ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই ২০১৯, | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০

আজ ছিল বিদায়ের দিন..লাল সালাম, প্রিয় রাণীমা

লাল সালাম

আজ ছিল তার বিদায়ের দিন। অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে সাজানো বিপ্লবী জীবন থেকে শারিরীক বিদায়। লাল সালাম প্রিয় রাণীমা। নাচোলের রাণীমা। তেভাগার রাণীমা। বাংলার রাণীমা।

খেলাধূলা কিংবা পড়াশোনা সব কিছুতেই তিনি ছিলেন অগ্রগামী। সময়ের তুলনায়। সময়টা চিন্তা করুণ। ব্রিটিশ ভারত। তাঁর আদি নিবাস ছিল তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। বাবার চাকুরির সুবাদে বসবাস এবং বেড়ে ওঠা কলকাতায়। লেখাপড়া করেন কলকাতার বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজে। এই কলেজ থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। পরে ১৯৫৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। কৈশোরে তিনি খেলাধুলায় তুখোড় ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্য জুনিয়র এ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন। সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায়ও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনিই প্রথম বাঙালি মেয়ে যিনি ১৯৪০ সালে জাপানে অণুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক বাতিল হয়ে যায়। ফলে তার অংশগ্রহণ করা হয়নি। খেলাধুলা ছাড়াও গান, অভিনয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।

বেথুনের তুখোড় ছাত্রী বিয়ের পর হলেন পূর্ববঙ্গের জমিদার বাড়ির পুত্রবধু। কোলকাতা ছেড়ে রক্ষণশীল শ্বশুড়বাড়ি রামচন্দ্রপুর হাটে চলে এলেন। সময়টা ১৯৪৫। ইলা সেনের বিয়ে হয় দেশকর্মী কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্রের সাথে। রমেন্দ্র মিত্র মালদহের নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার মহিমচন্দ্র ও বিশ্বমায়া মিত্রের ছোট ছেলে। হিন্দু রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের নিয়মানুসারে অন্দর মহলেই থাকতেন। তখনও তিনি মা হননি তাই হাতে অফুরন্ত অবসর। এই বন্দী জীবনে মুক্তির স্বাদ নিয়ে এলো গ্রামবাসীর একটি প্রস্তাব। রমেন্দ্র মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খোলা হয়। গ্রামের সবাই দাবি জানালেন তাঁদের নিরক্ষর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব নিতে হবে জমিদার বাড়ির বউকে। বাড়ি থেকে অনুমতিও মিললো কিন্তু বাড়ির চার`শ গজ দুরের স্কুলে যেতে হয় গরুর গাড়ি চড়ে। মাত্র তিনজন ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি শুরু হলেও তার আন্তরিক পরিচালনায় তিনমাসের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০-এ। এর মধ্যে তিনি হেঁটে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি আদায় করে নেন। আজন্ম প্রতিবাদী এভাবেই অন্দর মহল থেকে বের হয়ে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন বৃহত্তর সমাজ সেবার কাজে। হয়ে ওঠেন এলাকার রাণীমা।

তিনি স্বামী রমেন্দ্র মিত্রের কাছে জমিদার ও জোতদারের হাতে বাংলার চাষীদের নিদারুণ বঞ্চনা শোষণের কাহিনী শোনেন। জানেন এই শোষণের বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলনের প্রচেষ্টার কথা। কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্র এর আগেই জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ও মোহ ত্যাগ করে কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। রমেন্দ্র মিত্র, ইলা মিত্রকে তাঁদের কাজে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। বেথুন কলেজে বাংলা সাহিত্যে বি.এ সম্মানের ছাত্রী তখন থেকেই রাজনীতির সাথে তার পরিচয়। নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ। সময়টা ১৯৪৩ সাল। ইলা সেন কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হন। হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে সে বছরই মহিলা সমিতি আন্দোলন শুরু করে। সমিতির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি সনাতনপন্থীদের যুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অনেক প্রচার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি নামক সংগঠনের মাধ্যমে নারী আন্দোলনের এই কাজ করতে করতে তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। ছাত্রী জীবনেই যেহেতুকমিউনিস্ট আদর্শের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাই স্বামীর আদর্শ ও পথ চলার সাথে সহজেই নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। রক্ষণশীলতার আগল ভেঙ্গে কৃষকের অধিকার আদায়ে জড়িয়ে পড়লেন জমিদার বাড়ির বউ। ইলা সেন থেকে তিনি ততদিনে ইলা মিত্র।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ বাংলা ১৩৫০ সনে সমগ্র বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষের সময় কৃষকের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে মরিয়া হয়ে ওঠে শোষিত কৃষকেরা। তিনভাগের দুইভাগ ফসল কৃষকের এই দাবি নিয়ে বেগবান হয় তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে দিনাজপুরে কমরেড হাজী দানেশের প্রচেষ্টায় শুরু হয় যুগান্তকারী তে-ভাগা আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি প্রান্তিক চাষীদের সংগঠিত করে আন্দোলনকে জোরদার করতে থাকে। পার্টি থেকে রমেন্দ্র মিত্রকে গ্রামের কৃষক সমাজের মধ্যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে কলকাতা থেকে নিজ গ্রাম রামচন্দ্রপুর হাটে পাঠালে স্বামীর সাথে ইলা মিত্র সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন।

১৯৪৬-১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে হয়ে ওঠেন তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা। তেভাগার দাবীতে সাঁওতাল বিদ্রোহের শেষের দিকে ইলা মিত্র সাঁওতাল যুবতীর ছদ্মবেশে আত্মগোপনে যাবার সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের রহনপুর রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের পর ইলামিত্রের উপর যে পৈশাচিক ও বর্বরোচিত নির্যাতন করা হয়েছিল, ইতিহাসের পাতায় তা জঘন্যতম ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিচার শুরুর পূর্বে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও তাঁর উপর পৈশাচিক নির্যাতন সম্পর্কে আদালতে ইংরেজি ভাষায় লিখিত জবানবন্দি পেশ করেন। যা ইতিহাসে ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক জবানবন্দি নামেই পরিচিত। এ সময় স্বামী রমেন মিত্র আত্মগোপনে চলে যান। সেই সময় তাঁদের কমিউনিস্ট পার্টিও নিষিদ্ধ হয়েছিল। ১৯৫০ সালের শেষ হতে ১৯৫১ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত বিচারকাজ পরিচালিত হয়েছিল। বিচারে ইলা মিত্র এবং তাঁর সহকর্মী আজহার হোসেন, অনিমেষ লাহিড়ী ও মাতলা মাঝির ২০ বছর করে জেল হয়েছিল। বিচার শেষে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় প্রদানের পর কমরেড ইলা মিত্রকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের এক নির্জন সেলে রাখা হয়।

তাঁর মুক্তির দাবিতে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বিভিন্নমহল সোচ্চার হলেও তৎকালীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ সরকার দাবী কানে তোলেনি। এর কিছুদিন পরে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যক ভোটে বিজয় লাভ করে। মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে। যুক্তফ্রন্টের নেতা শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হন। একপর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ইলা মিত্র প্যারোলে মুক্তি পান। প্যারলে মুক্তি লাভের পর ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে রমেন-ইলা মিত্ররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কলকাতায় চলে যান।

বর্ণাঢ্য ও সফল রাজনৈতিক জীবনে ইলা মিত্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার পরপর চারবার সদস্য এবং দু’বার বিধান সভায় কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। নারী জাগরণের অগ্রদূত, মহিয়সী নারী ইলা মিত্র শিক্ষা আন্দোলনে এবং নারী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ-প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৬ সালের ৪ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে এসেছিলেন ইলা মিত্র। তে-ভাগা আন্দোলনের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ইলা মিত্রকে ১৯৯৬ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় প্রাণঢালা সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থেকে ধরা পড়েছিলেন রানীমা সেখানে আসেন ছেড়ে যাবার ৪২ বছর পর। ৬ নভেম্বর রাজশাহীর ভূবন মোহন পার্কে এবং দুপুর ২টার দিকে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থান নাচোল কলেজ মাঠে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে লাখো মানুষের সমাগম হয় রাণীমাকে এক নজর দেখবার জন্য। যে স্মৃতি তিনি ২০০১ সালের ১৩ অক্টোবর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্মরণ করেছেন।

ইলা মিত্র ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বৃটিশ সরকারের অধীন বাংলার একাউন্টেন্ট জেনারেল। তে-ভাগা আন্দোলনের নেত্রী নাচোলের রাণীমা ইলা মিত্রের ১৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তার প্রয়াণ দিবসে রইল হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে লাল সালাম।


%d bloggers like this: