ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই ২০১৯, | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০

দূরপাল্লার সাঁতারে বিশ্বরেকর্ড গড়লেন মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র

দূরপাল্লার সাঁতারে বিশ্বরেকর্ড গড়ার স্বপ্ন পূরণ হলো নেত্রকোনার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যর । বুধবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টায় ১৮৫ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে এ রেকর্ড গড়লেন তিনি।

এর আগে সোমবার( ৪ সেপ্টেম্বর) সকাল পৌনে সাতটার দিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী ভোগাই নদের সেতুসংলগ্ন এলাকা থেকে ১৮৫ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেন তিনি। মদন উপজেলা নাগরিক কমিটি ও নালিতাবাড়ী পৌরসভা যৌথভাবে দূরপাল্লার এই সাঁতারের আয়োজন করে। নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান এই একক সাঁতারের উদ্বোধন করেন। নদীপথে আসতে তাকে নালিতাবাড়ী ছাড়াও ময়মনসিংহের তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, নেত্রকোনার পূর্বধলা, দুর্গাপুর, সদর, আটপাড়া ও মদনসহ  আটটি উপজেলা পার হতে হয়েছে।

আমেরিকার সাঁতারু ডায়ানা নাঈদের ২০১৩ সালে কিউবা টু ফ্লোরিডার ১৭৭ কিলোমিটার দূরপাল্লার সাঁতারের বিশ্বরেকর্ড ভাঙতেই তিনি টানা ৬১ ঘণ্টা সাঁতার কাটলেন। পৌঁছলেন গন্তব্যে। এদিকে, এই খবরে দুপুর থেকেই হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু মগড়া নদীর বিভিন্ন ঘাটে ও অপেক্ষা করতে থাকেন। রাতে তাকে দেখেই উল্লাসে ফেটে পড়েন তারা।

তবে তিনি শারিরীকভাবে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাকে পাড়ে উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে হযরত সুমাইয়া (রা.) হেলথ কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফজলুল বারী ইভান জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা ও না ঘুমানোর কারণে শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি । তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।

সাতাঁরু ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এক নারী সাঁতারু ১৭৭ কিলোমিটারের রেকর্ড ভঙ্গ করতে আমার এ সাঁতারে নামা।

২০১৭ সালে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ৬ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত ১৪৬ কিলোমিটার নদীপথে সাঁতার কেটেছিলেন ক্ষিতীন্দ্র। এবার আরও ৩৯ কিলোমিটার পথ বাড়িয়ে ১৮৫ কিলোমিটার নদীপথে সাঁতার কেটে সফল হয়েছেন এ মুক্তিযোদ্ধা।

ক্ষিতীন্দ্র বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের এএনএস কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি পাস করেন। সাঁতার কেটে এ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে চারটি পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯৭০ সালে সিলেটের ধুপাদিঘি পুকুরে অরণ্য কুমার নন্দীর বিরামহীন ৩০ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনী দেখে ক্ষিতীন্দ্র উদ্বুদ্ধ হন। পরে একই বছর মদনের জাহাঙ্গীরপুর উন্নয়ন কেন্দ্রের পুকুরে তিনি ১৫ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে আলোচিত হন। এটিই তার প্রথম সাঁতার প্রদর্শনী।

১৯৭২ সালে সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশন পুকুরে ৩৪ ঘণ্টা, সুনামগঞ্জের সরকারি হাইস্কুলের পুকুরে ৪৩ ঘণ্টা, ১৯৭৩ সালে ছাতক হাইস্কুলের পুকুরে ৬০ ঘণ্টা, সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে ৮২ ঘণ্টা এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুরে ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট বিরামহীন সাঁতার প্রদর্শন করে জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করেন। জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করায় ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল হয়।

                          সাঁতারের আগ মুহূর্তে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদের পাড়ে ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য 

১৯৭৬ সালে তিনি জগন্নাথ হলের পুকুরে ১০৮ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার প্রদর্শন করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জগন্নাথ হলের পুকুরের পাড়ে একটি স্মারক ফলক নির্মাণ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিং পুল, নেত্রকোনা পৌরসভার পুকুরে তাঁর একাধিক সাঁতার প্রদর্শনী হয়।

সাঁতার প্রদর্শনী ও রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণভবনে তাকে রূপার নৌকা উপহার দেন। একই বছর ডাকসু তাকে বিশেষ সম্মানসূচক স্বর্ণপদক দেয়।

মদন নাগরিক কমিটির সভাপতি ও সাবেক পৌরমেয়র দেওয়ান মোদাচ্ছের হোসেন শফিক বলেন, ‘গুগল ম্যাপ ডেটায় দূরত্ব নির্ণয় করে এবং ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্রের বয়স বিবেচনা করে এই সাঁতার বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে গণ্য হবে। গিনেস বুকে রেকর্ড করতে সার্বক্ষণিক সাঁতারের ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। তিনি কিছুটা দুর্বল হলেও, সফলভাবেই মদন পৌঁছেছেন।

মদন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়ালীউল হাসান বলেন, প্রখ্যাত সাঁতারু বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য ১৮৫ কিলোমিটার সাঁতার প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।

নেত্রকোণার  ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য আমাদের দেশের গর্ব, তাকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। গিনেস বুকে নাম লেখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

আজ ২৪ প্রতিনিধি, শেরপুর ও নেত্রেকোণা

 


%d bloggers like this: