ঢাকা, মঙ্গলবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ৩ রবিউস-সানি ১৪৪০

অর্ধসত্যের সুশীল চতুরতা, প্রোপাগান্ডা এবং ভোট বাস্তবতার ময়নাতদন্ত

অর্ধসত্যের

অর্ধসত্যের সুশীল চতুরতা সবসময় ভয়ংকর। নির্বাচিত সরকারেরর শেষ সময়ে এসে এদের অপতৎপরতা লক্ষ্যনীয়। কখনও কিংস পার্টি হয়ে আবার কখনও তথাকথিত জাতীয় ঐক্যের বাতাবরণে। আর সবসময় এই তৎপরতাগুলোর কেন্দ্রস্থল সেই সুশীল মহল। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার।
আজকের লেখাটি প্রথম আলোতে সোহরাব হাসানের একটি কলামকে কেন্দ্র করে। যার শিরোনাম ‘কার পক্ষ নেবেন তরুণ ভোটাররা’? যারা নবীন পাঠক, যারা গত কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফল ক্লোজলি মনিটর করেন নি, তাদের কাছে এই লেখার প্রত্যেক তথ্য বেদবাক্যের মত সত্য মনে হবে। অথচ পুরো লেখাটি অর্ধসত্য দিয়ে ভরপুর। সুশিলীয় চতুরতায় মাখা। অর্ধসত্য সবসময় মিথ্যার চেয়ে ভয়াবহ।আসুন লেখাটির ময়নাতদন্ত করি।

সোহরাব হাসান দাবী করেছেন গত চারটি নির্বাচনে কখনো বিএনপি এবং কখনো আওয়ামী লীগ ভোট বেশী পেয়েছে। অথচ সত্যি হলো গত চারটি নির্বাচনের প্রত্যেকটিতে আওয়ামী লীগ বিএনপির চেয়ে ভোট বেশী পেয়েছিলো। সোহরাব খুব চতুরতার সাথে নির্বাচনে কে কয়টি আসনে প্রতিযোগিতা করে কত ভোট পেয়েছিলো, তা এড়িয়ে গিয়ে শুধুমাত্র প্রাপ্ত ভোট দেখিয়ে এক এক দলকে এগিয়ে রেখেছেন। কমেন্ট বক্সে প্রত্যেক নির্বাচনে কে কয়টি আসনে প্রতিযোগিতা করেছিলো, কোন সময় জোটের জন্য কে আসন ছেড়ে দিয়েছিলো, তা একটু পর্যালোচনা করলেই সোহরাবের চতুরতা বেরিয়ে আসবে।

১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ ২৫৯ আসনে নির্বাচন করে এই ভোট পায়। প্রক্ষান্তরে বিএনপি ৩০০ আসনে এই ভোট পায়। বাকী ৪১ আসনে আওয়ামী জোটের প্রার্থী যে ভোট পায়, সেটি কার সাথে যোগ হবে? ১৯৯১ সালে জামাত প্রথমে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ২০০ আসন থেকে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে বিএনপিকে সমর্থন দেয়। বিএনপির ভোটের সাথে জামাতের সেই ভোট কেন দেখানো হবে না? সেইবার বিএনপি এবং জামাতের মধ্যে অলিখিত জোট হয়েছিলো। জামাতের শক্তিশালী প্রার্থীর এলাকায় বিএনপি জামাতকে ভোট দেয়, এবং বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থীর এলাকায় জামাত বিএনপিকে ভোট দেয়। সেবার বিএনপির ৬৪ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিলো। সেই সমর্থনের বিনিময়ে বিএনপি জামাতকে ২টি মহিলা আসন উপহার দেয়। নিজামীর স্ত্রী সেই সূত্রে ঐ সংসদে মহিলা কোটায় সাংসদ ছিলো।

১৯৯৬ সালে কারো সাথে কারো জোট হয় নি। সবাই একক নির্বাচন করেছিলো। এখানেও আওয়ামী লীগ একক ভাবে ভোট বেশী পেয়েছিলো। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ একক নির্বাচন করে। বিএনপি চারদলীয় জোটের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয়। বিএনপির এই প্রাপ্ত ভোটে বিএনপি+ জামাত+ জাতীয় পার্টি+ ইসলামী ঐক্যজোট এবং আরো কিছু খুচরা দলের প্রাপ্ত ভোট একসাথে করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। সেই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ এককক ভাবে ভোট বেশী পায়। শুধুমাত্র জোটের ভোটের কাছে একক আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়।

২০০৮ সালে সবাই জোটবদ্ধ নির্বাচন করে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী জোট ৫৯% এবং বিএনপি জোট মাত্র ৩৭% ভোট পায়।
মূলত এইচ টি ইমাম দুই দলের ভোটের তূলনা করতে গিয়ে বললেছিলেন আওয়ামী লীগের ভোট এখনো বিএনপির চেয়ে বেশী। এর বিপক্ষে সোহরাব লিখেন ” কিন্তু তিনি ১৯৯১,১৯৯৬,২০০১ সালের নির্বাচনের যে হিসাব দিয়েছেন তার সাথে বাস্তবতার মিল নাই।” এই বাস্তবতার মিল নাই বলতে গিয়েই সোহরাব অর্ধসত্য তথ্য দিয়েছেন। সোহরাব লিখেন ” ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভোট পেয়েছিল ৩০.৮ শতাংশ আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো ৩০.১ শতাংশ। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির ভোট কিছুটা হলেও বেশি।” চালাকী করে সোহরাব উল্লেখ করেন নি যে সেই নির্বাচনে কে কত আসনে নির্বাচন করে। বিএনপি ৩০০ আসনে ভোট পায় ১০৫,০৭,৫৪৯ টি আর আওয়ামী লীগ ২৬৪ আসনে ভোট পায় ১০২,৫৯৮,৬৬ টি।অর্থাৎ আসন প্রতি ভোট বিএনপি – ৩৫০২৫ ভোট, আওয়ামী লীগ – ৩৮৮৬৩ ভোট। বাকী ৩৬ আসনের ভোট যোগ করলে দেখা যাবে আওয়ামী জোটের মোট ভোট প্রায় ৩৭%। সেইবারের নির্বাচনে আরেকটি ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ যে ৩৬টি আসন তার জোট সঙ্গীদের ছেড়ে ছিলো, তার বাইরেও জোটের সঙ্গীরা আরো ৭০/৮০ টি আসনে তাদের প্রার্থীতা প্রত্যাহার না করে আওয়ামী লীগের সাথে প্রতিদন্ধিতা করে। ফলে অন্তত ৪০টি আসনে আওয়ামী লীগ ৫০০ থেকে ৩০০০ ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত হয়। অথচ সেইসব আসনে জোটের সঙ্গী রাজ্জাকের বাকশাল, ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি, গনতন্ত্রী পার্টি একসাথে ৫০০০-১০০০০ হাজার ভোট কেটে নেয়। ফলত সেই বছর আওয়ামী লীগের পরাজয়।
সোহরাব গত দশ বছরের আওয়ামী লীগের কিছু ব্যার্থতার কথা তুলে ধরেছেন, অথচ এর বিপরীতে কয়েকশো সাফল্যের বিন্দুমাত্র উল্লেখ করেনি। ঘুরে ফিরে বিএনপির বায়বীয় গুম, হত্যা,মামলা ইত্যাদি অভিযোগ কোন প্রমান ছাড়াই করে গেছেন। সেই কোটা আন্দোলন, সড়ক আন্দোলনের কিছু সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখ করে রায় দিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের তরুন ভোটাররা আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না।
“বিএনপির অতীত অপকর্মের ফিরিস্তি কিংবা উন্নয়নের বয়ান তরুনদের আকৃষ্ট করবে বলে মনে হয় না। নবীন ভোটাররা তাদের পক্ষেই রায় দেবেন, যারা সত্যিকারেরভাবেই রাষ্ট্রের মেরামত করবেন।” সোহরাব সাহেব সেই মিস্ত্রী সাহেবের নাম বলতে কি লজ্জা পাচ্ছেন?

এনায়েত উল্লা : ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিষ্ট

(লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব অভিমত। আজ ২৪-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)


%d bloggers like this: