ঢাকা, সোমবার , ২২ অক্টোবর ২০১৮, | ৭ কার্তিক ১৪২৫ | ১২ সফর ১৪৪০

জয়পুরহাটে এখনো থেমে নেই কিডনি বিক্রি, লোভের ফাঁদে সহজ-সরল মানুষ

জয়পুরহাটে এখনো

জয়পুরহাটে এখনো থেমে নেই কালাই উপজেলার আলোচিত সেই কিডনি বিক্রি চক্রের সদস্যরা। তারা গ্রামের সহজ-সরল, অভাবী মানুষদের লোভ দেখিয়ে ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কিডনি ট্রান্সফার করিয়ে নিচ্ছেন। সেই সুবাদে দালাল চক্রের সদস্যরা মোটা অঙ্কের টাকা কামিয়ে নিলেও, কিডনি দাতারা পাচ্ছেন যত সামান্য।

সর্বশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর (রোববার) কালাই থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া এক কিডনি বিক্রেতার কাছ থেকে এমনই তথ্য জানা গেছে। ওই কিডনি বিক্রেতার নাম দুলাল হোসেন। তিনি কালাই উপজেলার বিনইল গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা।

কালাই থানার ওসি আব্দুল লতিফ খান জানান, কিডনি বিক্রি চক্রের দুই দালাল উপজেলার বিনইল গ্রামের কাওসার ও বাগুইন গ্রামের জুয়েল দুই মাস আগে থেকে দুলাল হোসেনকে কিডনি বিক্রি করতে উদ্বুদ্ধ করেন। একপর্যায়ে ৬ লাখ টাকা চুক্তিতে ভারতের একটি হাসপাতালে দুলালের একটি কিডনি ট্রান্সফার করে নেয় তারা। পরবর্তীকালে ওই দালাল চক্র তাকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে সটকে পড়ে। তবে ঘটনা জানার পর ওই দুই দালালকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

জানা যায়, সর্বপ্রথম ২০১১ সালে বিভিন্ন দালালদের খপ্পরে পড়ে কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাতার, কুসুম সাড়া, অনিহার, পাইকশ্বর, ইন্দাহার, উদয়পুর ইউনিয়নের বহুতী, নওয়ানা, দূর্গাপুর, তেলিহার, ভুষা, কাশিপুর, বিনাই, পূর্ব কৃষ্টপুর এবং আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর ও বোড়াই গ্রামের অভাবী মানুষ প্রয়োজন মেটাতে শরীরের মূল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রি করে।

এক সময় শতাধিক নারী-পুরুষ বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে কিডনি বিক্রি করে দেয়। এরপর বিভিন্ন মিডিয়ায় বিষয়টি উঠে এলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ।অসুস্থ জীবন যাপন করা কিডনি বিক্রেতা।সেই সময়ে বিভিন্নভাবে অভিযান চালিয়ে প্রথমে কিডনি বিক্রেতাদের এবং পরে তাদের দালালদের গ্রেফতার করতে থাকে পুলিশ। তাদের নামে একাধিক মামলাও হয়েছে।

এছাড়াও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত সভা-সেমিনার করে জানানো হয়- তারা যে কাজটি করছে, সেটি সম্পূর্ণরুপে বেআইনি এবং নিজেদের শরীরকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সচেতনতামূলক এসব সভা-সেমিনারের ফলে এক সময় ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে কিডনি বিক্রির প্রবণতা।

কয়েক মাস হলো আবারো নতুন করে কিডনি বিক্রি শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৯ সেপ্টেম্বর (বুধবার) কালাই উপজেলার বাগইল গ্রামের কিডনি বিক্রি চক্রের দালাল জুয়েল হোসেন এবং মোহাইল গ্রামের কিডনি বিক্রেতা হেলেনা বেগমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়াও ২৩ সেপ্টেম্বর (রোববার) একই উপজেলার বিনইল গ্রাম থেকে দুই মাস আগে কিডনি বিক্রি করা দুলাল হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এ বিষয়ে ওসি আব্দুল লতিফ খান বলেন, অঙ্গ-প্রতঙ্গ আইন অনুযায়ী কিডনি বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। ২০১১ সালে কিডনি বিক্রির প্রবণতা শুরু হওয়ার পর মাঝখানে তা বন্ধ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে- এই উপজেলায় আবারো কিডনি বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে আমরা ইতোমধ্যেই জেনে গেছি, নতুন করে কারা কিডনি বিক্রি করেছে। এ জন্য একটি তালিকা তৈরি করে মামলা দেওয়ার পর তাদের চারজনকে ইতোমধ্যেই আমরা গ্রেফতারও করেছি।

এদিকে কালাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে পুরনো কিডনি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ পর্যন্ত যারা শরীর থেকে একটি করে কিডনি বিক্রি করেছেন, তারা কেউই এখন সুস্থ নেই। কিডনি বিক্রেতারা সবাই এখন কোনো না কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তারা শরীরের স্টেমিনা হারিয়ে ফেলে কাজকর্ম করতে এখন অনেকটাই অক্ষম।

কালাই উপজেলার বোড়াই গ্রামের কিডনি বিক্রেতা জোসনা বেগম, তার স্বামী বেলাল হোসেন, শিমরাইল গ্রামের আবেদ আলী, আব্দুর রহিম, নূরুন্নবী, তেলিহার গ্রামের মুক্তি বেগম, ভেরিন্ডি গ্রামের আক্তার আলমসহ অনেকেই জানান, দালালদের খপ্পরে পড়ে কিডনি বিক্রি করে একদিন যে ভুল করেছিলাম, সেটি আর শোধরাবার নয়। বর্তমানে আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি। কোনো কাজ-কামে মন বসে না। শরীরে সব সময় অলসতা ভর করে। এমন ভুলটি যেন আর কেউ না করে-সেদিকেও খেয়াল রাখার আহ্বান জানান গ্রামের এসব সহজ-সরল মানুষগুলো।

এ ব্যাপারে কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মনজুর আহমেদ বলেন, কিডনি বিক্রেতারা এখন ভাল নেই। তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে অসুস্থ জীবন যাপন করছেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাদের নিয়মতি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বলেও তিনি জানান।

আজ ২৪ প্রতিনিধি, জয়পুরহাট


%d bloggers like this: