ঢাকা, শনিবার , ২৩ মার্চ ২০১৯, | ৯ চৈত্র ১৪২৫ | ১৫ রজব ১৪৪০

আলুর দেশে কৃষকের হাসি

আগাম জাতের আলুতে ভরে গেছে ক্ষেত। ভালো আবহাওয়ার কারণে এবার বাম্পার ফলন  হয়েছে। এরই মধ্যে  তোলার কাজ শুরু করেছেন কৃষকরা। দেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাটের কৃষকদের চোখে-মুখে এখন হাসির ঝিলিক ।

এই জেলার আগাম আলু ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। চলতি বছর জেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে এ সবজি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাত চাষ হয়েছে ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে।

আবহাওয়া অনুকুল আর রোগ-বালাই কম হওয়ায় ক্ষেতের ফলনও বেশ ভালো আর আগাম আলুর ভালো দর পেয়ে উচ্ছ্বসিত এ জেলার কৃষকরা। দরপতন না ঘটলে এবার গত কয়েক বছরের ক্ষতি কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াবেন এমনই আশাবাদ কৃষকদের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে ২ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ লাখ মেট্রিক টন।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে দিনদিন। কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন আলু ক্ষেতে। গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে চলতি মৌসুমে কৃষকরা বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ বা ধার দেনা করে লাভের আশায় অধিকাংশ জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ।

এ সব জমিতে গ্র্যানোলা, ডায়মন্ড, মিউজিকা, রোমানা লাল, দেশি পাকড়ি লাল, এস্ট্রোরিক, কার্ডিনাল, ক্যারেজ ও লরা জাতের আলু চাষ করেছে কৃষকরা। অন্য বছরের তুলনায় এবার আবওহাওয়া অনুকূলে থাকায় সঠিক সময়ে আগাম জাতের আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে।

কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের গোলাম রব্বানী ক্ষেতলাল উপজেলার দাশড়া গ্রামের কৃষক ইয়াসিন আলী জানান, আগাম জাতের আলু তুলে বিক্রি করে সবকিছু মিটিয়ে এবার মোটামুটি বিঘা (৩৩ শতাংশ) প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাভ করছেন। দাম বেশি আবার বাজারে নতুন আলুর চাহিদাও বেশি। তাই এবার আলু তুলে হাটে নিয়ে যাওয়ার আগেই মাঠ থেকেই সরাসরি আলু বিক্রি করছেন তারা। এতে করে তাদের কেয়ারিং খরচও লাগছে না। গত বছরের ন্যায় এবার আলু বেচা-কেনার চিত্রই পাল্টে গেছে। জমি থেকে আলু উঠানোর আগেই বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তারা।

বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) গ্র্যনোলা জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৬৫ টাকা, ডায়মন্ড জাতের আলু ৬৫০ থেকে ৬৬৫ টাকা, মিউজিকা জাতের আলু ৫৯০ থেকে ৬০০ টাকা, রোমানা লাল জাতের আলু ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা, ক্যারেজ জাতের আলু ৬৫০ থেকে ৬৭০ টাকা এবং দেশি-পাকড়ি লাল জাতের আলু ৭২০ থেকে ৭৫০ টাকায়। কৃষকরা এবার আলু উৎপাদনসহ অন্যান্য খরচ মিলে যে পরিমাণ ব্যয় করেছে, বর্তমানে বাজারে আলুর চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় সবকিছু ব্যয় বাদ দিয়ে মোটামুটি বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লাভ করছেন। আগাম জাতের আলু বিক্রি করে এবার হাসি-খুশিতে এলাকার কৃষকরা।

সদর উপজেলার মাঠ থেকে সরাসরি পাইকারদের কাছে আগাম জাতের আলু বিক্রি করেন আওশগাড়া গ্রামের কৃষক আশরাফ মিয়া।

তিনি বলেন, ‘এবার আলুর চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় মোটামুটি লাভ টিকছে কৃষকদের। প্রতি বিঘায় আলুর উৎপাদন হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ মণ। ৪ বিঘা জমির মিউজিকা আলু বিক্রি করে সবকিছু বাদ দিয়ে তার প্রায় ১ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। আরও ১৫ বিঘা জমিতে আলু আছে। আগামী ২/১ দিনের মধ্যে তার সব আলু বিক্রি হবে। বর্তমানে যে দামে আলু কেনা-বেচা হচ্ছে, তাতে ১৯ বিঘা জমির আলুতে তার লাভ টিকবে প্রায় ৪ লাখ টাকা। আলুর দাম বাজারে কম-বেশি যাই হউক, যদি বাজারে চাহিদা থাকে তাহলেই কৃষকরা খুশি।’

কালাই উপজেলার পুনট বাজারের আড়ৎদার মিঠু ফকির বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এবার আগেই বাজারে নতুন আলু নেমেছে। চাহিদা ও দামও এবার বেশি। এলাকা থেকে আলু কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমরা আলু পাঠাচ্ছি। কৃষকদের পাশাপাশি আমাদেরও মোটামুটি লাভ টিকছে। বাজারে নতুন আলুর চাহিদা প্রচুর। প্রতি দিন ৮ থেকে ৯ ট্রাক আলু বিভিন্ন মোকামে পাঠাতে হচ্ছে। তাই বাজারে না গিয়ে মাঠ থেকেই আলু কিনে সরাসরি মোকামগুলোতে ট্রাক যোগে পাঠানো হচ্ছে।’

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সুধেন্দ্রনাথ রায় জানান, চলতি বছর প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে গতবারের তুলনায় এবার আলু ভালো ফলন হয়েছে। এবার কৃষি বিভাগের পরামর্শে আলু চাষ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছে বলেও জানান স্থানীয় কৃষি বিভাগারে প্রধান কর্মকর্তা।

আলুর বর্তমান বাজার মূল্য স্থিতিশলি রাখতে বিকল্প খাদ্য হিসাবে আলুর ব্যাবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি আলু রফতানির ওপর জোর দাবি জানান জেলার কৃষকরা।

আজ ২৪ প্রতিনিধি, জয়পুরহাট


%d bloggers like this: