ঢাকা, শনিবার , ২৩ মার্চ ২০১৯, | ৯ চৈত্র ১৪২৫ | ১৫ রজব ১৪৪০

গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায়ও এগিয়ে বাংলাদেশ

কাইয়ুম আহমেদ

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এই মাসেই এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছিল একটি স্বাধীন দেশ। লাখো শহীদের রক্তের লাল আর প্রকৃতির চিরসবুজের নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বিশ্বে এই বাংলাদেশ এখন সম্ভাবনার দেশ, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রার মডেল।

আবার এই মাসেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান-বুদ্ধিজীবীদেরও হারিয়েছি আমরা। তবে সেই শোক কাটিয়ে শোষণহীন এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নব চেতনায় জেগে ওঠে নতুন দেশের সবস্তরের মানুষ। এখন সম্ভাবনার সব দুয়ার খুলেছে, দেশ হাঁটছে গণতন্ত্রের পথে। লক্ষ্য- জঙ্গিবাদমুক্ত আধুনিক দেশ গড়ার অঙ্গীকার।

এরই ধারাবাহিকতার পথ ধরে এসেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। তবে একটি ভোট মানে ব্যালট বক্সে একটি কাগজ ফেলে দেওয়া নয়। এই ভোটে জড়িত আছে এক-একটি মানুষের চাওয়া-পাওয়া, আশা-ভালোবাসা।

যোগ্য প্রার্থী মানে দু-চারজনের মধ্যে একজনকে বাছাই করা কেবল নয়, যোগ্য প্রার্থী মানে কে আমার তথা আমার সমাজের অগ্রযাত্রায় মূল নায়ক হবে-এমন সব অগ্রপথিক খুঁজে বের করা। যারা এ দেশকে গণতন্ত্রের পথে, সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নেবেন। বাঁচিয়ে রাখবেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাস্তবায়ন করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিঃসন্দেহে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। সংবিধানের ভিত্তিতে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রমাণ করে-গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায়ও এগিয়ে বাংলাদেশ।

এখন সবার প্রত্যাশা সেই ‘গণতন্ত্র’ যার মানে জনগণের ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গের সমাবেশে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা দেন এইভাবে ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের জন্য পরিচালিত সরকার’-যা যুগে যুগে নতুন শক্তি সঞ্চয় করে হয়েছে অজেয়, বিকল্পহীন এক ব্যবস্থা। সেই ধারায় এগিয়ে চলেছে উন্নয়ন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

আমাদের প্রত্যাশা, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা উড্ডীন রেখেই উন্নতির নতুন সোপানে উন্নীত হবে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেন এক আকাশছোঁয়া মহীরুহ। চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল প্রাচীনকালে, গ্রিসের নগর রাষ্ট্রে, যুগে যুগে তা বিকশিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে যা ছিল গ্রিসের নিজস্ব সম্পদ, বিশ শতকের শেষ প্রান্তে তা হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন। রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে, সামাজিক দিকনির্দেশনা রূপে, শাসন ব্যবস্থার বৈধতাদানকারী হিসেবে গণতন্ত্রের ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। গণতন্ত্রের জাদুকরী আবেদনে সামাজিক জীবন হয়ে উঠেছে পরিপূর্ণ। ব্যক্তিস্বাধীন হয়েছেন রাজা আর ধর্মতন্ত্রের জাঁতাকল থেকে। অর্থনৈতিক উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা হয়েছে বাধা মুক্ত।

বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদ তার সামরিক শাসনকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘জনগণের সামরিক শাসনরূপে’। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রবর্তিত, ‘পরিচালিত গণতন্ত্র’ ও ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রকে’ গণতন্ত্রের আকারে পেশ করা হয়েছে।

নেপালের রাজার ‘পঞ্চায়েত রাজ’ও তেমনি পরিচিত হয়েছিল এক ধরনের গণতন্ত্ররূপে। কিন্তু গণতন্ত্র গণতন্ত্রই। কোনো অগণতান্ত্রিক উপাদান সংযোজিত হলে তা গণতন্ত্রকে বিকৃত করে, একে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলে। গণতন্ত্র তার আদি, অকৃত্রিমরূপেই অধিক অগ্রসরমাণ হতে পারে। সেই উন্নয়নের গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ এখন অগ্রসরমান।
বিদায়ী বছরের বড় মেগা-প্রকল্পগুলো এগিয়ে চলছে।

পদ্মা সেতুু দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণও প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব-যার সুফল আমাদের ঘরে পৌঁছতে শুরু করেছে। দেশ পরমাণুযুগে প্রবেশ করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কাজের উদ্বোধন হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ আরেক কদম এগিয়ে গেছে। এ ছাড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। নতুন নতুন প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে উন্মোক্ত হয়েছে আমাদের শেখড়ের নানাদিক। আমাদের ইলিশ মাছ বা সিলেটের শীতলপাটি, জামদানি-আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এতে বিশ্ব স্বীকৃতির ভেতর দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি আন্তর্জাতিকভাবে আরো ঋদ্ধ হয়েছে।

২০১৯ সালেও এধারা অব্যাহত থাক। উন্নয়নের পথে আমাদের এ অগ্রযাত্রা ছুটে চলুক আরো সমৃদ্ধ হয়ে। নতুন বছরের প্রথম ভোরে সূর্যের সোনালি আলোয় ভরে উঠুক সুখী-শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে-এই হোক প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী আদর্শে বাংলাদেশে একটি শোষণ-বঞ্চনামুক্ত এবং ভেদ-বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়েই শুরু হোক শুভযাত্রা।

বিজয়ের মাস শেষে আরো একটি বিজয়-গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিতকরণের। উৎসবমুখর হোক জাতীয় নির্বাচন, অধিকার নিশ্চিত হোক নাগরিকের, আজ জয় গণতন্ত্রের।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক


%d bloggers like this: