ঢাকা, মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই ২০১৯, | ১ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১২ জিলক্বদ ১৪৪০

অ্যান ওপেন লেটার টু ক্যাসপার

তারিক আজিজ : এতো এতো ভালোবাসা নিয়ে জন্মেছিলি তুই, ক্যাসপার। কতো কতো মানুষ তোর হাসিমাখা ‍মুখটি দেখতে চেয়েছিলো! শেষমেষ সবাইকেই কাঁদিয়ে তুই চলে গেলি! ক্যান রে? ছোট্ট বাবু হয়ে তুই এসেছিলি। আলোকিত হয়ে উঠেছিলো তোর আব্বু-আম্মুর কোল। তারা আদর করেছিলো খুব তোকে, ক্যাসপার। পাহাড়-বনে ঘুড়ে বেড়ানো ছিলো তোর আব্বুর নিত্যদিনের কাজ। তুইও তো পাহাড়ে চড়তে চেয়েছিস, বাবার হাত ধরে গিয়েছিলি পাহাড়-বনে। এখন কোথায় তুই? পাহাড় দেখিস?

আমরা জানি, তুই আমাদের দেখছিস। তোর আব্বুকে, আম্মুকে। তোর মতো আরো বাবুদের নিয়ে তুই খেলছিস। ওখানে তো তোর অনেক ভূত বন্ধু হয়েছে। সবাইকে নিয়ে ওই অতুলনীয় স্বর্গের পাহাড়ে রশি ছাড়াই এই ছোট্ট বয়সেই চড়ে-বেড়াচ্ছিস। স্বর্গের পাখি তোকে নিশ্চয় গান শুনিয়েছে। তোর মায়ের গলায় গান শোনার মতো কি সেই গান?

চলে যাওয়ার আগে তো আইসক্রিম খেতে চেয়েছিলি, ক্যাসপার। কত্তো মানুষ তোর জন্য আইসক্রিম নিয়ে এসেছিলো। তুই খেতে পারিসনি। বড় অসুখ হয়েছিলো। আমাদের খুব কষ্ট হয় রে, ১১টা দিন পানি খেতে পারিসনি তুই। আমরা খুব খারাপ! তোর প্রিয় আইসক্রিম আর পানি না খাইয়ে তোকে বিদায় দিলাম। তোর আব্বু-আম্মুর অনেক কষ্ট হচ্ছেরে… তুই কি পারিস? আব্বু-আম্মুর কষ্টটা একটু কমিয়ে দিতে।

আব্বু-আম্মুকে তুই জানিয়ে দে, আমাদের ছেড়ে আসার পর তুই অনেক অনেক আইসক্রিম খেয়েছিস। মনে ভরে গেছে তোর। ওখানের সবাই তোকে অনেক আদর করছে। নানা স্বাদের চকলেট খেতে দিচ্ছে। তুই সবাইকে নিয়ে মজা করে খাচ্ছিস। আরো কতো কি? কতো কিছুই না তুই করছিস। ক্যাসপার, তুই বলে দে, তুই ভালো আছিস।

তুই কি জানিস, তোকে না দেখেই কতো কতো মানুষ ভালোবেসেছিলো। জাকারবার্গের ফেসবুকে তোকে দেখে কতো মানুষ কেঁদেছে। তোর চিকিৎসার জন্য টাকা দিয়েছে। টাকা নেই বলে অচেনা যুবক তোর জন্য রিক্তহস্তে শরীরের রক্ত নিয়ে হাজির হয়েছে। অজানা ভালোবাসার টানে তোর পাশে এসেছে হাজার হাজার মানুষ। তোকে একনজর দেখবে বলে সুদূর প্রবাস থেকেও মানুষ এসেছিলো। তোর আব্বু-আম্মুর মতো আরো অনেক মানুষেরা তোর জন্য হয়েছিল অন্তপ্রাণ।

তুই পেরেছিস বাপ। স্যালুট তোকে। ভালোবাসা কী? তুই বুঝিয়ে দিয়েছিস। আমাদের ভুলে যাস নে বাপ! এতো কষ্ট নিয়ে চলে গেলি তুই, কাসপার! তুই আমাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে গেলি।

বাবুরে…! ডাক্তাররা তোকে অনেক কষ্ট আর ব্যথা দিয়েছিল নিশ্চয়। যখন তোর পেটের ভেতর তাজা রক্ত জমা হচ্ছিল,তুই তো কিছুই বুঝিসনি। শুধুই কেঁদেছিস। এত্তো রক্ত বের হওয়া দেখে তোর আব্বু-আম্মু তো দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। এরপর তো আর বেশিদিন থাকলি না আমাদের কাছে। বহু স্মৃতি আর ভালোবাসার চিত্রনাট্যের কথা ছড়িয়ে চিরতরে ছেড়ে চলে গেলি তোর খোদার কাছে। আচ্ছা, ‍তুই কি ওখানে গিয়ে জানতে পেরেছিস কেন তুই এত্তো তাড়াতাড়ি সবাইকে ছেড়ে চলে গেলি?

ওই পাহাড়ের বনে, উড়ন্ত সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে তুই নিশ্চয় চাঁদমামার সাথে কথা বলেছিস। ওখানে তুই তো সব পারিস। সুপারম্যানের পিঠে ওঠে আকাশবাড়ি ঘুড়ছিস, ঠিক না। বেশি জালাচ্ছিস না তো সুপারম্যানকে? আর মেঘের ভেলায় দোল খেয়ে কেমন খেলছিসরে… রাতে ঠিকমতো ঘুমাস তো? না কি তোর আকাশবাড়ির ঝড়নার পাশে বসে তারার সঙ্গে দুষ্টুমি করছিস। দেখিস, ঠিকমতো খাস কিন্তু। বায়না ধরিস না।

Casper

ছোট্টরে তুই তো জানিস, তোর জন্য হঠাৎ কতো মানুষ কেঁদে উঠেছিলো । কোনো এক অজানা শক্তি তোর জন্য এ ভালোবাসা সৃষ্টি করেছিল। কষ্টময় এক ভালোবাসার ভিন্ন আবহ নিয়ে তুই তোর কর্মযজ্ঞ শেষ করে চলে গেলি। এইসব মানুষদের ভালোবাসার কতোটুকুই বা বুঝবি তুই। এই যে তুই এই ভালোবাসা দিয়ে সবাইকে ছেড়ে গেলি, তোর কষ্ট হচ্ছে না? তুই তো আব্বুর কলিজা ছিলি। পরে সবার কলিজা হয়ে গেলি।

তোর সুস্থ্যতার জন্য মসজিদে মসজিদে দোয়া হলো। ডাক্তার-নার্সরা বহুত চেষ্টা চালালো। তোকে সুস্থ্ করার জন্য সবার মাঝে একধরনের মনবাসনা তৈরি হলো। মনের গহীন কোণের মানুষেরা জেগে উঠলো। অনেকের মাঝে। তুই হঠাৎ করেই মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসার পরশ ছড়িয়ে দিলি। তোর ছড়ানো ভালোবাসায় বেদনাসিক্ত আজ এত্তো এত্তো মানুষ। তুই নেই এখানে। ক্যাসপার, আমরা তোকে খুব মিস করি।

আমরা যে বহুদিন কাঁদতে পারি না, কাঁদতে ভুলে গেছি। তুই আমাদের অনেকদিন পর সত্যিই কাঁদিয়ে গেলি। মানুষই মানুষের জন্যই সবসময়। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো সে যে মানুষ তা ভুলে গিয়েছিলো। মানুষীয় গুণের অভাব ও অবহেলায় শুদ্ধমন হারিয়ে গিয়েছিলো তাদের। কি এক ভালোবাসার পরশ এসে হঠাৎ মগজ নড়ে ওঠলো অনেক শুদ্ধমনের। শেষে মানবতার ভালোবাসার যে শক্তি, তার কাছে পরাজিত হয়েছে মানুষ। কি বলিস তুই?

এখানে তো তোর অনেক বন্ধু আর ভালোবাসার মানুষ ছিল। আমরা সবাই তো তোকে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে ছোট্ট ওই কবরে রেখে এসেছি। এ-জমিনে তুই স্মৃতি হয়ে থাকবি বলে। প্রথমে কি তোর ভয় লেগেছিল? পরে নিশ্চয় তুই মহাসমারোহের দিকে চলে গেছিস। ওখানের বন্ধুরা কেমন তোর? তোর মতো কষ্ট করে অনেক বাবুই তো আকাশবাড়িতে গেছে। কথা বলেছিস তাদের সঙ্গে?

কতো কতো অসুখে তোর মতো কতো বাবু আগেই সেখানে গিয়েছে। তুই তো সেদিন গেলি মাত্র! তুই ওইসব বাবুদেরকে বলিস, এখানকার মানুষদের যেন তারা ক্ষমা করে দেয়। তুই তো আমাদের ক্ষমা করেছিস! তাই না? তুই তো আমাদের সবার প্রিয় ক্যাসপার।

কিরে…রাগ করিস না বাপ! ছেড়ে তো গেলি তুই আমাদের। কিন্তু দিয়ে গেলি বহুত কিছুই। আমরা এখানকার অনেক মানুষরা কিছুই দিতে পারি না। আবার অনেকে এতো কিছু দিয়ে গেছে যে, আমরা সেটা মূল্যায়ণই করতে পারি না। কিন্তু তুই আমাদের অনেক বেশি কিছু দিয়ে গেলি। অসুখে পড়া অন্যসব বাবুদের জন্য কিছু করতে পারার বড় সৎসাহসের দরজা খুলে দিলি। শুদ্ধমনের পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেলি অনেক মানুষমনের গহীন কোণে।

দোয়া করিস, খোদাকেও বলিস! আমরা যেন কিছু করতে পারি। ভালো থাকিস তুই, ক্যাসপার।

আজ/টিএ/১০৩


%d bloggers like this: