ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

ঘাতকের বুলেটে বিচ্ছিন্ন সেই তর্জনী ও অকৃতজ্ঞতার অহর্নিশি

যেই তর্জনীর ভার্টিকাল হরাইজন্টাল মুভে কম্পমান হয়েছিল এক‌টি জাতি, ঘাতকের বুলেটে ছিন্ন হয়ে সে কি স্তব্ধ হয় কখনো?!

বিচ্ছিন্ন তর্জনীটা পরের দিন অনেকেই দেখেছেন ….পড়ে আছে নিথর শরীরের পাশে এক্টা পরাবাস্তব চেহারা নিয়ে। মনে হল অপটিমাস প্রাইমের শরীর থেকে একটা নন ট্রান্সফর্মড এলিমেন্ট ঝরে গেল। সেই তর্জনীর পাপ আর অভিশাপ এই জাতির তিলক থেকে মুছে যায় নি। যাওয়ার কোন চান্স ও নাই।

২১ বছর সেই ছিন্ন তর্জনী ঘাতকদের তাড়িয়ে বেরিয়েছে। আইন করে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করেও সেই তর্জনীকে ভুলানো যায় নাই। ক্লাস ফোরে পড়া বাচ্চাটাকে যখন হিড়হিড় করে টেনে ব্রাশ ফায়ার করা হল, তখনই ঠিক হয়ে গিয়েছিল আসলে এই মাটির ভবিষ্যৎ “কোমলমতিদের” ভাগ্যে কি ঘটবে …..

কেউ টু শব্দটি করেনি অন্যায়ে। পাঁচ পাঁচটি সরকার আর সংসদ কুখ্যাত ইনডেমনিটি বাতিল করেনি। মেহেদি আর রক্তের মাখামাখি দাগ ফিসফিস করে বলে গিয়েছিল, “এই তো সবে শুরু”। “নো বডি কিলড তনু” ওয়ালারা বা তাদের বাপেরা কোন দিন জিজ্ঞেস করেছিলেন হু কিলড টু ইনোসেন্ট জাস্ট ম্যারিড লাভলি ইয়াং লেডিজ?! করেন নাই। কেউ করেন নাই।

আইন করে প্রায় তিন দশক খুনের বিচার বন্ধ করে রাখা দেশটিতে উত্তর প্রজন্ম যখন আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলে তখন ব্যর্থ পূর্ব প্রজন্ম হিসেবে বড় পুলক জাগে। আজ বংগবন্ধুকে যারা বুকে পিঠে ঘাড়ে পাছায় চেতনায় নিয়ে বিপ্লব করছে, তাদের আঁতুড়ঘর এ যখন নাড়ি কাটা হচ্ছিল ঠিক সেই সময়, ঠিক সেই সময়টায় বংগবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য মওদুদ সাহেব সুপ্রীম কোর্টের ফুল বেঞ্চ দিতে পারেন নাই। একের পর এক বিচারকরা বিব্রত বোধ করেছেন।

আজকের কোমলমতির বাবারা তখন ও অফিস যেতেন, মুভি দেখতেন, উইকএন্ড আড্ডা দিতেন – যেন কিছুই হয় নি। ৭৫ এর ভূত ২০০৫ এ এসেও যখন দাবড়ানি দিচ্ছে, শোকের প্রথম প্রহরে হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ গান চলেছে আর আমরা ভেবে গিয়েছি কই তেমন তো কিছুই হয় নি – সেই দিনই রাজনীতি এদেশে খতম। এসব যারা করেছে, পরিকল্পনা করেছে, উস্কে দিয়ে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে, পাঠ্যপুস্তকে নাম নিশানা মুছে দিয়ে বংগবন্ধু, তার পরিবার আর দলকে আস্তাকুঁড়ে পাঠাবার উপক্রম করেছে তারাই যখন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়লাভ করেছে, বারংবার – সেদিন ই এদেশে ভোট এর অধিকার খতম।

আমার মত চরম অদৃষ্ট বিরোধী লোকেরাও কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধে বিশ্বাস করে। সেই যে দুধের শিশু আলী আসগর আর সদ্য বিবাহিতা সখিনাসহ মাত্র ৭০ জনের ঈমাম হোসেন কাফেলাকে ছয় হাজার জন কলেমা পড়া মুসলিম ঢেকুর তুলতে তুলতে মেরে মস্তক ছিন্ন করেছিল তাদেরই খলিফার নির্দেশে – সেদিন থেকেই মুসলমানদের সব গ্লোরি শেষ।

আজ প্রকৃত মুসলিম খোঁজার ক্যাম্পেইন চলছে। সবাই সবাইকে অমুসলিম বলছে। শুধু নিজেদেরকে প্রকৃত মুসলিম দাবী করছে। ঠিক তেমনি একদিন বাঙ্গালির ও আইডেন্টিটি ক্রাইসিস হবে। টাকা পয়সা উন্নয়ন ফ্লাইওভার মেট্রোরেল পদ্মাসেতু সবই হবে। কিন্ত জাতি থাকবে দিকহীন, লিডারহীন পথভ্রষ্ট…..কনফিউজড পরিচয়হীন জারজ। আজ পুলিশ, কাল পলিটিশিয়ান, পরশু মিডিয়া, তার পরের দিন নতুন কাউকে “চ্যাটের বাল” লিখে পোস্টার টানাতে টানাতে একদিন সবাই সবাইকে, পুরো জাতি একে অন্যকে চ্যাটের বাল বলেই ডাকবে; সবে শুরু হল তবে।

বংগবন্ধুর হত্যার বিচার করে তাই জাতি কলংকমুক্ত হয় নি মোটেই – যে জাতির অন্তত ৬০% লোক এই হত্যার বিচারই চায়নি অ্যাট দ্য ফার্স্ট প্লেস – অন্তত ৬০%। কার্মা ইজ অ্যা বিচ! আর সেই তর্জনীর আস্ফালন ভরা চিরস্থায়ী অভিশাপ।  কেউ আমাদের দাবায় রাখার দরকার হয় ই নাই…….আমরাই ওকাজে শ্রেষ্ঠ!

 

লেখক : রফিকুল্লাহ রোমেল-ফ্রিল্যান্স লেখক ও সাংবাদিক

(লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব অভিমত। আজ ২৪-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)


%d bloggers like this: