ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৫ মুহাররম ১৪৪০

একদিন বিশ্ব ফুটবলে তাক লাগাক আমাদের মেসি-নেইমাররা

“সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল
কি মধু আছে ওই তোমার নামেতে আহা ফুটবল…”
‘ধন্যি মেয়ে’ সিনেমার জন্য প্রখ্যাত গায়ক মান্না দে’র গাওয়া এই গানটিই সম্ভবত ফুটবল নিয়ে বাঙালির সেরা গান। বাঙালির নিজস্ব দেশ বাংলাদেশ কিংবা ভাগের দেশ ভারতে ফুটবল এখন গৌন। বরং ক্রিকেট এখানে রাজত্ব করছে। আবার ক্রিকেট বিশে^ও রাজত্ব করছে বাংলাদেশ ও ভারত। সে বিবেচনায় ক্রিকেট নিয়ে বাঙালির মাতামাতি থাকার কথা বেশি। যেখানে ফুটবলে বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থান বিশ^ র‌্যাংকিংয়ে ১৯৪, সেখানে বিশ^ ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর নিয়ে এখানে উন্মাদনা তো থাকার কথা না। কিন্তু ওই যে ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’! এখানে হালের শহুরে নেট প্রজন্ম বাদ দিলে এমন ক’জনাকে পাবেন যে কিনা কাদাজলে নেয়ে-মেখে ফুটবলে লাথি মারে নি! আর দশটা খেলায় বাঙালির দুনিয়াসেরা হওয়ার সুযোগ থাকলেও এবং নিকট ভবিষ্যতে বাঙালির ফুটবলে কোনো আশা না থাকলেও ফুটবলীয় আবেগের কমতি এখানে হবে না সহসাই এটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়।

আধুনিক ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা

 

সেই ষাটের দশকের পেলেকিংবা আশির দশকের জিকোদের আমলের ব্রাজিলের লাতিন সাম্বা তালের ছন্দময় ফুটবল দেখেই তো বাঙালির ব্রাজিলপ্রীতির সূচনা। আর নিকট অতীতের রোনালদো-রোমারিও-রোনালদিনহো-কাকা… বাঙালিকে ব্রাজিল চিনিয়েছেন ওঁরাই। চোখজুড়ানো পাসিং ফুটবল, ফুটবলের যতোপ্রকার নান্দনিকতা তা সবই ব্রাজিলের সৃষ্টি। পাঁচবার বিশ^কাপ জিতে আর এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সবক’টি বিশ^ আসরে খেলে ফুটবলের রাজা এখন পর্যন্ত ব্রাজিলই। আবার আশির দশকের ফুটবলের বিশ^নায়ক আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা। অবসরের এতো পরে এসেও এখনও যার ফুটবল-পাগলামি উপভোগ করে আনন্দলাভ করেন খোদ বিপক্ষ-শিবিরের সমর্থকেরাও।আধুনিক ফুটবলের নায়ক বলতেই তো ম্যারাডোনা। সে ‘ঈশ^রের হাতের গোল’ দিয়েই হোক বা ছোটখাটো নাদুসনুদুস ওই পায়ের ঝলকানিতেই হোক, ফুটবলকে মহিমান্বিত করেছেন তো তিনিই। তাই ম্যারাডোনাই যেন সর্বকালের ফুটবল-ঈশ^র! আর হাল আমলের মেসি তো গত এক দশকের রাজা। বাঙালির আর্জেন্টিনাপ্রীতির নায়ক তো তারাই! এদের কারণেই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের মানুষের ফুটবল দর্শনের মূল চাবিকাঠী। বাকিদের হিসাব কেবল ভগ্নাংশেই।

২০০৩ এ সাফ জেতা বাংলাদেশ নামতে নামতে এখন বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ১৯৪

 

লাতিন ফুটবল বাদ দিলে ইউরোপের পর্তুগালেরক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও কম যান না। গত দশকের ফুটবল রাজত্বের সমান অংশীদার মেসির সাথে তিনিও।কিন্তু আফসোস! মেসি বা রোনালদোর কেউ এখন পর্যন্ত বিশ^কাপটাই ছুঁয়ে দেখতে পারলেন না! এবারের চলতি আসরে ফুটবল কি তার মহিমা দিয়ে দারুণ কিছু দেখাবে যেখানে বিশ^কাপ উঠবেদুই রাজা মেসি বা রোনালদোর কারো হাতে! ফাইনালে তো তাদের মুখোমুখি হবার আর কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রবল পরাক্রমশালী ফ্রান্সের বাধা টপকেখুড়িয়ে খুড়িয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা এবারের আর্জেন্টিনা আর আরেক লাতিন শক্তি উরুগুয়েকে পরাস্ত করে পর্তুগাল টিকে গেলেও কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়ে বাদ পড়তে হবে দুই রাজার অন্তত যে কোনো একজনকে। কিন্তু তারপরও হয়তো তাদের কেউই ফাইনাল অব্দি পৌঁছাতেই পারবেন না। কারণ অন্য প্রান্তে ব্রাজিলও যদি আরো দুটো ম্যাচ জেতে তো মেসি বা রোনালদোর মুখোমুখি হবে নেইমারের ব্রাজিল। মেসির আর্জেন্টিনা কিংবা রোনালদোর পর্তুগাল যেখানে একক নায়ক-নির্ভর দল, সেখানে অধুনা বিশে^র তৃতীয় সেরা নেইমারকে বাদ দিলেও দলগত শক্তিতে এবার প্রচ- বলীয়ান ব্রাজিল। আবার এই প্রান্তে রয়ে যাচ্ছে বেলজিয়াম। আগে কখনো মুকুট অর্জন না করলেও এবার যেন তারা এসেছেই মুকুটের লক্ষ্যে। খেলছেও দুর্দান্ত। তাই ‘টিম সেকেন্ড রাউন্ড’ মেক্সিকোর বাধা উৎরাতে পারলেও ব্রাজিল যে পড়বে শক্তিশালী বেলজিয়ামের মুখেই। কারণ দ্বিতীয় রাউন্ডে এশিয়ার একমাত্র প্রতিনিধি তুলনামূলক দুর্বল ও আশাহীন জাপানকে পরাস্ত করতে বেলজিয়ামের তো বেগ পাওয়ার কথাই নয়। কী হবে!
অপরপ্রান্তে দ্বিতীয় রাউন্ডে মুখোমুখি হচ্ছে সাবেক বিশ^ চ্যাম্পিয়ান স্পেন ও স্বাগতিক রাশিয়া। স্বাগতিকরা খেলার মাঠে দুর্বল হলেও প্রথম রাউন্ডে যে ঝলকানি দেখিয়েছে, তা ধরে রাখতে পারলে এবারের তুলনামূলক খর্বশক্তির স্পেন কাবু হলেও তো হতে পারে! তবে তাদের যেই জিতুক কোয়ার্টার ফাইনালে তাকে মুখোমুখি হতে হবে ক্রোয়েশিয়া অথবা ডেনমার্কের। ডেনমার্ক প্রথম রাউন্ডে ততোটা শক্তিমত্তা দেখাতে না পারলেও আরেক বিশ^নায়ক লুকা মডরিচের ক্রোয়েশিয়া যে আর্জেন্টিনাকে কাবু করে এসেছে প্রথম রাউন্ডেই। তাও একেবারে তিন গোলে! ডেভর সুকারের উত্তরসূরীরা এবার না জানি কোন ঝলকানি দেখায় শেষ পর্যন্ত! সুকার তো একবার ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে তুলে শেষে তৃতীয় অবস্থানে থেমেছিলেন। অপরদিকে তুলনামূলক দুর্বল সুইডেন ও প্রথম রাউন্ডে ব্রাজিলকে রুখে দেওয়া সুইজারল্যান্ড মুুখোমুখি হচ্ছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। আরেক খেলায় শক্তিশালী ইংল্যান্ড ও লাতিন শক্তি কলম্বিয়া মুখোমুখি হবে।
ফলে পূর্বশক্তির হিসাবনিকাশ বিবেচনায় নিলে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ফ্রান্সের মুখোমুখি ফাইনাল খেলতে হবে স্পেন বা ইংল্যান্ডকে। সেখান থেকে ইউরোপীয় কেউ নাকি লাতিন কোনো শক্তি বিশ^কাপ জয় করে নেবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপ থেকে লাতিন কোনো দেশ কোনোদিন কাপ নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু রহস্যময় বিশ^নেতা ভøাদিমির পুতিনের দেশ রাশিয়ায় চলমান আরো রহস্যময় এবারের বিশ^কাপ আসর তো কোনো পরিসংখ্যান মেনে চলছে না। সব পূর্বানুমান ওলটপালটের আসর এবার।
নইলে কি আর জার্মানির মতো হটফেভারিট ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ান দল যারা কিনা আবার গত কয়েক বছর ধরেই ফিফা র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থানটি ধরে রেখেছে, তারা কি মেক্সিকো আর দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দুর্বল শক্তির দলের কাছে ধরাশায়ী হয়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে পারে? ব্রাজিলের মতো শক্তিমানকে রুখে দিয়েছে এবার সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনাকে রুখেছে নবাগত আইসল্যান্ড। আর্জেন্টিনা আবার হেরেছে ক্রোয়েশিয়ার কাছে, তাও আবার সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে একেবারে তিন গোলে! পোলিশদের মতো শক্তিশালী দলকে পরাস্ত করে প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় করে দিয়েছে সেনেগাল ও কলম্বিয়া। এসবই হচ্ছে এবার। এমনই রহস্যে মোড়া বিশ^কাপ এবার। তাই পরিসংখ্যান নয়, প্রতিদিনের মাঠের খেলাতেই নিষ্পত্তি হবে জয়-পরাজয়ের। সেখানে পুরনো শক্তি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, উরুগুয়ের কেউ নাকি নতুন শক্তি বেলজিয়াম বা ক্রোয়েশিয়া শেষ পর্যন্ত আগামী চার বছরের জন্য মুকুটের অধিকারী হবেÑ তা জানতে রাশিয়ার মাঠে চোখ রাখতেই হবে আগামী ১৫ জুলাই মধ্যরাত পর্যন্ত। ফুটবল তার কোন সৌন্দর্য দিয়ে এবারের বিশ^ আসরকে সাজিয়ে তুলবে তা আর কেউ বলতে পারে না।

এমন ভালোবাসার পাগলামি কেবল বাংলাদেশে সম্ভব

 

এদিকে বাংলাদেশজুড়ে চলছে ফুটবল নিয়ে হরদম মাতামাতি। তার কেন্দ্রে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তৃতীয় শক্তি জার্মানি তো ইতোমধ্যেই বিদায়! আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু স্পেন, পর্তুগাল কিংবা বেলজিয়াম। তবে যে যে দলই সমর্থন করুক না কেন, আয়োজক রাশিয়ার প্রতি আবার বেশিরভাগেরই একটা প্রচ্ছন্ন কোমল স্থান আছে এবার। সেটা রাজনৈতিক কারণেই। অংশগ্রহণকারী বত্রিশের মধ্যে এমন বন্ধু আর কে আছে?
শোনা যায়, বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে যে মাতামাতি, বিশেষ করে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল নিয়ে, এমন উন্মাদনা নাকি খোদ ওই দুটি দেশেও চলে না। এদেশের মানুষ ভালোবেসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙায়। কেউ কেউ তো জমি বেঁচে পছন্দের দলের পতাকা কেনে! কেউ পাঁচ কিলোমিটার লম্বা জার্মানির পতাকা বানায় তো কেউ আবার পুরো একটা বহুতল বাড়িকেই বানিয়ে ফেলে ব্রাজিলের পতাকা। আবার কেউ কেউ মেসি মেসি স্লোগানে মিছিল বের করে। ফুটবল এখানে এমনই ভালোবাসার ধন। এগুলো দেখতে চলে আসেন আবার ওইসব দেশের কর্তারা। এই তো ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাসের কর্তারা গেলেন মাগুরার সেই পাঁচ কিলোমিটার জার্মানির পতাকা ও পতাকাওয়ালাকে দেখতে। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনাভক্তদের উন্মাদনার মিছিলের ভিডিওচিত্র নিজের টুইটারে পোস্ট করে কৃতজ্ঞতা জানালেন বিশ^তারকা লিওনেল মেসি। আর ব্রাজিলের একটা টিভি চ্যানেল তো পুরোদস্তুর একটা টিম পাঠিয়ে কাভার করলো ঢাকা-মানিকগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জের ব্রাজিলপাড়াগুলো। সাথে দেশটির রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। আবার ফুটবল নিয়ে এই উন্মাদনার মধ্যে ঘটে গেছে কিছু দুর্বিসহ দুর্ঘটনাও। উন্মাদনা কোথাও কোথাও এমনই মাত্রা ছাড়িয়েছে যে কোপাকুপির ঘটনাও ঘটে গেছে। তবে এর কতোখানি সত্য আর কতোখানি রঙ মাখানো সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই!
এই যে বাঙালির ফুটবল-উন্মাদনা, তা সত্বেও আমাদের নিজেদের ফুটবলের এতো করুণ অবস্থা কেন? আমরা আগে অন্তত সাফ ফুটবলে শীর্ষ অবস্থানে ছিলাম, সেখান থেকে নামতে নামতে নামতে এতো নিচে এসে ঠেকলাম কেন? কেন আজ দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলংকা, নেপালের মতো দেশগুলোও আমাদের ছাড়িয়ে গেলো? কেন আমরা আজ ফিফা র‌্যাংকিংয়ে একেবারে ১৯৪ এ এসে দাঁড়ালাম? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাও তো জরুরি। এই যে ফুটবল নিয়ে একটা জাতির এই মাত্রায় উন্মাদনা যেটা বিশে^র আর কোথাও সম্ভবত নেই, তাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ফুটবল শক্তির জাগরণ কি একেবারেই সম্ভব ছিলো না? আমাদের ফুটবল কর্তারা ফুটবলের চেয়ে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে এতো ব্যস্ত থেকেছেন যে তারা ফুটবলের দিকে মনোযোগী হওয়ার মতো সময়ই পাননি! কেন এমন হলো? এখন বোধহয় সময় এসেছে এসব ব্যর্থতার সুলুকসন্ধানের। যখন খোদ আর্জেন্টিনার মানুষেরা তাদের দেশের ফুটবল ফেডারেশনের কাছে দরখাস্ত করছেন বাংলাদেশের সাথে মেসিদের একটা প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করে তাদের দায়শোধ করতে, যখন ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত ঘোষণা দিচ্ছেন তাদের আশির দশকের তারকা জিকোকে বাংলাদেশে আনবেন এবং বাংলাদেশের স্কুল ফুটবলকে তারা দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা করে দায়শোধের তাগিদ অনুধাবন করছেন, তখন আমাদের কর্তাদের দায় অনুধাবনের কোনো তাগিদই কি জন্মাবে না?

 

একদিন আমাদেরও হবে মেসি-নেইমার

ফুটবলের প্রতি বাঙালির এ ভালোবাসার প্রতিদান বাংলাদেশ পাক। একদিন আমাদেরও মেসি, হিগুয়েন, আগুয়েরো, নেইমার, জেসুস, কৌতিনিয়োরা বিশ^আসরে তাক লাগিয়ে দিক। ফুটবলের জয় হোক।

লেখক- বাপ্পাদিত্য বসু : প্রাক্তন সভাপ‌তি, বাংলা‌দেশ ছাত্র মৈত্রী


%d bloggers like this: