ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

কোটা বিরোধিতার নেপথ্যে: শেখ হাসিনা টার্গেট!!

স্যোশাল মিডিয়া জুড়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগত আক্রমন করার কিছু বক্তব্য, স্ট্যাটাসের স্কিন শর্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া রাশেদ খান ২৭ জুন সন্ধ্যা ৮টায় ফেইসবুক লাইভে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলে ‘মনে হচ্ছে তার বাপের দেশ, সে একাই দেশের মালিক। তিনি যা ইচ্ছা তাই বলবেন আর আমরা কোন কথা বলতে পারবো না’।

আবার বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করা উম্মে হাবিবা বেনজির ৩ জুলাই একটি মানববন্ধন থেকে বলেন, শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের কথা বলে ঔদ্বত্য দেখাতে পারেন না। আবার সাথে সাথে উম্মে হাবিবা আরও বলেন, এই ঔদ্বত্য তিঁনি দেখাতেও পারেন। কারণ তিঁনি (শেখ হাসিনা) নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নন! ফলে তাঁর যেকোনো ধরনের ফ্যাসিস্ট ভাষা প্রয়োগ করতে পারেন সংসদে দাঁড়িয়ে!

এই উম্মে হাবিবা আরও বলেন, এই রকম প্রতারক মাদার (শেখ হাসিনা) আমরা কখনো দেখিনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে আমরা লজ্জায় মরে যাই যে, এই রকম একজন প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) বাংলাদেশে আছেন!

ফেসবুকে ভাইরাল করা আরেকটি স্কিন শর্ট স্ট্যাটাসের ভাষা এতোটাই নোংরা যা এখানেও তুলে ধরতে আমার বিবেক বাঁধা দিচ্ছে। যিঁনি এটি ফেসবুকে ভাইরাল করেছে তাঁর নাম শামীমা বিনতে রহমান। এই শামীমা বিনতে রহমান আবার গণমাধ্যমেও কাজ করেছেন।

এই তিনজনের বক্তব্য, ফেসবুকের স্ট্যাটাস এতোটাই ভাইরাল হয়েছে যে, আপনাদের খুঁজে পেতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তাঁদের একজন রাশেদ খান যে সরাসরি কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। উম্মে হাবিবা বেনজির এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত আর গণমাধ্যমে কাজ করা শামীমা বিনতে রহমান এই আন্দোলনের সমর্থক।

কোটা আন্দোলনকে ঘিরে এখানে উল্লেখিত ব্যক্তিদের বক্তব্যই শুধু নয়, এই আন্দোলনকে যাঁরা সমর্থন দিয়েছে, আন্দোলনের পক্ষে যাঁরা জনমত তৈরির কাজ করেছে; স্যোশাল মিডিয়াতে তাঁদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমন, মিথ্যাচার, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নিয়ে ট্রল করার নোংরামীগুলো; রীতিমত তাঁদের মুল উদ্দেশ্যকে পরিস্কার করে তুলেছে।
এখানেও তাঁরা বসে থাকেনি, রাজাকারদের পক্ষে ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করতে বিভ্রান্ত হওয়া কিছু সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে ‘আমি রাজাকার’ লেখা টি-শার্ট পড়িয়ে আন্দোলনে নামিয়ে দিয়েছে। মুখমন্ডলে, হাতের ট্যাটুতে ‘আমি রাজাকার’ লিখে ছেলে-মেয়েদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে রাজাকার বাহিনীর ৭১-এর বর্বর কর্মকান্ডের পক্ষে সুকৌশলে নতুন প্রজন্মের ভিতর ইতিবাচক মনোভাব তৈরির কাজটিও তাঁরা করার চেষ্টা করেছে। যদিও আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহকৃত তথ্য-উপাত্তে পরে উঠে আসে, ‘আমি রাজাকার’ ‘আমি গর্ববোধ করি’-এই ধরনের লেখা বহনকারী প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ে যথাক্রমে ছাত্রশিবির ও ছাত্রীসংস্থার সক্রিয়কর্মী।

১৯৯৭ সালের জামাত-শিবিরের মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী এই আন্দোলন ২০১৮ সালে নিয়ে এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কোটা সংস্কারের নামে আন্দোলন শুরু করলেও ধীরে ধীরে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কাঁরা আছে, কারা এই আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে, কাঁরা এর পিছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছে, কোন নেতা লন্ডন থেকে ফোনালাপের মাধ্যমে অর্গানাইজড করার নিদের্শ দিয়েছিল, কে বা কাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে লাশের রাজনীতির চর্চা করার আলোচনা করেছিল-এগুলোও এখন আর অজানা নয়।

আর সে পরিকল্পনা অনুযায়ী কোটা সংস্কারের নামে একটি আন্দোলন দাঁড় করানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এখানে যদি শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন করা হলে কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নোংরা মন্তব্য করা হতো না। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নিয়ে বানোয়াট-বিভ্রান্তকর কথা ভাইরাল করত না। কোটা পদ্ধতির কারণে শুধু মেধাহীনরা চাকরি পাচ্ছে আর মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে-এই ধরনের অযৌক্তিক ও পরিকল্পিত মিথ্যাচার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার অপকৌশল গ্রহণ করত না।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, সমর্থক, জনমত তৈরিকারক, অর্থ বিনিয়োগকারীসহ সবাই বেশ ভালো করেই জানে- বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মুখে যা বলে তা বাস্তবায়ন করেই ছাড়েন। তাই এখন ভিন্ন আঙ্গিকে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। কারণ, তাঁদের মুল উদ্দেশ্য কোটা সংস্কার নয়। আর কোটা সংস্কারের পক্ষে এই আন্দোলন করা হলে শেখ হাসিনা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রকাশ পাওয়ার পরেও দেশের বিভিন্ন জেলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা পদ্ধতি রাখতে হবে-এই ধরনের কোনো আহ্বান বা অনুরোধ শেখ হাসিনার প্রতি আন্দোলনরত কোনো পক্ষই করেনি।

আবার এটি যে নিতান্তই কোটা সংস্কারের আন্দোলন সেটিও স্পষ্ট হয় যখন মুক্তিযোদ্ধা কোটাও বাতিলের আওতায় চলে আসে। ১২ এপ্রিল বেলা সোয়া ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক কোটা প্রথা বাতিল নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বলেন, আন্দোলন প্রত্যাহার বা বাতিল নয়, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী কোটা ব্যবস্থা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করা হলো’।

পাঠক! এখন আপনিও প্রশ্ন করতে পারেন, আন্দোলনকারীরা কোটা প্রথা সংস্কার চেয়েছে, বাতিল নয়। তাহলে বাতিল করা নিয়ে তাঁদের কোনো কথা নেই কেন? বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের ব্যাপারে তাঁদের কোনো অনুযোগ, অভিযোগ বা আবদার নেই কেন? আবার তাঁদের ৬ দফা দাবির মধ্যে কোথাও নেই যে সেখানে বলা আছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমরা কোটা সংস্কার চেয়েছি; বাতিল নয়। প্লীজ! মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিল করবেন না।

তাঁরা জানে মুক্তিযুদ্ধের মুল আদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, করবে শেখ হাসিনা। তাই পরিকল্পনা করে এখন ব্যক্তিগত আঘাত দেওয়াকে বেছে নিয়েছে। তাঁরা এও জানে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মিথ্যাচার করলে আলোচনা-সমালোচনা হবে। শেখ হাসিনাকে আঘাত করে কথা বললে তাঁর অনুসারীরা বসে থাকবে না। তাই প্রথমে মিছিল, মিটিং বা তাঁদের কর্মসূচীগুলোতে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করলেও এখন আর করছে না। বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যে ঠাঁয় নাই-এই স্লোগানও দেখা যায় না। বরং মুক্তিযোদ্ধা কোটাই একমাত্র সমস্যা-এটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এখন সর্বশেষ তাঁরা বেছে নিয়েছে শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগত আক্রমন করে ফেসবুক লাইভে এসে কথা বলা, স্ট্যাটাস ভাইরাল করা আর তাঁদের নেওয়া কর্মসূচীগুলোতে ব্যক্তিগত আঘাত করে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়ার কৌশল। আর এই কৌশলে তাঁরা প্রথম ধাপে সফলও হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে আঘাত করে কথা বলার পরেই সারা বাংলায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে যাঁকে যেখানেই পেয়েছে, সেখানেই দেশের সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীরা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। আর এই প্রতিহত করার ঘটনার ভিডিও, স্থির চিত্র আর বিভিন্ন মিডিয়ার লাইন বাই লাইন, এমনকি হেডলাইনও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গেছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের উপর কালিমা লেপন করার আপ্রাণ চেষ্টা প্রতীয়মান হয়েছে।
যে মেয়েটি তাঁর শারীরিক লাঞ্চনার স্থিরচিত্রটি সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়ে সবার সহানুভূতি পেয়েছে, সে মেয়েটিও দেশের সকল গণমাধ্যমের সামনে আসল সত্যটি তুলে ধেরেছে। তাঁকে রীতিমত শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে যেন ছাত্রলীগের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়। ঘটনাস্থলে শুধু ছাত্রলীগ ছিল-এটাই যেন বার বার গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে।
কোটা সংস্কারের নামে সরকার পতনের আন্দোলনের মুল পরিকল্পনাকারীরা এখন শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আঘাত দেওয়া এবং আঘাতের পরবর্তী পরিস্থিতি ডকুমেন্ট আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রচার-প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিশ্ব জনমত তৈরি কৌশল গ্রহণ করেছে। তাঁরা দেখেছে, কোটা পদ্ধতির সকল খুঁটিনাটি বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে শেখ হাসিনা খুব শীঘ্রই কোটা সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে ফেললে বিভ্রান্ত হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঠে নামানো যাবে না।

শুধু এখানেও নয়, তাঁরা বর্তমান কোটা সংস্কারের আন্দোলনের শুরুতেই মিথ্যাচার করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবি সিদ্দিককে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে, ছাত্রলীগের এক নেত্রী আরেক সাধারণ শিক্ষার্থীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছে-এই ধরনের গুজব রটিয়েও পরিস্থিতি তাঁদের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারেনি।

কোটা বিরোধীদের সংবাদ সম্মেলন

আর এখন কোটা আন্দোলনের কয়েকজনের একজন রাশেদ খানকে দিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় শেখ হাসিনা ও শেখ হাসিনার বাবা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কটুক্তি করার মতন ঔদ্বত্য দেখানোর কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত উম্মে হাবিবা বেনজিরকে দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা আর গণমাধ্যমকর্মী শামীমা বিনতে রহমানকে দিয়ে অশ্লীল স্ট্যাটাস ভাইরাল করে রাজপথ, মিডিয়া, স্যোশাল মিডিয়ার শান্ত পরিস্থিতি অশান্ত করে তার ভিডিও ফুটেজ আর বিভিন্ন স্কিন শর্ট আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ব্যক্তিবর্গের সামনে তুলে ধরে দেশে উদার গনতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতা নেই, বাংলাদেশ একটি অকার্যকর দেশ, শেখ হাসিনা একটি ব্যর্থ সরকার ইত্যাদি ইত্যাদি প্রমাণে প্রাণপণ চেষ্টায় মেতে উঠেছে।

পাঠক! এই অপচেষ্টার মুল উদ্দেশ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে সমর্থন না দিতে-এই কৌশলটি তাঁরা হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী রাষ্ট্রদূতের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক যাঁদের আছে তাঁদের দিয়ে কিছু ভিডিও ফুটেজ, কিছু স্থিরচিত্র আর কিছু গণমাধ্যমের রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সরকার প্রধানকে ট্যাগ করে টুইট করা করেছে।

তাঁরা জানে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে বিতর্কিত করা সম্ভব হলেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করা সম্ভব হবে। নিজেদের মতন করে সরকার গঠন করা সম্ভব। পাকিস্তানী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আর তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদ খান, বাম ছাত্র রাজনীতির নেত্রী উম্মে হাবিবা বেনজির আর গণমাধ্যকর্মী শামীমা বিনতে রহমানদের মাধ্যমে আলাদা আলাদা ভাবে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি করে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের টার্গেক হিসেবে শেখ হাসিনাকে বেছে নিয়েছে।

লেখক : কবীর চৌধুরী তন্ময়:  সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ)


%d bloggers like this: