ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই ২০১৯, | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০

না দেখা ডলফিন

ডেস্ক রিপোর্ট : সাম্পান মাঝি মো. বাবুল। কর্ণফুলী নদীর বুকে ভাসে তার সাম্পান। নদীর চর পাথরঘাটা এলাকার বাসিন্দা তিনি। শেষ কবে নদীতে ডলফিন দেখেছেন, এমন প্রশ্নের চটজলদি উত্তর ছিল না তার কাছে। স্মৃতি হাতড়ে বলেন, আগে শীতের সময় কিছুক্ষণ পর পর নদীতে উতোম (ডলফিন) লাফ দিত। এখন আর দেখা যায় না। তবে বহুদিন পর গত শুক্রবার বিকালে কর্ণফুলী নদীতে দেখা গেছে ডলফিন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালের ১ নম্বর জেটি থেকে প্রায় ২৫ ফুটের দূরে নদীর মধ্যে ডলফিনের সাঁতার আনন্দ দিয়েছে জেলেসহ নদীপারের বাসিন্দাদের। কর্ণফুলী নদীর এই ডলফিনটি ‘গেঞ্জেস ডলফিন’ (গাঙ্গেয় ডলফিন)। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় ‘উতোম’ কিংবা ‘শুশুক’ নামে পরিচিত।

কেন নদীতে আর ডলফিন চোখে পড়ে না—এর একটি ব্যাখ্যা দিলেন কর্ণফুলীর জেলে ছিদ্দিক আহমদ। তার কথায়, আগে তো নদীতে এত নৌকা, জাহাজ ছিল না। তাই ডলফিন আসত। কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতির সভাপতি পেয়ার আলীরও একই মত। তিনি বলেন, উতোম শীতকালে অনেক দেখা যেত। এখন কালেভদ্রে দেখা মেলে।

প্রতিদিন কর্ণফুলী নদী পার হয়ে শহরে আসতে হয় চর পাথরঘাটার যুবক মোরশেদুর রহমানকে। তিনি বলেন, ১০-১২ বছর আগেও নদী পার হওয়ার সময় উতোমের লাফালাফি দেখতাম।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দূষণমুক্ত পরিষ্কার পানিতে গাঙ্গেয় ডলফিনের বিচরণ। কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নদীতে এখন মাঝেমধ্যে এই ডলফিনের দেখা মেলে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ডলফিনের এই প্রজাতিটিকে ‘অতিবিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গাঙ্গেয় ডলফিন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. বেনজির আহমেদ। আইইউসিএনের বিশেষজ্ঞ হিসেবেও তিনি কাজ করেন। ২০১২ সালে তার গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও হালদায় গেঞ্জেস ডলফিনের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ১২৫। নদীদূষণ, চর জেগে ওঠা এবং জেলেদের জালের কারণে ডলফিনের আবাসস্থল হুমকির সম্মুখীন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি পুরুষ গেঞ্জেস রিভার ডলফিন ২ দশমিক ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পুরুষের চেয়ে নারী ডলফিন কিছুটা বড় হয়। রঙ ধূসর। নাসিকাসহ মুখটি লম্বাটে ধরনের। পেটের দিকটি গোলাকৃতির। এই প্রজাতির ডলফিন ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। তবে জন্মহার কম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ডলফিন বিচরণের প্রথম শর্তই হচ্ছে দূষণমুক্ত পানি। কিন্তু দূষণ ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, নৌযান বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এখন আগের মতো ডলফিন কর্ণফুলী বা হালদাতে চোখে পড়ে না। হালদার রামদাসহাট থেকে ঘড়দুয়ারা এলাকায় মাঝেমধ্যে কিছু ডলফিন দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, নদীতে ডলফিনের উপস্থিতি হারিয়ে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়া।

আজ/পিএল/এমকে/৩০৪


%d bloggers like this: