ঢাকা, বুধবার , ২৬ জুন ২০১৯, | ১২ আষাঢ় ১৪২৬ | ২২ শাওয়াল ১৪৪০

দখল দূষণে ধুঁকছে চলনবিল

অপরিকল্পিত বাঁধ, নানা অবকাঠামো নির্মাণ, দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে চলনবিল। শুষ্ক মৌসুমে বিলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ৭৭ নদী, বিল ও খাল ভরাট হয়ে আবাদি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এতে বিল নদীনির্ভর প্রায় ২১ হাজার হেক্টর জমির সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে দিগন্ত জোড়া বিলাঞ্চলের আবাদ গভীর-অগভীর নলকূপনির্ভর হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, বড়াল নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট ও শতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করায় চলনবিলের নদী-বিল-খাড়ির অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া শতাধিক ফ্লাসিং ইনলেটের জালে জড়িয়ে অখণ্ড চলনবিল এখন বহুধাবিভক্ত।

এতে চলনবিলের মৎস্যসম্পদ ও জলজপ্রাণী বিলুপ্তির পথে। অন্যদিকে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা জাল দলিল করে দখলে নিয়েছে বিলের কয়েক হাজার একর খাসজমি।

সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড থেকে জানা গেছে, চলনবিলের তিনটি জেলার বেশিরভাগ খাসজমি ও জলাশয় এখন প্রভাবশালীদের দখলে।

এক সময় বড়াল, নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, গুড়নদী, করতোয়া, ফুলজোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা ও গোয়ালা নদীসহ অসংখ্য বিল ছিল চলনবিলের গর্ব ও ঐতিহ্য। এছাড়া নবী হাজীর জোলা, হক সাহেবের খাল, নিয়ামত খাল, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর, পানাউল্লার খাল, নিমাইচরা- বেশানী, বেশানী-গুমানী ও উলিপুর-মাগুড়া, দোবিলা খাল, বেহুলার খাড়ি, বাঁকাই খাড়ি, গাঁড়াবাড়ি-ছারুখালী খাল, জানিগাছার জোলা ছিল চলনবিলের প্রাণ।

কিন্তু ধীরে ধীরে এসব নদী-বিল ও খাড়ি ভরাট হয়ে যাওয়ায় মৎস্য ও জলজসম্পদে ভরপুর চলনবিলে এখন মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। এক সময় চলনবিলের মাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় দারুণ প্রভাব ফেলেছিল।

মাছ বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের মানুষ। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে প্রথম ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মিত হলে চলনবিলের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ওইসময় উত্তরাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে এ বিলের মাছ ট্রেনে করে ভারতে রফতানি হতো। ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ি থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করা হয়। ২০০২ সালে চলনবিলের বুকচিরে নির্মাণ করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক।

জানা যায়, বর্তমানে নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার ৬২টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভার এক হাজার ৬০০টি গ্রাম নিয়ে চলনবিলের অবস্থান। মোট লোক সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষাধিক। চলনবিলে জমির পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর।

এতে মোট প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খাল রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের নদী-বিল শুকিয়ে জেগে ওঠা দিগন্ত বিস্তীর্ণ মাঠ। স্থানীয় কৃষক মাঠে ধান, পাট, সরিষা, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা রকমের ফসল আবাদ করছেন। এসব নদী-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় এক সময়ের অতি পরিচিত দেশী ৬৫ প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে।

আজ ২৪ প্রতিনিধি, নাটোর


%d bloggers like this: