ঢাকা, সোমবার , ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, | ৩ পৌষ ১৪২৫ | ৯ রবিউস-সানি ১৪৪০

পরিবহন ধর্মঘটে দুর্ভোগে সারা দেশ, অন্য চালকদের মুখে কালি দিচ্ছে শ্রমিকরা

পরিবহন ধর্মঘটে

সড়ক দুর্ঘটনার সকল মামলা জামিনযোগ্য করাসহ আট দফা দাবিতে রাজধানীসহ সারা দেশে চলছে ৪৮ ঘন্টার পরিবহন ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। কর্মসূচি অনুযায়ী ভোর ছয়টা থেকে পরিবহন ধর্মধট পালন করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। নতুন সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করছে শ্রমিকরা। আইন সংশোধনে সরকারের সাথে আলোচনার সুযোগ চেয়ে বঞ্চিত হওয়ায় এ কর্মসূচি বলে জানিয়েছেন ফেডারেশন নেতারা। এদিকে শ্রমিক ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মহাখালিসহ অন্যান্য বাস টার্মিনাল থেকে সকালে তেমন কোনো বাস-মিনিবাস ছেড়ে যায়নি। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বাসের সংখ্যাও কম। চালক-শ্রমিকদের দাবি, কঠোর আইন মাথায় নিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামাবেন না তারা। শ্রমিকদের অর্থদন্ড পাঁচ লাখ টাকা প্রত্যাহার, ড্রাইভিং লাইসেন্সের শিক্ষাগত যোগ্যতা ৫ম শ্রেণি করা ও পুলিশি হয়রানি বন্ধসহ আট দফা দাবিতে পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে তারা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় দুর্ভোগের নানা চিত্র দেখা গেছে। সকালে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে হাজারো অফিসগামী মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে দেখা যায়। প্রতিদিন স্ট্যঅন্ডে রাস্তায় অনেক বাস থাকলেও স্ট্যান্ডে কোনো বাসও দেখা যায়নি থামা অবস্থায়। গণপরিবহন না থাকায় রিকশা-সিএনজিকে দ্বিগুন ভাড়া হাঁকাতে দেখা যায়। আমেনা বেগম যাবেন কলাবাগান। বাসে যান। কিন্তু আজ রিকশা ছাড়া উপায় নেই। দ্বিগুন ভাড়া হাঁকছে রিকশা ওয়ালা। আমেনা বেগম আজকে বলেন, কি বলে আইন বদলানোর কথা বলতেছে বাস মালিকরা। আমাদের মেরেও ফেলবে আবার আইনো পাল্টাতে বলবে। মন্ত্রী শাজাহান খান কি সরকারের চেয়ে শক্তিশালী?’

অনেকে হেটেই যাচ্ছেন কর্মস্থলে। এছাড়া মিরপুরে প্রাইভেট কার বা ব্যক্তিগত পরিবহন নিয়ে বের হওয়াদেরকেও হয়রানী করছে শ্রমিকরা। এক লরি চালক বলেন, কাজ না করলে আমাদের পেটে ভাত পড়েনা। মিরপুর ১ নম্বরে শ্রমিকনামধারীরা আমাদের মুখে কালি মেখে দিচ্ছে। সরকার কিছু করেনা ক্যািন এদের?’

এদিকে সারাদেশে ডাকা ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘটের কারণে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি হলো- নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি)।

২৬ ও ২৭ অক্টোবর নোবিপ্রবিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮ অক্টোবরও (রবিবার) এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা রয়েছে। ২৭ অক্টোবর চবিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৮, ২৯ ও ৩০ অক্টোবরও এখানে পরীক্ষা রয়েছে। এছাড়া ২৮ ও ২৯ অক্টোবর এবং ২ ও ৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে যাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে, তারা বেকায়দায় পড়েছেন। রবিবার সকাল থেকে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হওয়ায় শনিবার রাতের মধ্যেই চট্টগ্রাম যেতে হচ্ছে তাদের। নোয়াখালীর সোনাপুর, মাইজদী ও চৌমুহনীর বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি কাউন্টারেই শিক্ষার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। টিকিটের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পরও টিকিট পাচ্ছেন না অনেকেই। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর চট্টগ্রাম যাত্রা এখনও অনিশ্চিত।

এ অবস্থায় কিছু অসাধু পরিবহন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টিকিটের দাম বৃদ্ধি করে আদায় করছে বাড়তি টাকা। নোয়াখালীর সোনাপুর ও মাইজদীর কাউন্টারগুলোতে টিকিটের দাম নাম না বাড়লেও চৌমুহনীর কাউন্টারগুলোতে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা। ২০০ টাকার টিকিটের দাম নেওয়া হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। ভর্তিচ্ছু এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রায় তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও এখনও চট্টগ্রামের টিকিট পাইনি। বুঝতে পারছি না কীভাবে যাবো। আর কখন পরীক্ষায় অংশ নেবো। বিপুল সংখ্যক ভর্তিচ্ছুদের কথা চিন্তা করে প্রশাসনের এ ব্যাপারে নজর দেওয়া উচিত ছিল।’

এদিকে পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যে রবিবারের পরীক্ষা পেছানোর কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন নোবিপ্রবি প্রক্টর ড. এস এম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ধর্মঘট থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক রবিবারের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের নিজস্ব বাসগুলো ক্যাম্পাস টু শহরে চলাচল করবে। আশাকরি তেমন সমস্যা হবে না।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিবহন ধর্মঘট চললেও যথাসময় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে গত ৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ সাত দফা দাবিতে পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকা ধর্মঘট শুরু হয়েছিল। ওই সময় ৯ অক্টোবর, বিকাল ৪টায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছিলেন ট্রাক পরিবহন শ্রমিকরা। কিন্তু শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) কেরানীগঞ্জে ট্রাকচালক-শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন তারা। এই পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান।


%d bloggers like this: