ঢাকা, শনিবার , ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, | ৬ মাঘ ১৪২৫ | ১২ জমাদিউল-আউয়াল ১৪৪০

নির্মল সেন : এক আপসহীন সাংবাদিকের প্রতিকৃতি

পরিচিত ছিলেন নির্মল সেন নামে। বিপ্লবী সূর্যসেনের সহযোগী, আপসহীন সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া বাম রাজনীতিবিদ। পুরো নাম নির্মল কুমার সেনগুপ্ত। বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের কাছে কমরেড; আর সাংবাদিক মহলে পরিচিতি নির্মল দা হিসেবে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে জাসদ-রক্ষীবাহিনীর মধ্যে সংঘাতপূর্ণ অবস্থানের কারণে দেশ যখন অস্থির সময় পার করছিল, তখন দৈনিক বাংলায় ‘অনিকেত’ ছদ্মনামে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ নামে একটি উপসম্পাদকীয় লিখে তোলপাড় সৃষ্টি করেন।

৮ জানুয়ারি নির্মল সেনের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ছয় বছর আগের এই দিনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নির্মল সেন ২০০৩ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী সময় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার দীঘিরগ্রামে নিজ বাড়িতেই থাকতেন। এখানেই তিনি ২০০১২ সালে ২৩ ডিসেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৪ ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নির্মল সেন যখন বঙ্গবন্ধুর মুখের ওপর বলে দিলেন-তিনি বাকশালে যোগ দেবেন না, তখন বঙ্গবন্ধুও সবাইকে পরামর্শ দিলেন নির্মল সেনকে যেন না ঘাঁটায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল নির্মল সেনের। পড়েছেন গোপালগঞ্জের স্কুলে। তাঁর কাকাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মামা বলে ডাকতেন। অকৃপণভাবে প্রশংসা করেছেন তিনি মানুষ শেখ মুজিবের।

লিখেছেন, …উল্লেখ করলে অন্যায় হবে না, এ একটি মানুষের আমলেই লিখে বা কথা বলে সাড়া পাওয়া যেত। পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের লেখা বা বক্তব্য মনে হয় তিনি খুটে খুটে পড়তেন। তাঁর অভিজ্ঞতা হচ্ছে: ‘শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে আমার প্রতিটি লেখা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিল। সে লেখার ভিত্তিতে নির্দেশও গেছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ কথা ঠিক, তাঁর আমলের শেষদিকে তিনিই নির্দেশ দিয়ে আমার লেখা বন্ধ করেছিলেন; তবুও তাঁর আমলে লেখায় সুখ ছিল। লিখলে ফল হতো।’ কিন্তু সে ফল বিস্বাদ ঠেকত কারও কারও কাছে। নির্মল সেনের কলাম বন্ধ করা হয়েছিল শেখ সাহেবের নির্দেশে। ৭৪ সালে জরুরি অবস্থা জারির পরপর তাঁর লেখা বন্ধের নির্দেশ এসেছিল। ‘দৈনিক বাংলার সম্পাদক তখন নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী। তিনি তাঁকে ডেকে বললেন, প্রধানমন্ত্রী আপনার লেখা বন্ধ করেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন ‘অনিকেত’ ছদ্মনামে নির্মল সেনের উপসম্পাদকীয় আর দৈনিক বাংলায় ছাপা হবে না’। মাথা বিগড়ে গেল নির্মল সেনের। সরাসরি চলে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গণভবনে।

বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘আপনি আমার লেখা বন্ধ করলেন কেন। আর সে কথা আমাকে না জানিয়ে সম্পাদক সাহেবকে জানালেন কেন। তারা তো আপনার সামনে ভয়েই কথা বলেন না। তাদের কাছে এই কথা বলে লাভ আছে! তবে আপনার কথা আমি মানব না। আমি আজকেই এই গণভবন থেকে ফোনে দৈনিক বাংলায় আমার লেখা দেব।’ প্রধানমন্ত্রী খানিকটা গম্ভীর হলেন, ইংরেজিতে বললেন নির্মল সেন, আপনাকে আমি জেলে পুরব না। আপনি জনপ্রিয় হবেন। আপনার জন্য একটি সিসার গুলিই সাফিশিয়েন্ট। উত্তরে নির্মল সেন বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, একই কথা আপনার জন্যও প্রযোজ্য। আপনার জন্যও একটি সিসার গুলিই সাফিশিয়েন্ট।’

শেষ পর্যন্ত হাস্যরসের মধ্য দিয়েই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
নির্মল সেনের লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু বই এক. মানুষ, দুই. সমাজ ও রাষ্ট্র, তিন. বার্লিন থেকে মস্কো, চার. পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ, পাঁচ. মা জন্মভূমি, ছয়. লেনিন থেকে গর্বাচেভ, সাত. আমার জবানবন্দি, আট. স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই, ৯. আমার জীবনে ’৭১-এর যুদ্ধ।

নির্মল সেন কেবল একজন পেশাদার সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন নিবেদিত রাজনীতিবিদও, যার লক্ষ্য ছিল শোষণবিহীন ও সমতাভিত্তিক একটি সমাজ গঠন করা। কৈশোরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৯০-এ সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসমেত গণবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সব সংগ্রামে তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৪২ সালে নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি ১৬ বার কারাবরণ করেন। তিনি ছিলেন অকৃতদার। প্রগতিশীল রাজনীতির পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী।

১৯৭২-৭৩ সালে নির্মল সেন ডিইউজের সভাপতি ও ১৯৭৩-৭৮ সাল পর্যন্ত বিএফইউজের সভাপতি ছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্যও ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতাও করেছেন।

নির্মল সেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জš§গ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা সেনগুপ্ত। বাবা সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের গণিত শিক্ষক। এ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটিগাতি এমই স্কুলে পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন।

১৯৪২ সালে ৯ম শ্রেণিতে পড়াকালে মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে স্কুল গেটে ১৬ দিন ধর্মঘট করার মাধ্যমে নির্মল সেনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। তিনি ১৯৪৪ সালে রেভুল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টিতে (আরএসপি) যোগদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। দেশ বিভাগের সময়কালে নির্মল সেনের মা-বাবা ও ভাইবোনসহ পরিবারের সব সদস্য বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ত্যাগ করে কলকাতা চলে যান। কিন্তু নির্মল সেন এ দেশে থেকে যান। বাবা-মা কলকাতায় চলে যাওয়ার পর তিনি চলে যান ঝালকাঠির কলসকাঠি গ্রামে তাঁর পিসির বাড়িতে। সেখানে ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি কলসকাঠি বিএম একাডেমি থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে আইএসসি পাস করে বিএসসিতে ভর্তি হন। এ সময় তিনি রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলে সেখান থেকে বিএসসি পরীক্ষা দিলেও অকৃতকার্য হন। তবে পরবর্তীকালে ১৯৬১ সালে জেলখানা থেকেই বিএ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং কৃতকার্য হন। তিনি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শৈশব থেকেই নির্মল সেনের লেখালেখিতে হাতেখড়ি।

নির্মল সেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে জীবনের শেষ চার ইচ্ছার কথা জানান। এগুলো হলো: নিজ বাড়িতে নারীদের জন্য একটি কলেজ নির্মাণ, মৃত্যুর পর তাঁর দেহ কোনো মেডিক্যাল কলেজে দান করা, সাংবাদিকতা পেশায় বিশেষ অবদানের জন্য তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি কোনো পুরস্কার দেওয়া হয় তা গ্রহণ না করা এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী মৃত্যুর সময় তাঁকে যে কথাগুলো বলে গিয়েছিলেন তা বাম রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা।

নির্মল সেন নিজেকে নিয়ে নয়, দেশ ও মানুষ নিয়ে ভেবেছেন প্রতিটি মুহূর্ত। এমন নেতা, এমন সাংবাদিক এখন পাওয়াই অসম্ভব। তিনি রাজনীতি ও সাংবাদিকতা উভয় দিকেই নির্ভীক থেকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। অন্যায়-অবিচারে অনেকেই নিশ্চুপ থাকলেও তিনি একাই রাজপথে নেমে তার প্রতিবাদ করেছেন। তিনি জীবনে কিছুই পাননি, শুধুই অকাতরে দিয়ে গেছেন। সেসব স্মৃতি রক্ষা করে তাঁকে সবার মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

তাহসিন আহমেদ : ফ্রিল্যান্স লেখক


%d bloggers like this: