ঢাকা, বুধবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ | ২৫ রবিউল-আউয়াল ১৪৩৯

মাতৃমৃত্যু রোধে প্রশিক্ষিত ধাত্রীর বিকল্প নেই

মাতৃত্ব

ডেস্ক রিপোর্ট: বগুড়া জেলার কাটনারপাড়া এলাকার নিঃসন্তান গৃহবধূ সুফিয়া বেগম। পরপর দুবার সন্তান ধারণ করেও মৃত সন্তান প্রসব করেন। সন্তান পেটে আসার পর স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছিলেন। পরে শ্বশুরবাড়ির মুরব্বিদের পরামর্শে বাড়িতেই প্রতিবেশী দাইয়ের (ধাত্রী) মাধ্যমে সন্তান প্রসবের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথম সন্তানের বেলায় প্রসব বেদনা ওঠার পর দাই বারবার স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রায় দুদিন কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করার পর দাই ব্যর্থ হলে ওই ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে মৃত কন্যা সন্তান প্রসব করেন সুফিয়া।

চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অদক্ষ দাইয়ের কারণে পেটের সন্তানের মাথা আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এর কারণে পেটের ভেতর সন্তানের মৃত্যু হয় ।

সুফিয়া বলেন, পরের বার সন্তান পেটে আসলে আবারও একই ঘটনা ঘটে। এখন আর সন্তান জন্ম দিতে আমার শরীর সক্ষম না বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

দেশে বর্তমানে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার প্রতিলাখে ১৭৪ জন। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ১৪৩ জনে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বে ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০ জনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউএনএফপি’র এক গবেষণায় এ তথ্য জানা গেছে। নিউজ বিএসএসের

দেশে বর্তমানে শতকরা ৪২ জন নারী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীর পরিচর্যার আওতায় এসেছেন। অন্যরা এখনও অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত ধাত্রীদের সহযোগিতায় সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। এতে প্রসবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর নানা শারীরিক ঝুঁকিসহ মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। নারীস্বাস্থ্যের বড় একটা অংশ সন্তান জন্মদান। নানা কুসংস্কার ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে হাসপাতালে গিয়ে সন্তান প্রসব করতে সংকুচিত হয়। তারা মনে করেন, হাসপাতালে পুরুষ চিকিৎসকরা নারীর সন্তান প্রসব করান। এতে ওই নারী ও তার পরিবার সহজে বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না।

অনেকে মনে করেন, হাসপাতালে বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করালে ভূমিষ্ঠ শিশু সুস্থ ও অক্ষত থাকে। এ ধরনের নানা ভীতি ও অসচেতনতার কারণে অনেক পরিবার বাড়িতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে এখনও শতকরা ৬৮ ভাগ গর্ভবতী নারী বাড়িতে সন্তান প্রসব করান। সরকার শতকরা ৫৫ ভাগ গর্ভবতী মায়ের নিরাপদ মাতৃত্ব সুবিধা নিশ্চিত করেছে। অন্য ৪৫ শতাংশ মা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর হারও কমিয়ে আনা হবে।

এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রী নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রসবকালীন জটিলতা হ্রাস ও মাতৃমৃত্যু এবং শিশু মৃত্যু কমিয়ে আনতে সরকার ৩ হাজার প্রশিক্ষিত ধাত্রী বা মিডওয়াইভ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় ৪ জন এবং প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে ধাত্রী নিয়োগ দেয়া হবে।এ ক্ষেত্রে দক্ষ ও যোগ্য করে এসব ধাত্রীদের তৈরি করতে তিন বছরের ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ)’র গাইনী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পারভীন আখতার শামসুন নাহার সুরভী জানান, দারিদ্র্য, অভিভাবকের অসচেতনতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভূমিষ্ঠ শিশু ও মা নানা ঝুঁকিতে থাকেন। গর্ভবতী নারী ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সচেতনতার কারণে একজন মা ও তার সদ্যজাত শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

তিনি বলেন, এছাড়া দেশের একটা বড় অংশ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করায় তাদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে তারা নামমাত্র মূল্যে সন্তান বাড়িতে প্রসব করান। এতে অনেক সময় অদক্ষ দাইয়ের হাতে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রসবকালীন জটিলতায় মা ও শিশু আক্রান্ত হন। তাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় বসবাসকারী দাই তহুরা বেগম (৪০) দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় সন্তান প্রসব করানোর কাজ করছেন। তিনি জানান, সন্তান প্রসব করানোর জন্য তেমন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার আওতায় ধাত্রী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তিনি গিয়েছিলেন। অনিয়মিতভাবে সেখানে গিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ করেননি।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা(হু)-এর এক গবেষণা থেকে জানা যায়, শতকরা ২০ ভাগ নারীর অপুষ্টিজনিত মাতৃমৃত্যু ঘটে রক্তক্ষরণ ও রক্তস্বল্পতার জন্য। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ এক জরিপ অনুসারে শতকরা ৮৩ শতাংশ গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসব করেন অদক্ষ দাইয়ের হাতে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মা ও শিশুর সার্বিক উন্নয়নে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে প্রসব করানোর হার বৃদ্ধি করার প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)২০১৪ এর প্রাথমিক এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, গর্ভকালীন সেবা গ্রহণের হার শতকরা ১৭ ভাগ থেকে ৩১ শতাংশে বেড়েছে। প্রতি ১০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে তিনজন চিকিৎসকের সেবা নিচ্ছেন। সন্তান জন্মদানের (প্রসবপরবর্তী) ৪২ দিনের মধ্যে চিকিৎসকের সেবা গ্রহণ করছেন শতকরা ৩৬ শতাংশ। আগে এই হার ছিল ২৭ শতাংশ।

আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক ডা. ইশরাত জাহান জানান, এখানে গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা নিতে আসার হার অনেক সন্তোষজনক। নারীরা আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তবে গর্ভবতী নারীদের একটা বড় অংশ গর্ভকালীন থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করলেও সন্তান প্রসব করানোর ক্ষেত্রে বাড়িকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। অনেকের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে হাসপাতালে সন্তান প্রসব করালে অপারেশনের মাধ্যমে হবে। এ ধারণা অনেকাংশে ভুল। কেননা, প্রসবকালীন শারীরিক জটিলতা না হলে চিকিৎসকরা অহেতুক সিজারিয়ান অপারেশন করেন না। এছাড়া প্রসবপরবর্তী সময়ে প্রসূতি মা ও শিশুর যত্ন নিতে একজন সহকারীর প্রয়োজন, যা অনেক দরিদ্র নারীর স্বামী বা নিকটাত্মীয় করতে পারেন না। এ কারণেও বাড়িতে সন্তান প্রসবের হার এখনও বেশি।

তিনি বলেন, হাসপাতালে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালমুখী করতে উৎসাহ দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। এক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীর পাশাপাশি তার পরিবারকেও সচেতন হতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, বাড়িতে সন্তান প্রসব করানোর পরিবর্তে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের হার বৃদ্ধির প্রতি নজর দিতে হবে। এজন্য আমাদের দেশের গর্ভবতী নারীদের সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়ার রীতির প্রচলন করতে হবে।

তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রসঙ্গ এনে বলেন, ভারতে গর্ভবতী মায়েদের সেবা দিতে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। এর ফলে গর্ভবতী নারী হাসপাতালে যোগাযোগ করলে তার ডেলিভারীর জন্য ওই নারীকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রসবপরবর্তী সময়ে সন্তানসহ তাকে বাড়িতে পৌছে দেয়ার কাজটিও করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এতে গর্ভবতী নারীর পরিবার যেমন নিশ্চিত থাকেন তেমনি গর্ভবতী নারীর সন্তান জন্মদানের বিষয়টিও সুরক্ষিত হয়। ভারতে এ ধরনের প্রণোদনায় অনেক নারী উৎসাহী হয়ে এ সেবা গ্রহণ করছেন। আমরা যদি ভারতের মতো ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করতে পারি তবে, দেশের হাসপাতালগুলোতে গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসবে আগ্রহী হবে।

ডা. সহিদুল্লা বলেন, শ্রীলংকাতে মাতৃমৃত্যুর হার আশাতীতভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে দেখা গেছে, শ্রীলংকায় ৯৯ দশমিক ৯ ভাগ সন্তান প্রসব হয়ে থাকে হাসপাতালে। বর্তমানে বাংলাদেশে হাজারে ২৬ জন, ভারতে ২৮ জন ও শ্রীলংকায় শতকরা ৬ জন নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। শ্রীলংকার এমন উদাহরণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমাতে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি বলেন, হাসপাতালে গর্ভবতী নারীর সন্তান প্রসবে উৎসাহ দিতে হবে। অন্যদিকে সমাজের সর্বস্তরে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

সরকার উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩ হাজার প্রশিক্ষিত ধাত্রীর অর্থাৎ মিডওয়াউভ দ্বারা সেবা নিশ্চিত করলে দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার আরও কমবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয়ভাবে দেশের প্রায় ৬৩ ভাগ গর্ভবতী নারীর সন্তান প্রসব হয় বাড়িতে কিংবা আশেপাশের পরিচিত ধাত্রীর মাধ্যমে। সরকারী, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৩৭ ভাগ শিশু ভূমিষ্ঠ হয়।

দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রী দ্বারা সন্তান প্রসব করা হলে মাতৃমৃত্যুসহ শিশুমৃত্যুর হার কমবে। তাই সন্তান প্রসবকালীন শারীরিক জটিলতা এড়াতে গর্ভবতী মা ও তার পরিবারকে সচেতন হতে হবে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ/৩০১