ঢাকা, বুধবার , ২৪ জুলাই ২০১৯, | ৯ শ্রাবণ ১৪২৬ | ২০ জিলক্বদ ১৪৪০

আমার দুষ্টুমি দরকার —মিজ আয়ারল্যান্ড প্রিয়তি

বাংলাদেশের মেয়ে প্রিয়তি। জন্ম ১৯৮৯ সালের ৭ আগস্ট, ঢাকার ফার্মগেট এলাকায়। শূন্য দশকের শুরুতে পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। সেখানেই চুকিয়েছেন পড়াশোনার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ। পেশাজীবনের শুরু টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটে। এরপর যুক্ত হন মাল্টিন্যাশনাল স্টক ব্রোকিং কোম্পানিতে। সেই অধ্যায় শেষে পাকাপোক্ত আসন গেড়েছেন বিমান চালক হিসেবে। তবে এসবকে পাত্তা না দিয়ে মাকসুদা আকতার প্রিয়তি নিজের নামের পাশে জুড়ে নিয়েছেন ‘মিজ আয়ারল্যান্ড’ তকমা। এটাই শেষ নয়, পেয়েছেন মিজ আয়ারল্যান্ড আর্থ ও মিস ইউনিভার্সেল রয়্যালিটি (২০১৩), মিস হট চকলেট, মিজ ফটোজনিক ও সুপার মডেলের (২০১৪) খেতাব। সামনে অংশ নিচ্ছেন মিস আর্থ ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতায়। স্কাইপে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিশুক চৌধুরীআজ-এর জন্য ছবি তুলেছেন ইতালিয়ান আলোকচিত্রী আন্দ্রেআ গুয়েট্টি (Andrea Guetti)।

Prioty G2

ঢাকা ছাড়লেন কবে? 

খুব চঞ্চল ছিলাম তো! তাই ও-লেভেল চলাকালীন সময়েই (২০০০ সাল) মা আমাকে আয়ারল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়..।

দেশে তো মডেলিং করতেন..। তখন মডেলিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কতটুকু  ছিলো?

হ্যাঁ। খুব ছোট থাকতেই মডেলিং শুরু করি। সে সময় সখের বসেই মডেলিং করতাম। পড়াশোনার চাপ ছিল। ফাঁকা সময় পেলেই মডেলিং করতাম। এটা আমার ভাল লাগার কেন্দ্রবিন্দু।

অ্যায়ারল্যান্ড অধ্যায় নিয়ে বলুন। সেখানে জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু, মানিয়ে নেওয়া, ব্যস্ততা- এসব নিয়ে…

শুরুতে ঘন ঘন বাংলাদেশে আসতাম। আ্যায়ারল্যান্ডে খুব একা লাগতো।  এখানকার জীবন খুব কঠিন ছিল। প্রথম দিকে পড়াশোনা আর খণ্ডকালীন কাজ করতাম। প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তিটার দিকেই বেশি নজর ছিল। সবকিছুই মানিয়ে নিতে সময় লেগেছে। আ্যায়ারল্যান্ডের জীবনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়েছি।

আপনার পড়াশোনা ও কর্মজীবন সম্পর্কে বলুন…  

প্রথমে মাইক্রোসফট সার্টিফাইড সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার সম্পন্ন করে ডিপ্লোমা ইন অরগানাইজেশনাল ডেভলেপমেন্ট শেষ করি। তারপর ব্যবসায় ব্যবস্থাপনায় স্নাতক করি। শুরুতে কয়েক বছর মাল্টিন্যাশনাল স্টক ব্রোকিং কোম্পানিতে চাকরি করি। তার আগে ছিলাম মাইক্রোসফট কোম্পানিতে। মাঝখানে মা মারা গেলে কিছুটা হতাশ হই।  চাকরি ছেড়ে দিই। কয়েক মাসের জন্য বাংলাদেশে ফিরে আসি।

৩ মাস পরে আয়ারল্যান্ডে ফিরি। ফিরেই সিদ্ধান্ত নিলাম— জীবনকে নতুন করে সাজাবো। নতুন বলতে, নতুন চ্যালেঞ্জ। বৈমানিক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিলাম। শেষ করলাম। এখন ফ্লাইট ইন্সট্রাকটার হিসেবে কাজ করছি। পাশাপাশি এয়ারলাইন্স বৈমানিক হওয়ার চেষ্টা করছি।

Prioty S1

মডেল ও বৈমানিক, কোনটাকে পেশা হিসেবে নিতে চান?

দুটোই। মডেলিং তো চলবেই আর পেশা হিসেবে বৈমানিকই ভালো (হাসি)।

বৈমানিকের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়ের কোনো বিশেষ ঘটনা মনে আছে, যেটা মনে পড়লে অন্যরকম অনুভূতি হয়…

হ্যা, অনেক স্মৃতি আছে। সেসময় খুব কষ্ট করেছি।  কোর্সটা অনেক ব্যায়বহুল। স্টক ব্রোকিং কোম্পানিতে জব করার সময় যে টাকা জমিয়েছিলাম। মা বেঁচে থাকতে সেই টাকা দিয়ে ঢাকায় একটি জমি কিনি। বাংলাদেশ যেহেতু আমার শিকড়, তাই প্রথম বিনিয়োগটা সেখানেই করি।  ফ্লাইং কোর্সের খরচ যোগাতে বাংলাদেশে আসি জমিটা বিক্রি করতে। এসে দেখি জমিটা শক্তিশালি একজন ভূম্যিদস্যু দখল করেছেন। ফলে জমিটা বিক্রি করতে না পেরে মায়ের দেওয়া স্বর্ণ, আর কিছু ব্যাংক লোন নিয়ে কোর্সটা শেষ করি। তাই যখনই প্রশিক্ষণের জন্য ফ্লাইং-এ উঠতাম, তখনই মনে পড়ত— মায়ের শেষচিহ্ন হারিয়ে এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। ঘটনাটা আমার জন্য খুবই বেদনাদায়ক।

মিজ আয়ারল্যান্ড হয়ে ওঠার গল্পটা…

পড়াশোনা, চাকরি, বাসা— এগুলো সামলাতে গিয়ে একটা সময় অনুভব করি, জীবনটা রোবটিক টাইম বক্সের মত হয়ে গিয়েছে। ভাবলাম, অক্সিজেন দরকার। দুষ্টুমি দরকার। বিনোদন দরকার। তখনই পত্রিকায় মিজ আয়ারল্যান্ডের বিজ্ঞাপন দেখলাম। দেখতে যেহেতু আইরিশদের মতো না তাই প্রথমে ভেবেছিলাম অংশ নিব না! কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলাম, চেষ্টা তো করি। এরপর আবেদন করলাম। এক সপ্তাহের মধ্যে মেইল পেলাম, প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছি। তখন আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করলাম। বিভিন্ন ধাপে বাছাই শেষে টানা ছয়মাস পরে মিজ অ্যায়ারল্যান্ডের মুকুট জিতি।

Prioty G1

সামনে তো মিজ আর্থ ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। প্রস্তুতির কী খবর..?  

হ্যা। এ বছরের অক্টোবরেই জ্যামাইকায় অনুষ্ঠিত হবে মিজ আর্থ ইন্টারন্যাশনাল। সেখানে আয়ারল্যান্ডের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করব। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে একটা কোর্স করছি। অনুশীলন চলছে। আশা করছি, প্রত্যাশার ব্যতিক্রম হবে না!

ইতিমধ্যে আইরিশ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, কবে মুক্তি পাচ্ছে চলচ্চিত্রটি?

হ্যাঁ, আইরিশ সিনেমা ‘দ্যা ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর পরিচালক কাইয়ারন ডেভিইসের সাথে কাজ করেছি। মুভিটা এই বছরে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

দেশেও ভালো কাজের প্রস্তাব পেলে কাজ করবেন বলে জানিয়েছিলেন। এ পর্যন্ত কোন প্রস্তাব কি পেয়েছেন?

না, এখন পর্যন্ত গঠনমূলক ভালো কাজের প্রস্তাব পাইনি। ভালো কাজ হলে অবশ্যই করব।

মিডিয়া, প্রিয়তি, অতীত, স্বপ্ন নিয়ে কিছু বলুন…

অনেক বড় প্রশ্ন। এর সাথে পুরো জীবন জড়িত। ছোটবেলা থেকে মিডিয়া পছন্দ ছিল। কিন্তু পড়াশোনার দিকে ফোকাসড ছিল। পরিবারও চেয়েছে আমি যেন পড়াশোনা ঠিক রাখতে পারি। আল্লাহর রহমতে শেষ পর্যন্ত করতে পেরেছি। আমাদের মিডিয়া বলেন কিংবা মডেলিং বলেন, একসময় ঝড়ে পড়ে সবাই। কিন্তু জ্ঞানটা থেকে যায় শেষপর্যন্ত। আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি মডেলিং করেছি। স্বপ্ন হচ্ছে মানুষদের নিয়ে কাজ করা। যার জন্য ভিত্তি দাঁড় করাতে চাই। যেখানে মানুষ আমাকে চিনবে। অণুপ্রেরণা পাবে। আমি একজন পাইলট, মডেল এসবের পেছনের কারণ হচ্ছে আমার শক্ত আইডেন্টিটির জন্য। যাতে আমার সলভনেস থাকে। আরেকজন মানুষকে সার্ভ করতে পারি। আপাতত স্টেপ বাই স্টেপ এগুতে চাই। যেখান থেকে আমি আরো দশজন মানুষকে সার্ভ করতে পারি। স্ট্রংলি আমি যখন একটা জায়গায় পৌঁছব বা আমি এখন চাই যে, একজন কমার্শিয়ালি এয়ারবাস পাইলট বা ক্যাপ্টেন হব এমিরেটস কিংবা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মত বড় কোন এয়ারওয়াজের। সামনে যদি আল্লাহতায়ালা আরো মানুষকে সার্ভ করার তওফিক দেন তখনই তো আমি কিছু করতে পারব সামনে। মডেলিং বা মিডিয়া বলেন এটা একটা পরিচিতি দেয়, যেটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আমি যখন একটা জায়গায় যাব, নরমালি তখন আমাকে কেউ সেভাবে একসেপ্ট করবে না। কিন্তু একটা পরিচিতি থাকলে আমাকে তারা সহযোগিতা করবে। আমার সবার সহযোগিতা লাগবে। আমি একা একা তো কিছু করতে পারব না।

Prioty S2

আপনি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত। এ নিয়ে বাংলাদেশেও কাজ শুরু করেছেন। সংগঠনটির কার্যক্রম, লক্ষ্য কী?

আমি সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত আছি। ওরা কাজ করছে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে। সুবর্ণগ্রাম একটা ফাউন্ডেশন, ওরা নন প্রফিটেবল অরগনাইজেশন। নিজেদের ফান্ডিং থেকে বাচ্চাদের স্টাডি এবং খাবার সুবিধা দেয় সুবর্ণগ্রাম। আমার প্ল্যান আছে, যদি আল্লাহ আমাকে তৌফিক দেয়, আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হই তাহলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করব। সেটা বাংলাদেশেও হতে পারে কিংবা অন্য কোথাও হতে পারে। তাই তাদের সাথে আমার যুক্ত হওয়া। ঢাকায় আমি আরো একটি সংস্থার সাথে যুক্ত হয়েছি। এটা হচ্ছে রিক অ্যালবারেস্টনে। তিনি আমেরিকান। তার স্ত্রীর সাথে ঢাকায় এসেছিলেন। বাংলাদেশে দুঃস্থ বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করছেন। বিশেষ করে যেসব বাচ্চা ইট ভাটায় কাজ করছে, যারা স্কুল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, তাদের নিয়ে তিনি কাজ করছেন।

আপনার পরিবার সম্পর্কে বলুন…

ডাবলিনে আমার দুটো বাচ্চাকে নিয়ে আছি। ছেলে আবরাজ ও মেয়ে মনিরা। ওরা স্কুলে পড়ছে। এখানে তাদের নিয়ে দিন কেটে যায়। বাংলাদেশে আমার সবাই আছে। ৬ ভাই ঢাকাতেই থাকেন। আর বাবা-মা মারা গেছেন অনেক আগেই।

আজ/এমসি/১০৩

ফেসবুকে আজ facebook/aaj24fan


%d bloggers like this: