ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই ২০১৯, | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০

দেশে একমাত্র আর্টিস্ট পয়দা করেছে লাক্স —মাহমুদ দিদার

আগামাসী লেনের সন্ধ্যায় জয়লতার কাছে কোনো এক আগন্তুক দিয়ে শুরু। এরপর ২৪টির মত টিভি নাটক নির্মাণ করে হাত পাকিয়েছেন। ফিল্ম বানানো চাই-ই এ মন্ত্র-মুগ্ধতায় যে তরুণ ২০১১ সালে নাটক নির্মাণ শুরু করেছিলেন; তাকে আর কতদিন আটকে রাখা যায়! স্বয়ং তাকে এ পথ খুলে দিয়েছেন সমরেশ মজুমদারের মত লেখক। তিনি মাহমুদ দিদার, খোলামেলাভাবেই প্রকাশ করেছেন ক্ষোভ, জানিয়েছেন তার নির্মাণশৈলী ও কাজের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও। এ নির্মাতার মুখোমুখি হয়েছেন আজ এর এন্টারটেইনমেন্ট রিপোর্টার মিশুক চৌধুরী। ছবি তুলেছেন তানভীর আহমেদ

 

টিভি নাটক নির্মাণের শুরুটা…

‘একটি অস্তিত্ব অথবা অনস্তিত্বের গল্প’, ‘ইশ্বরের কাছে একটি পত্র’ শর্ট ফিল্ম নির্মাণের পর আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পেলে উৎসাহী হই। পরে নাটক নির্মাণ শুরু করি।

 

২০১১ থেকে ২০১৫, প্রায় পাঁচ বছর। নাটক নির্মাণের যাত্রা কেমন ছিল?

নাটক কিংবা ফিল্ম কোনোটাই বাংলাদেশে গড়ে উঠতে পারেনি। তাই যাত্রাটা খুবই সহজ না। ফিল্মকে ভালবেসে তরুণরা কাজ করছে। নাটক বানাচ্ছে ফ্যান্টাসাইজ হয়ে, সিনেমার আকাঙ্ক্ষা থেকে কাজ করছে। বয়সে বুড়োরা আবার নাটককে জীবিকা হিসেবে নিয়েছে। তারা দুনিয়ার যত সস্তা সিরিয়াল আছে তা চালাচ্ছে। সস্তা গল্প করছে।

 

এ পথের পথিক হতে চায় যারা…

তরুণদের জন্য প্রতিবন্ধকতা অনেক। নতুনদের কাজ টেলিভিশন চ্যানেল পাশ করাচ্ছে না। কাজ ভাল লাগলেও ঝুঁকি থাকে। কেউ আবার নতুনের পেছনে বিনিয়োগ করতে চায় না। নতুন যারা আসবে তাকে ধরে নিতে হবে, এটা একটি যুদ্ধ। না খেয়ে থাকতে হবে, অভাবের সাথে লড়াই করতে হবে। দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। আবার মাথায় রাখতে হবে, সিন্ডিকেট মেনে কাজ করতে হবে।

Mahmud Didar

শিল্প আর সিন্ডিকেট শব্দ দুটি খুবই দ্বান্দ্বিক। সিন্ডিকেট সম্পর্কে বলুন…

তিন বছর আগেও এখানে সিন্ডিকেট ছিল না কিন্তু এখন রয়েছে। কিছু এজেন্সি দালাল হিসেবে কাজ করছে। যাদের সাথে বিজ্ঞাপনদাতাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা সরাসরি টেলিভিশন চ্যানেলে আসছে না। এজেন্সি ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এক থেকে দেড় লাখ টাকায় তারা আবার নাটক বানাচ্ছে। বর্তমানে শতকরা ৭০ ভাগ কাজ করছে এজেন্সিগুলো। চামচাদের একটা দৌরাত্ম চলছে…

 

এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

প্রতিটি টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগ অনুষ্ঠান দেখবে। তারা জানে কোন গল্পটা ভাল, খারাপ। কি, কিভাবে চুক্তি হবে তা অনুষ্ঠান বিভাগের উপর ছেড়ে দিতে হবে। তাদের কাছে কাজ জমা দিবে নির্মাতারা। এ প্রক্রিয়া চালু হলে চক্রটি ভেঙে যাবে। কারণ, সিন্ডিকেটটা হয় মার্কেটিংয়ের উপর নির্ভর করে। যেখানে দেয়া-নেয়ার ব্যবস্থা আছে।

 

ইদানিংকার নির্মাণে দেখা যাচ্ছে একধরণের গ্ল্যামারের ছড়াছড়ি। কার আগে যেন কে যায়। কোথাও যেন নৈরাজ্য চলছে। এমন হচ্ছে কেন?

এটি আর্ট ফর্মের জায়গা। বাংলাদেশে আর্ট ফর্ম বলে এখন কিছু নেই। একটা দেশে সবকিছু রাজনীতিকরণ করা যায় না। আপনি ক্ষমতাসীন দলের হলে সুবিধা পাবেন, বিরোধী হলে আপনাকে খারিজ করে দেয়া হবে। সিনেমা বানাতে যান সেখানেও রাজনীতি, নাটক বানাতে যান সেখানে সিন্ডিকেট। দালালির কারণে আমাদের এখানে নৈরাজ্য লেগেই আছে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে সে অর্থে অভূতপূর্ব মাস্টারপিস পয়দা হয় নাই। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে নৈরাজ্য। এটি দেশের জন্য ভয়ানক সংকট।

 

দর্শকদের অভিযোগ, নাটক দেখতে বসলেই বিজ্ঞাপনের জন্য বিরক্ত হচ্ছেন। কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলোর সে দিকে কর্ণপাত নেই। সোস্যাল মিডিয়ার যে ভূমিকা তাতে কি টিভি নাটক-সংস্কৃতি হুমকিতে পড়তে পারে না?

হ্যা। বিজ্ঞাপন জিনিশটা চ্যানেলের ফুয়েল হলেও কি পরিমাণ বিজ্ঞাপন দিবে তার হিসেব রাখতে হবে। দেশে এখন ৭ মিনিট নাটক দেখিয়ে ১০ মিনিট বিজ্ঞাপন দেখায়। ৪৫ মিনিটের নাটকে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট পর্যন্ত বিজ্ঞাপন মেনে নেয়া যায়। যদি তা ৩০ মিনিট হয়ে যায় তাহলে মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। যার জন্য বিজ্ঞাপন নীতিমালা থাকা উচিত। চ্যানেল মালিককেও কনশাস হতে হবে। এই ব্যাপারে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে নাটক-সংস্কৃতি টিকবে না।

স্যাটেলাইট দুনিয়াতে কেউ কাউকে আটকিয়ে রাখতে পারবে না। আপনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যান সেখানেও জি বাংলা দেখবেন। এমনকি ঈদেও বাংলাদেশি চ্যানেল দেখছে না দেশের মানুষ। তাদের সাথে আমরা পেরে উঠছি না বলে তো গায়ের জোরে ফেলে দিতে পারব না। ইন্টেলেকচুয়ালি মোকাবেলা করতে হবে। দর্শক ভাল কাজ চাচ্ছে। সো কাজের মান বাড়াতে হবে।

 

ছোটপর্দার নির্মাণে পরিচিত মুখ আপনি। দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছেন। দর্শকদের সাড়া কেমনভাবে গ্রহণ করছেন?

ইতিবাচকভাবে নিচ্ছি। মূলত, আমি আমার কাজকে ব্রান্ড আকারে তৈরি করতে চাই…

 

এ পর্যন্ত যত কাজ করেছেন তার মধ্যে আপনার প্রিয় কাজ কোনটি?

কাজ তো অনেক আছে…(হাসি) তাই না? ‘চেরী ফুলের নামে নাম’ এ কাজগুলো তো মজার।

 

কাজ করতে গিয়ে মজার কোন স্মৃতি…

বাংলাদেশের টেলিভিশনে কাজ করতে গিয়ে মজার ঘটনা ঘটতেই পারে না। এত অপেশাদার, পিছিয়ে পড়া মানুষ; নেই কারিগরি জ্ঞান। এখানকার অধিকাংশ মানুষই আন্ডার ম্যাট্রিক।

 

এ পথে যারা শিল্পী আছে, তাদের সম্পর্কে আপনার মতামত…

ভাল আর্টিস্টের কমতি আছে। এখনো পর্যন্ত দেশে একমাত্র আর্টিস্ট পয়দা করেছে লাক্স। সেই শিল্পীরা কিছুটা কাজ করতে পারছে। অন্যরা ব্যর্থ। এখন তো শুটিং-ই করা যায় না সহজে। দৃষ্টি থাকে আইফোনে। ডায়ালগ দিবে? তার আগেই ফোনে কথা। কাজে মনযোগী না। যত কাজ হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে।

Mahmud Didar

আপনার কাজে কি নিজের জীবন-দর্শন থাকে?

আমি আমার গল্পে চেষ্টা করি, তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব যেখানে আকাশ মাটিকে সেজদা করে। প্রত্যেকটা গল্পে চেষ্টা করেছি আমার কথা বলতে। আমার স্বৈরাচার গল্পে আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। দু-চারটা গরিব দেখালে হবে? সত্যজিৎ পথের পাঁচালীর মধ্য দিয়ে দারিদ্র দেখায়ে দিছে। এত গরিব দেখানো হয়েছে জাতি বলতে এখন গরিব বুঝে। গরিব ছাড়া আমরা কি আর কিছু পারি না? গরিব দেখাতে পারলেই ওরা খুশি। এসব দেখিয়ে একটা পুরস্কার বাগিয়ে নেয়।

 

টিভি নাটক-সংস্কৃতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

তরুণদের হাতে স্বৈরাতান্ত্রিক ক্ষমতা না আসা পর্যন্ত এটার এইডেন্টিটি থাকবে না। টোটালি একটা বিপ্লব দরকার।

 

বছরের শুরুতে ঘোষণা এসেছিল, গর্ভধারিণী উপন্যাস অবলম্বনে আপনার প্রথম ফিল্ম নির্মাণের। এরপর অনুদান পেলেন একটি ফিল্ম নির্মাণে। কোনটার কাজ কতটুকু অগ্রসর হলো?

আগে অনুদানের ফিল্মটা (বিউটি সার্কাস) করতে হচ্ছে। যেহেতু অনুদানের ফিল্মের একটা সময়সীমা থাকে। বিউটি সার্কাসের পর গর্ভধারিণী নির্মাণ করব। আগামী ঈদে মুক্তি পাবে বিউটি সার্কাস।

 

সমরেশ মজুমদারের জনপ্রিয় উপন্যাস গর্ভধারিণীর কোন দিক বিবেচনা করে ফিল্ম তৈরির পরিকল্পনা করেছেন?

তরুণদের বিপ্লব। তারা যে একটি রাষ্ট্র হতে পারে, সেটি আমি গর্ভধারিণী বানালে দেখিয়ে দিতে পারব।

 

উপন্যাসটির চরিত্রগুলো পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে অভিনয়শিল্পী হিসেবে থাকছেন কারা?

এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

 

সিরিয়াস এক পলিটিক্যাল থ্রিলারের সমন্বয় গর্ভধারিণী। সাধারণত এমন গল্পের চলচ্চিত্র ঢালিউডপাড়ায় অনুপস্থিত। বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতিতে গর্ভধারিণী নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

ওকে, ফাইন। এটা বহুল পঠিত একটা উপন্যাস তো, এটার কমপ্যাক্ট আমাদের দেশে ফিল্ম বানানোর জন্য দরকার। থ্রিলার, তরুণদের নেতৃত্ব; আশা করি আমরা ভাল করতে পারব।

 

শুধু ঢালিউড নয়; আমাদের বর্তমান সমাজও একধরণের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করছে। রাজনৈতিক টানাপড়েন থেকে বেরিয়ে সমাজ পরিবর্তনে চার বন্ধুর নতুন করে স্বপ্ন দেখা, লড়াইয়ে নামার গল্প বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের কতটা প্রভাবিত করবে বলে আপনি মনে করেন?

গর্ভধারিণী উপন্যাসের যে প্লট সেটা ফিল্মে দেখাতে পারলে নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হবে।

 

সমরেশ মজুমদারের এই গল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়ারল কারণ কী?

বালক বয়সে বিপ্লব করার ইচ্ছে হয়েছিল। আমরা কয়জন বন্ধুও ছিলাম, যারা বিপ্লব করতে চাইতাম। যারা এ উপন্যাস পড়ে বড় হয়েছে কিংবা তরুণরা পর্দায় গর্ভধারিণী দেখলে তাদের মধ্যে বিপ্লব জেগে উঠবে।

 

ফিল্ম কি রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে?

হ্যা। অবশ্যই পারে। বর্তমানে যেসব নাচ-গান হচ্ছে এসব ফিল্ম নয়; এসব পণ্য। একটা ফিল্ম দিয়ে যতটা সহজে মানুষকে প্রভাবিত করা যায় তা অন্যকিছু দিয়ে এত সহজে হয় না।

 

এ ধরণের ফিল্ম থেকে আমরা কতটা দূরে আছি?

এই যে শুরু হয়ে যাবে… গর্ভধারিণী, বিউটি সার্কাস দিয়ে।

 

আপনি যে সময়ে ফিল্ম নির্মাণ শুরু করছেন সে সময়ে দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যৌথ প্রযোজনার হার বেড়েছে। যৌথ প্রযোজনা সম্পর্কে আপনার মতামত…

নিজেদের প্রযোজনা যদি নিজেরা করতে না পারি; তাহলে পরগাছা একটা সংস্কৃতি ধারণ করে পারবেন? আমাদেরও যেতে হবে তাদের কাছে; প্রযোজক যাচ্ছে। কিন্তু আমি যখন প্রযোজনা করব তখন যৌথভাবে করব না। পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেয়ার মত মেধাবী আমাদের ছেলেরা। কিন্তু যৌথ প্রযোজনা একটি ছেলে তৈরি করতে পারবে? একটি ইউনিক ডিরেক্টর কিংবা ইউনিক গল্পকার তৈরি করতে পারবে? পারবে না। কারণ, তারা সেটা শুষে নেবে। তারা একটা স্যুপেরিয়র জায়গা তৈরি করেছে। আর আমরা আমাদের মেধাবীদের মূল্যায়ণ করছি না।

Mahmud Didar with Mishuk Chy

গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিভি নাটক নির্মাণ করে এবারে খেলতে নামছেন বড়পর্দায়। এ দুই জায়গার যে ব্যবধান সেটা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?

ফিল্ম নির্মাণের পূর্বেকার প্রস্তুতিস্বরূপ আমি নাটক নির্মাণ করেছি। তাই আগে নাটক নির্মাণ করে পরে ফিল্ম নির্মাণে আসা।

 

এ ঈদে দর্শকের জন্য আপনার কী আসছে?

টেলিফিল্ম ‘রেইনবো’, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনে প্রচারিত হবে।

 

দর্শকদের আগ্রহ করার মত ক থাকছে ‘রেইনবো’তে?

দর্শকদের উদ্দেশ্যে আমি বলব, না দেখেলে মিস করবেন। সমাজে নারীর স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং পুরুষের আধিপত্য স্বীকার না করা- এসবের দিকেই দৃষ্টি দিয়েছি গল্পে। রেইনবো টেলিফিল্মই শেষ নয়; সমাজে নারীর অসঙ্গতি নিয়ে রেইনবো নামক ফিল্মও তৈরি করব ভবিষ্যতে।

 

মাহমুদ দিদারের ছেলেবেলা…

বাল্যকাল কেটেছে ফিল্ম, নাটক ও যাত্রাপালা দেখে এবং পুঁথি শুনে। আর সেখান থেকে ফিল্মের ফ্যান্টাসি জন্ম নেয়। টিভি নাটকও মনের ভিতর প্রভাব তৈরি করে। স্কুল জীবনে স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখির কাজ কলেজে এসেও থামাইনি। এরপর গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে। আমার জন্ম কক্সবাজারে।

 

আজ/এমসি/এইচকে/১০৩

ফেসবুকে আজ facebook/aaj24fan


%d bloggers like this: