ঢাকা, সোমবার , ২৫ জুন ২০১৮, | ১১ আষাঢ় ১৪২৫ | ১০ শাওয়াল ১৪৩৯

শহিদ বলতে আপনি কী বুঝেন?

এডিটরিয়াল ডেস্ক ● মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ও শহীদের তালিকা নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে নিজের মতামত জানাতে সম্প্রতি টেলিভিশনের পর্দায় উপস্থিত হয়েছিলেন গণহত্যা বিষয়ক গবেষক আরিফ রহমান

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কে আলো ফেলতে এবং মুক্তিযুদ্ধ যে কোনো ছেলেখেলা না, সারা বিশ্ব, বাঙালি আর পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের সেটা বোঝাতে গত ৩১ জানুুয়ারি রবিবার সকাল ১১টায় ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে উপস্থিত ছিলেন গণহত্যা বিষয়ক তরুণ এই গবেষক।

ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে আরিফ রহমানের সেই কথা—

সত্যি কথা বলতে আমার যখন নতুন করে এই বিষয়টা নিয়ে গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত শহিদের সংখ্যা আসলে ত্রিশ লক্ষ থেকে অনেক বেশি। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে জনসংখ্যার গ্রাফগুলো দেখি, জনসংখ্যা বুদ্ধির হার গুলো ভালোভাবে লক্ষ্য করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে ১৯৭১ সালে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জনসংখ্যার একটা গ্যাপ পাওয়া যায়। এবং এটা খুব পরিস্কারভাবেই বোঝা যায় যে এই ৪০ লাখ মানুষের গ্যাপ মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের জন্য হয়েছে। এখন নতুন করে যে বিতর্ক টা তৈরি হয়েছে যে শহিদের সংখ্যা নিয়ে তালিকা তৈরি করার দাবি। আমরা যারা গণহত্যা নিয়ে কাজ করি, আমরা জানি পৃথিবীতে কোনো যুদ্ধে, যারা সুনির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী না, তাদের ক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধে বেসামরিক মৃত ব্যক্তির তালিকা তৈরি করা যায় না। কারণ এটা অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধ বা যেকোনো যুদ্ধ তো স্বাভাবিক একটা সময় না। এসময় লাশ গুম করে ফেলা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটা বড় অংশ, প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে চলে গিয়েছিলো। নতুন একটি গবেষণায় দেখা যায়, এই এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে ১২ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছিলো। এই যে ১২ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো, তাদের তালিকা আপনি কোনোদিন পাবেন না।

আসলেই যদি শহিদদের তালিকা করতে হয়, তাহলে আগে ঠিক করতে হবে, শহিদ বলতে আপনি কী বুঝেন? আপনি যদি বলেন যে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে গুলি খেয়ে যে মারা গেছে, সে-ই শহিদ, তাহলে নিশ্চয়ই সেটা একটা হাস্যকর ব্যাপার হবে। কারণ হাভার্ড ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথের ড. রিচার্ড ক্যাশ বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এতো বড় একটা যুদ্ধ, এটা কোলাটেরাল ড্যামেজ অর্থাৎ যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়েছে সেসময়। কিরকম প্রভাব? মুক্তিযুদ্ধের সময় তো দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো, অনেকেই হয়তো জানেন না। আপনারা অবাক হবেন জেনে, ড. জিওফ্রে ডেভিস, একজন অস্ট্রেলিয় চিকিৎসক; তিনি তার ‘দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড’ বইতে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যে ছয় লক্ষ বীরাঙ্গনা ছিলো বাংলাদেশে, তাদের মধ্যে এক লক্ষ বীরাঙ্গনা মুক্তিযুদ্ধের পরে আত্মহত্যা করেছিলো। তাদের মধ্যে আরো অনেকে গর্ভপাতের সময় মারা গিয়েছিলো। আমরা যদি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা গণনা করি, তাহলে এরপর যারা আত্মহত্যা করেছে, তাদেরকে আমরা কোন হিসেবে ধরবো! কলেরায় মারা গেছে ৫ লক্ষের বেশি মানুষ, তাদেরকে আমরা কোথায় ধরবো! মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকা তৈরি করা, এটা একটা অ্যাবসার্ড কথাবার্তা। আর যদি তালিকার কথাই আসে, সারা পৃথিবীতে যুদ্ধের তালিকা আছে, আমাদের গণহত্যা কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আছে। যেখানে ত্রিশ লক্ষ শহীদের কথা বলা আছে।

এখন এই সময়ে এসে এই বিষয় নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগই নেই। এখন যে বিতর্ক টা শুরু হয়েছে, এটা পলিটিক্যাল বিতর্ক। কিন্তু আমার গবেষকরা আমাদের কাজ ঠিকই করে যাবো। পরিসংখ্যানে যে এই শহিদের সংখ্যা যে কতো বেশি হতে পারে, সেটা নিয়েই আমরা কাজ করছি।

প্রচলিত একটি কথা শোনা যায়, যে বঙ্গবন্ধু নাকি ৩ লাখ কে ৩ মিলিয়ন বলে ফেলেছিলেন। আসলে এটাও কিন্তু অ্যাবসার্ড কথা! কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু দেশে আসার আগেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চরমপত্রে এম আর আখতার মুকুল স্যার সর্বপ্রথম বলেন ৩০ লক্ষ শহীদের কথা। এরপর ২২শে ডিসেম্বর পূর্বদেশ পত্রিকায় ত্রিশ লক্ষ শহিদের কথা বলা হয়েছিলো, সেটা বঙ্গবন্ধু দেশে আসার ১৭ দিন আগে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যখন জানতেন না বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, ততোক্ষণে সারা পৃথিবীর মানুষ জানতো যে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে।

আরিফ রহমান-০০৮

তারপর ১৯৭২ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে প্রাভদা পত্রিকায় লেখা হয়েছিলো ৩০ লাখ শহীদের কথা। এরপর ৫ জানয়িরি মনিং নিউজ লিখেছিলো ৩০ লাখ শহীদের কথা। বঙ্গবন্ধু দেশে আসেন ৯ তারিখে, ৮ তারিখে সংবাদ সম্মেলন করেন। অর্থাৎ এর আগে আমরা অন্তত ১৫ জায়গায় উদাহরণ পাবো সারা বিশ্বময়, যেখানে ৩০ লক্ষ শহীদের কথা বলা হয়েছে।

আর একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে শহীদের সংখ্যাটা আসলে জানা সম্ভব না। কারণ, আপনাকে একটা কমিশন গঠন করতে হবে, তালিকা তৈরি করতে হবে। আমরা যদি দেখি, একদম প্রাথমিক অবস্থায় ধীরে ধীরে এই সংখ্যাটা বাড়তে থাকে। প্রথম তিন মাসের কথা হিসাব করি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় মার্চ মাসে, এরপর এপ্রিল। মে মাসে খালেদ মোশাররফ গ্রানাডা টিভির একটি ডকুমেন্টারিতে বলেছিলেন, ১০ লাখ মানুষ শহিদ হয়েছেন। এরপর কবি আসাদ চৌধুরীর “বারবারা বিডলারকে” কবিতায় পাই ১৫ লাখ শহিদের কথা। এরপর ১ অক্টোবর লন্ডনে প্রকাশিত হ্যাম্পস্টেড এন্ড হাইগেট এক্সপ্রেস পত্রিকা বলে ২০ লাখ মানুষকে হত্যার কথা। শহিদের এই সংখ্যা গ্র্যাজুয়ালি এভাবে বাড়তে থাকে। তারপর মাওলানা ভাসানী তার বক্তব্যে ত্রিশ লাখ শহিদের কথা বলেছেন।

এটা আসলে হঠাৎ করে কারো মাথা থেকে গজিয়ে ওঠা না, এটা পরিসংখ্যানলব্ধ একটা বিষয়। আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ এবং মোর দেন ইনাফ ডকুমেন্ট আছে। এছাড়া জাতিসংঘে ১৯৮১ সালে হিউম্যান রাইটস একটা ডিক্লেরেশন দেয়। সেখানে বলা হয়, মানব ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যতগুলো গণহত্যা হয়েছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা হচ্ছে সর্বনিম্ন সময়ে সর্বোচ্চ। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষ মারা গেছেন। এবং আমরা এটাকে যদি হিসাব করি, তাহলে ২৬৫ দিনের মুক্তিযদ্ধে ৩১ লাখ ২০ হাজার মানুষের হিসাব পাওয়া যায়।

এখন যারা ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলেছেন, তারাই একসময় অনেক সরকারের আমলে ৩০ লাখ হিসাবে প্রেসনোট দিয়েছেন। কিন্তু এখন একটা বিতর্ক তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছে। এটা গবেষণা বা ইতিহাসের ব্যাপারে কোনো বাধা বা অন্তরায় না। কিন্তু আমাদের কথাটা পরিস্কার। মুক্তিযুদ্ধে শহিদের তালিকা করবেন? এই মুহূর্তে শহিদের তালিকা করলে শরণার্থী শিবিরের মানুষগুলোকে তো আপনি পাবেন না, যে বীরাঙ্গনারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পাবেন না। এমনকি যেসব পরিবারগুলো ইন্ডিয়া থেকে ফিরে আসে নাই, তাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদেরকে আপনি কোথায় পাবেন? তখন তো আপনি ৩০ লাখ পাবেন না, তখন তো হিসাবটাই হবে না। আমরা তো পুরোপুরি ক্যালকুলেটিভলি দেখাতে পারছি ত্রিশ লাখ।

হ্যা, তালিকা হতে পারে। কিন্তু সেই তালিকার ওপর ভিত্তি করে আমরা কখনোই জিনিসটা এস্টাবলিশ করতে পারি না। কারণ আমাদের কাছে এখন অনেক তথ্য নেই। এটা কোলাটেরাল ড্যামেজ। মুক্তিযুদ্ধ অনেক বড় একটা যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ কোনো ছেলেখেলা না।

তিরিশ লক্ষ শহিদঃ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা

মুক্তিযুদ্ধের এতোবছর পর শহীদের সংখ্যা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক, অনেকে লুটছেন রাজনৈতিক ফায়দা; যা বাঙালি জাতির জন্য নিতান্তই লজ্জাজনক। তাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করেত আরিফ রহমান লিখেছেন ‘তিরিশ লক্ষ শহিদঃ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা?’। বইটি পড়লে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন, আসলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যাটা আসলে আরো অনেক বেশি।

ভিডিও কার্টেসি : লন্ডন ঠাণ্ডার যায়গা, রুমে হিটারের শব্দ, তারপরে প্রায় সকাল, ফ্লাটমেটরা সকলেই ঘুমে। এমনই পরিস্থিতিতে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে আরিফ রহমানের কথাগুলো কম্পিউটার স্ক্রিণ থেকে মোবাইলের ক্যামেরায় রেকর্ড করে বার বার শোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সুমন হাসান। অসংখ্য ধন্যবাদ সুমন হাসান

আজ/এআর/এমকে/এইচকে/১০৩

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan

আরও পড়ুন :

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য সিরিজ

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —২

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৩

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৪

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৫

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৬

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৭

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৮

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৯

‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লাখের কম, পারলে প্রমাণ করেন’

পঞ্চাশজন ‘নিরপেক্ষ’ বুদ্ধিজীবী বনাম একজন তরুণ ছাত্র