তু সেটা আমাকে ফেরত দেওয়া হয়নি। তাই আমি মনে করতে পারছি না। তবে সম্ভবত এটা অক্টোবরের প্রথম দিকে হয়েছিলো। ২৮ ঘণ্টা বন্দি ছিলাম ক্যাম্পে।

আমার বাসায় একটা মেয়ে আমাকে দেখাশোনা করার জন্য থাকতো। রাত তিনটার সময় সে বলছে; আপা আপনার বাড়ি একদম ঘেরাও। ছয় সাতটা গাড়ির সাথে পাঞ্জাবি ও পাকিস্তানিরা এসে আমার বাসা ঘিরে ফেলেছে। আমার ভীষণ ঘুম আসছিলো তাই আমি ওকে বলছিলাম; ঘুমা তো, ওরকম অনেক গাড়ি-ই আসে। ও তখন বলল; আরে ওরা চিৎকার করছে, হল্লা করছে, কাকে যেন নামতে বলতেছে। এটা বলার পর আমি চিন্তা করলাম দেখা দরকার। তাই আমি মাথায় কাপড় দিয়ে উঁকি মেরে দেখি; ছয়টা গাড়ি থেকে প্রায় চার পাঁজন করে নেমেছে। আর আমার দিকে তাকিয়ে বলছে আমরা ফেরদৌসীকে চাই। ফেরদৌসী উপর থেকে নামো।

আমি তখন উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তাদের ঠেকাতে চাইলাম; এছাড়া আমার অন্য কোনো পথ নেই। তাই আমি তখন বললাম; ফেরদৌসী তো নেই, সে তো খুলনায় গিয়েছে। আমি তার আয়া। তখন ওখান থেকে একজন বলে উঠলো; তুমিই তো ফেরদৌসী, আমি তোমাকে চিনি। তুমি উপর থেকে নামো। তখন আমি বললাম, কেন নামবো? তখন তারা আমাকে বললো, তোমার নামে ওয়ারেন্ট আছে। একটা হত্যা মামলার ওয়ারেন্ট। আমি তাদের ওয়ারেন্ট দেখাতে বললাম না; কারণ দেখাতে গেলেও তারা উপরে চলে আসবে। তাই তখন আমি বললাম, এতো রাতে কেউ কাউকে অ্যারেস্ট করে না, তোমরা সকালে এসে আমাকে নিয়ে যাও। তখন তারা আমাকে বলে, তোমাকে নামতেই হবে আর যদি না নামো তাহলে আমরা তোমাকে নামিয়ে নেব।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা উপরে চলে আসলো। আর যে ফ্ল্যাটে আমি থাকতাম সেই ফ্ল্যাটের দরজা জানালাও ভাল ছিলো না। কারণ এর আগেও এই ফ্ল্যাট লুট হয়েছিল। পরে আমি তাদের বললাম; আমার সাথে একটা মেয়ে আছে তাকে আমি তার বাড়িতে নামিয়ে দিতে চাই। তখন ভোরের আলো ফুটে উঠছে তাই তারা তখন অর্ধেক সিড়িতে উঠে আবার চলে যায়।

এরপরই আমি আমার কাজের মেয়ে আলেয়াকে দিয়ে আসলাম। কারণ ও আমার সাথে নিরাপদ না। যাই হোক কোনোভাবে আলেয়াকে তার বাড়িতে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হলো।

আরিফ রহমান এবং ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ০১
ছবির মহিলার নাম ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। বীরাঙ্গনা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। এই মহিলাকে আমি ‘মা’ ডাকি। আমার বড় ভাগ্য- এই মহিলার পায়ের কাছে জীবনে একবার হলেও বসতে পেরেছি। এই মহিলাকে আমি ‘মা’ ডাকি, এই মহিলা আমাকে ‘ছেলে’ ডাকেন… আমাদের রক্তের সম্পর্ক নাই, আমাদের সম্পর্ক আত্মার। আমার এই ‘মা’কে যারা ধর্ষণ করলো, ৪৪ বছর বাদেও আমার মা আজও ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন সেই ধর্ষণের কথা বলতে বলতে। শুনতে শুনতে আমিও কাঁদি। আমরা সবাই কাঁদি। পারি না আফ্রিদিদের গুণ গাইতে, পারি না পাকিস্তানের গুণ গাইতে।

পরের দিন পাকিস্তানিরা আবার এসেছে। তারা এসে আমাকে বললো, তুমি নিচে নামো। তখন দেখি সৈন্যদের বেশির ভাগই ড্রাঙ্ক। অনেকে দাঁড়াতেই পারছে না। অনেকেই দরজা ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিলো। আমি দরজা খুলে দেই। আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে বললো। আমি তাদেরকে বললাম আমি আমার ড্রেসটা চেঞ্জ করে আসি, তারপর যাচ্ছি তোমাদের সাথে। তারা আমার কথা না শুনে বললো, “আমরা তোমার ড্রেস চেঞ্জ করে দেব।”

পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে এসেছিলো বেঙ্গল ট্রের্ডাসের ইউসুফ, ওখানকার আগাখানি সম্প্রদায়ের একজন ব্যবসায়ী, ল্যাফটেনেন্ট কোরবান, ক্যাপ্টেন ইউসুফ, ক্যাপ্টেন ইশতেহার। ইশতেহার নামের আরেকজন লোক ছিলো, ইশতেহার ভূঁইয়া। তিনি মাঝেমধ্যে আমার অফিসে আসতেন। ঐ ইশতেহার পরে মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হয়।

তারা আমাকে বলছে; ইশতেহার (দুজনের ভেতর যে এখানে অনুপস্থিত, মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত) হত্যার পেছনে তোমার হাত আছে। আমি বললাম; আমি কীভাবে জানবো সে কীভাবে মরেছে? সে তো রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তখন তারা আমাকে বললো, তুমি জানলে কী করে সে রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করছে? তখন বললাম, আমার জানার কথা না। সেই আমাকে বলেছে। এরপর তারা আমাকে এক ঘণ্টা ধরে গালিগালাজ আর শারীরিক নির্যাতন করে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে চললো। আসলে এগুলো বলতে ইচ্ছে করে না।

..তখন নোয়াপাড়ার ওদিকে যাই তখন হোটেল আল-হেলাল ছিলো। একটা কফির দোকান ছিলো। আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে বললো, কফি খাবে? তখন আমার ভেতরটা কলঙ্কিত তখন আমি নিজের সাথে নিজেই দেখা করতে ভয় পেতাম। অন্ধকারের সাথে দেখা করতেও ভয় পেতাম, আলোর সাথেও দেখা করতে ভয় পেতাম। সবসময় আমার মধ্যে সংকোচ কাজ করতো। পেছনে দাঁড়ানো ছাড়া আর সামনে দাঁড়াতাম না। এমনই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম।

এরপর তারা হুইস্কি কুলি করে আমার মুখে ছিটিয়ে দিচ্ছিলো। আর বলছিলো, “she should co-operate us otherwise puts on dick on her private parts.” এই উক্তিটা আমার এখনো মনে আছে। এই কথাটা বলার সাথে সাথে আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম। তখন আমি বললাম, প্লিজ তোমারা আমাকে একটা উপকার করো, আমি তোমাদেরকে সকল সহযোগিতা দেব। শুধু তোমরা আমাকে হত্যা করো। আমি উর্দুতে একবার, ইংরেজিতে একবার বলেছিলাম; প্লিজ আমাকে হত্যা করো। তোমাদের সকল সহযোগিতা করবো। আমাকে রেপ করো আমার আপত্তি নেই, তবে আমাকে হত্যা করো। তবু আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেও না।

তারপরও তারা আমাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেলো। ওখানে নিয়ে যাওয়ার পর একজন মেজর আসলো। সে এসে বললো, কেসে হে আপ? তারপর আমাকে বললো, শোনা যায় তুমি অফিসার ভূঁইয়াকে হত্যা করেছো।

এই অফিসার ভূঁইয়া আমার বাবার কলেজের কলিগ ছিলো। তিনি হত্যা হয়েছেন আমারই সামনে। দৌলতপুর মোড়ে আপিল উদ্দিন সাহেবের একটা বাড়ি ছিলো। শিল্পপতি ছিলেন। পিস কমিটি করলেও তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। এরকম অনেকেই আছেন; যারা পিস কমিটি করলেও ভাল লোক ছিলেন। আপিল উদ্দিন সাহেব তাদের মধ্যে একজন। তিনি পাকিস্তানি সাপোর্টার কিন্তু বাঙালি হত্যার পক্ষে না। আমি ওনার বাড়ির সামনে থেকে গাড়িতে উঠতাম। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন আপনি দাঁড়িয়ে কেন আপনি আমার বাসায় আসুন। তিনি একা থাকতেন। তার বাড়িতে কেউ থাকতো না কাজের লোক ছাড়া। তিনিও ততোটা থাকতেন না ঐ বাড়িতে তাই দারোয়ানকে আমার কথা বলেছিলেন; ইনি আসলেই গেট খুলে দেবে আর ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দেবে। বহুপথ পাড়ি দিয়ে আমাকে আসতে হতো গাড়িতে ওঠার জন্য। বৃষ্টির সময় গায়ে কাদাও লেগে যেতো। বিশেষ কারণে গেটে একদিন টেলিফোন করতে যাবো; হঠাৎ দেখি আলো জ্বলে উঠলো। একজন মোটরসাইকেল করে আসছিলো আর কালো পোশাক পরিহিত কয়েকজন ছেলে। মনে হয় নকশাল। তারা ভূঁইয়া চাচাকে মেরে দিলো। তখন হঠাৎ বুঝতে পারিনি কাকে মেরেছে। পরে দেখি ভূঁইয়া চাচাকে মেরে ফেলেছে। অনেক মানুষ জড়ো হয়, ওখানে ডাক্তার হেনা ছিলেন কিন্তু তিনিও কোনো সহযোগিতা করেননি।

আরিফ রহমান এবং ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ০২

ভূঁইয়া মহেশ্বর পাশায় বক্তব্য রেখেছিলো যে; এই এলাকার নাম কামাল পাশা হবে। হিন্দুদের এলাকা ছিলো তাই নাম পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। তার এরকম সিন্ধান্ত নকশালরা পছন্দ করেনি। ধর্ম নিরপেক্ষতার বাইরে বিয়ষটি নিয়ে আসাতে তাকে মারা হয়েছিলো। তিনি কোলাবরেট ছিলেন বিধায় পাকিস্তানিরা দুঃখ পায় তাই তারা আমাকে ধরে আনে এবং ধারণা করে ঐ এলাকায় যতো হত্যা হচ্ছে, সবগুলোয় আমি পরিকল্পনা ও সহযোগিতা করে করেছিলাম। এই হত্যা মামলার নাম করে তারা আমাকে নয় মাস তাড়া করে বেরিয়েছিলো। আমার চাকরিস্থলেও তারা আমাকে নজরদারিতে রেখেছিলো।

ঐ ক্যাম্পটা ছিল অস্থায়ী ক্যাম্প। কথাগুলো আমি স্মৃতিকথাতে লিখেছি যদি বের হয় তাহলে ছেলে মেয়েরা পেয়ে যাবে। ওখানে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা বড় রুমের মতন । একটা তালাও লাগানো ছিল সেখানে। সেই রুমে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিলো। আমি ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করি যে; আমাকে বের করে দাও। তারপর কিছুটা পথ আমি ভেতরে হেঁটে গিয়ে দেখি; ওখানে গ্রাম থেকে ধরে আনা অনেক মেয়ে বন্দি অবস্থায় আছে এবং সব মেয়েদের কেউ অর্ধ পোশাকে, কেউবা বিবস্ত্র বার কেউবা ক্ষত-বিক্ষত। অনেকে দেখলাম হাসতেছে। কি যেন তাদের খাইয়ে দিয়েছে যার ফলে তারা শুধু হাসছিলো। সেটা যে সত্যিকারের হাসি না তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কী বলবো, ঐ পরিবেশটা রীতিমতন আতঙ্কজনক। অনেকে রোগে-শোকে কাতরাচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় পাকিস্তানি জওয়ানরা তাদের সাথে কথাবার্তা বলছে। আর মেয়েগুলো কেমন করে যেনো তাদের সাথে তাল মিলিয়ে নিয়ে তা সহ্য করার চেষ্টা করছে। ওখানে অনেক পাশবিকতার ছাপ ছিলো যা দেখামাত্রই বোঝা যেত। আলাদা কয়েকটা রুম ছিলো ওখানে; যেখানে পাশবিক অত্যাচার করা হতো। অন্ধকার থাকায় খুব ভালোমতন আমি দেখতে পারিনি। তবে বোঝা যাচ্ছিলো ওখানেই মেয়েগুলোর উপর পাশবিক অত্যাচার করা হতো। আমি যে প্রাণে বেঁচে যাবো, সেদিন বুঝিনি। তাহলে অনেক ভাল করেই হয়তো দেখার চেষ্টা করতাম।”

আরিফ রহমান এবং ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী নিন্দিত নন্দন ০৩

ছোট পরিসরে আম্মাকে নিয়ে লেখা যায় না; আজ তাই এতোটুকুই। হয়তো অন্য কোনো দিন আরও লিখবো। একটু করে বলে দেই শুধু; সম্প্রতি আম্মার নিজের লেখা জীবনী গ্রন্থ “নিন্দিত নন্দন” প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহীদের বইটি সংগ্রহ করতে অনুরোধ করবো।

আজ/এআর/এমকে/৩০৪

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan

আরও পড়ুন:

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —২

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৩

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৪

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৫