ঢাকা, সোমবার , ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, | ৩ পৌষ ১৪২৫ | ৯ রবিউস-সানি ১৪৪০

জামাল খাসোগির ছেলের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের করমর্দন নাটক, ‘টুইটার’ জুড়ে ক্ষোভ নাটক

তুরস্কে হত্যাকাণ্ডের শিকার সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির শোকাহত ছেলের সঙ্গে করমর্দন করেছেন সৌদি যুবরাজ। সে ছবি প্রকাশ করেছে সৌদি সরকার। একে ‘নাটক’, ‘ভন্ডামো’ বলে টুইটারে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যাকটিভিস্ট-লেখক-আইনজীবী আর সাংবাদিকেরা। যুবরাজকে খুনি আখ্যা দিয়ে ছবিটি নিয়ে টুইটারে ক্ষোভের কথা তুলে ধরেছেন তারা। সুত্র : বিবিসি
সৌদি আরব বলছে, সমবেদনা জানাতে খাসোগির পুত্রকে রাজদরবারে ডাকা হয়েছিল। রিয়াদে ইয়ামামা প্রাসাদে খাশোগির দুই ছেলে সালাহ ও সাহেলকে অভ্যর্থনা জানান বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ। তারা খাশোগি নিহত হওয়ার ঘটনায় তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

অনুষ্ঠানে সালাহ’র সঙ্গে যুবরাজের করমর্দনের একটি ছবি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেটে প্রকাশ করা হয়। তবে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে রিয়াদ। যুবরাজের সঙ্গে তার করমর্দনের ছবিটিকে তাই ভণ্ডামো আখ্যা দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। খাশোগির পরিবারের এক বন্ধুকে উদ্ধৃত করে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানায়, খাসোগির যুবরাজের সমালোচনা করে ওয়াশিংটন পোস্টে কলাম লিখতে শুরু করার পর থেকেই তার ছেলে সালাহ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছেন। প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থার শিকার হওয়ার ভয়ে খাশোগি পরিবারের ওই বন্ধু তার নাম প্রকাশ করেননি।

ইস্তানবুলস্থ সৌদি কনস্যুলেট ভবনে খাসোগি হত্যার শিকার হওয়ার পর তুমুল আন্তর্জাতিক চাপে রয়েছেন সৌদি যুবরাজ। সমালোচকদের আশঙ্কা, সৌদি যুবরাজই খাসোগিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা না হলেও অন্ততপক্ষে এ ব্যাপারে তার জানা ছিল। মঙ্গলবার তাই ব্যথাতুর অভিব্যক্তি নিয়ে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে খাসোগির ছেলে সালাহ’র করমর্দনের ওই ছবিটি প্রকাশের পর টুইটারে এ নিয়ে চলছে ক্ষোভের ঝড়।

টাইম ম্যাগাজিনের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী নারীর তালিকায় রয়েছে মানাল আল শরিফের নাম। সৌদি আরবে ২০১১ সালে নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার প্রশ্নে আন্দোলনের সূচনা করেন তিনি। ডেয়ারিং টু ড্রাইভ: অ্যা সৌদি উমেন’স অ্যাওয়েকেনিং নামের সাড়া জাগানো এক বইয়ের লেখক মানাল টুইটারে লিখেছেন: ‘সমবেদনা গ্রহণ করার জন্য তাদেরকে রাজদরবারে নিয়ে আসা হয়েছে। তার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখুন। ছবিটি দেখে আমার চিৎকার করতে ও বমি করে দিতে ইচ্ছে করছে।’

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী ফাদি আল কাদি ওই ছবিকে ‘নির্মম’ উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছেন। টুইটারে তিনি লিখেছেন: ‘এইযে এখানে ভিডিও আছে। সালাহকে (জামাল খাসোগির ছেলে যার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আছে) এমন একজনের সঙ্গে করমর্দন করতে হলো যাকে তার বাবার হত্যাকারী বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্মম। নিষ্ঠুর। নির্দয়।’

আল-জাজিরার সংবাদবিষয়ক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক কামাল সান্তামারিয়া। কাতারভিত্তিক ওই সংবাদমাধ্যমের নীতিগত অবস্থান থেকে নিজেকে পৃথক রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। টুইটারে তিনি লিখেছেন: বাম পাশে, জামাল খাসোগির ছেলে সালাহ, ডানপাশে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এটা কতটা বেদনাদায়ক তা কি আপনারা কল্পনা করতে পারছেন?’

কাউন্সিল অব আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্রিস ডয়েল কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় খাসোগির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন সৌদি নেতৃত্ব। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এটি আরেক ধরনের যোগাযোগগত ব্যর্থতা। ডয়েল বলেন, ‘খাসোগির পরিবারের প্রতি তাদেরকে উদারতা প্রদর্শন করতে দেখা গেছে, তবে আমরা এখানে এমন একটি ছবি দেখতে পেয়েছি যা হাজার কথা বলে। সত্যিকার অর্থে এটি বাদশাহ সালমান ও যুবরাজের সঙ্গে জামাল খাসোগির ছেলে সালাহ’র এক কষ্টকর সাক্ষাতের চিত্রকেই উপস্থাপন করছে। আমি মনে করি, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ছবি দেখেছেন, তারা জানেন যে এটি এমন এক সন্তানের মুখ যে কিনা মনে করছে বাবার হত্যাকারীর সঙ্গে সে করমর্দন করছে। জনসংযোগ তৈরির যুদ্ধে জেতার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের নেওয়া প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি নজির এটি।’

ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ত্রিতা পার্সি তার টুইটারে লিখেছেন: ‘খুনের শিকার হওয়া ব্যক্তির ছেলেকে ডেকেছেন খুনী। মিথ্যাভাবে নিজেদের জবাবদিহিতাপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শনের প্রচেষ্টা ছাড়া এ কিছু নয়। বাবার খুনীকে সুরক্ষা দেওয়ার এ প্রচেষ্টায় শামিল হতে বাধ্য হওয়ায় জামাল খাসোগির ছেলে কতটা কষ্ট ও আতঙ্কে আছে তা বুঝতে পারছি।’

ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগ্যান টুইটারে লিখেছেন, দেখা যাচ্ছে অত্যাচারী সৌদি শাসক মোহাম্মদ বিন ফয়সাল খাসোগি পুত্রের সঙ্গে একটি জনসংযোগমূলক ছবি তুলেছেন। যুবরাজই কয়েকদিন আগে তার বাবাকে নির্যাতন-গুম আর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হাফিংটন পোস্টের সাংবাদিক ইয়াসির আলী লিখেছেন, আজ খাসোগির ছেলেকে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করা হয়েছে। তার মুখের দিকে দেখুন। ভুলে যাবেন না, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ছেলের দেশের বাইরে যাওয়ার অধিকার হরণ করে রেখেছে সৌদি আরব। তার অন্য ভাইবোনেরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পিতার মৃত্যুতে তাদের সঙ্গে একত্রে শোক করারও সুযোগ নাই তার।


%d bloggers like this: