ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

পাঁচ জঙ্গি গ্রেপ্তার, থানায় হামলার পরিকল্পনা ছিল!

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নব্য ধারার পাঁচ সদস্য ধরা পড়েছে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর উত্তরা, বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও আদাবর এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-২ এসব জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে বোমা তৈরির বিপুল বিস্ফোরক।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ক্যাম্প অফিসে গতকাল বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। নব্য জেএমবির সাবেক সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী এদের ব্যবহার করে থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুটের পরিকল্পনা করেছিল। এদের একজন ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে পাস করে জঙ্গি প্রশিক্ষক, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও অর্থ সমন্বয়কারীর দায়িত্বে ছিলেন।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ধরা পড়া পাঁচ জঙ্গির তথ্য মতে, যেকোনো একটি থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুটের পরিকল্পনা করেছিল নব্য জেএমবি। আর এই অস্ত্র লুটের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে তারা থানার ভেতরে একজন এজেন্ট নিয়োগ করেছিল। সংশ্লিষ্ট থানায় কতজন পুলিশ সদস্য ও কী পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ রয়েছে, কার কখন ডিউটি—এমন সব তথ্য ওই এজেন্টের মাধ্যমে জেনে তারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। অস্ত্র লুটের পর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনাও ছিল জঙ্গিদের।

র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃতরা নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য। এদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের হোসেনপুর মোল্লাবাড়ি গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে মাওলানা আব্দুল হাকিম ফরিদি সুফিয়ান (৪০) এবং মাগুরা সদরের রাউতরার রামনগরের শফিউদ্দিনের ছেলে রাজীবুল ইসলাম ওরফে রাজীব আহমেদকে (২৯) উত্তরা ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের তথ্যের ভিত্তিতে পরে আদাবর এলাকার মোহাম্মদিয়া ক্যাফে থেকে গোপালগঞ্জের আড়পাড়া গ্রামের গাজী আব্দুস সালামের ছেলে গাজী কামরুস সালাম সোহান ওরফে আবু আব্দুল্লাহ (২৭), ঝিনাইদহের নবকাজী গ্রামের নুরু ইসলামের ছেলে সোহেল রানা ওরফে খাদেম ওরফে মোয়াজ্জিন ওরফে সোহেল শহীদুল্লাহ ওরফে সোহেল রানা (২৩) ও চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের ঘুপটির তৃলোনা গ্রামের আব্দুস সোবাহান শেখের ছেলে শেখ মো. আবু সালেহ ওরফে লিটন ওরফে হুরাইয়াকে (৪২) গ্রেপ্তার করা হয়।

সোহেল রানা : গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে সোহেল রানার নেতৃত্বেই থানায় হামলার পরিকল্পনা ও তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে র‌্যাবের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। তামিম চৌধুরী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সারোয়ার জাহানের (দুজনই গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে নিহত) খুবই বিশ্বাসী ছিল এই সোহেল রানা। ঝিনাইদহের একটি মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সে জেএমবির গুপ্তচর হিসেবে সক্রিয় ছিল। তামিমের নির্দেশে সে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জঙ্গি ঘাঁটিতে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। ওই সব জঙ্গি ঘাঁটিতে সোহেল রানার তত্ত্বাবধানেই বিভিন্ন বৈঠক হতো। ওই বৈঠকের সময় সেখানকার সার্বিক নিরাপত্তার দেখভালও করত সে।

র‌্যাব জানায়, সোহেল রানা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে যে তার ঝিনাইদহের বাসায় তামিম ও সারোয়ার ঢাকা থেকে গিয়ে বৈঠক করেছেন। ওই সব বৈঠকে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক ছাত্রও উপস্থিত থাকত। আর ওই বৈঠক থেকে দেশের যেকোনো একটি থানায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল নব্য জেএমবি। তবে আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হিসেবে জঙ্গিরা কোন থানাকে বেছে নিয়েছিল সে ব্যাপারে র‌্যাবের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

কামরুস সালাম সোহান : র‌্যাবের তথ্য মতে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে গাজী কামরুস সালাম সোহান ওরফে আবু আব্দুল্লাহ গাজীপুরের আইইউটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকসে বিএসসি পাস করেছেন। তবে তিনি পেশাগত কাজে না জড়িয়ে নাম লেখান নব্য জেএমবির তামিম-সারোয়ার গ্রুপে। নব্য জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতেন এই জঙ্গি। সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তাঁর মাধ্যমে নব্য জেএমবির ফান্ডে ২৮ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, যশোরে জন্ম নেওয়া সোহান ২০০৭ সালে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে আইইউটিতে ভর্তি হন। সেখানে পড়ার সময় তাঁর কলেজের বন্ধু মোস্তাফিজুর রহমান সিফাতের মাধ্যমে তিনি জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়েন। এর পর থেকে তিনি আৎ-তামকিন জঙ্গি সাইটের অ্যাডমিন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মতাদর্শের কয়েকজনের সঙ্গেও তাঁর ভালো বন্ধুত্ব ছিল। সিফাতই তাঁকে জেএমবির সারোয়ার জাহান শাইখ আবু ইব্রাহিম আল হানিফের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর তিনি চট্টগ্রামে অস্ত্র ও বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। তিনি নব্য জেএমবি জঙ্গিদের বিস্ফোরক তৈরি ও হামলা-নাশকতা চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন।

আব্দুল হাকিম ফরিদি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করে ১৯৯৭ সালে খিলগাঁওয়ে মাখাবাপুর উলুম মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিসে (মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করেন আবদুল হাকিম ফরিদি। জসীম উদ্দিন রাহমানির মাধ্যমে তিনি জঙ্গিবাদে অনুপ্রাণিত হন। এবিটির জসীম উদ্দিন রাহমানির অবর্তমানে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। ইতিমধ্যে জেএমবির তামিম-সারোয়ার ভালো বক্তা হিসেবে আবদুল হাকিমকে দলে টানেন। ক্রমান্বয়ে এই গ্রুপের একজন আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষক হয়ে ওঠেন তিনি। এই জঙ্গি নেতা তামিম-সারোয়ার গ্রুপের সদস্যদের মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে আত্মঘাতী জঙ্গি হিসেবে গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ দিতেন।

আবু সালেহ : তামিম-সারোয়ার গ্রুপে কারাতের একজন প্রশিক্ষক ছিলেন আবু সালেহ। তিনি মূলত ২০০২ সালে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হন। পরের বছর তিনি কারাতে শেখার জন্য কিউকুশান কলাবাগান শাখায় ভর্তি হন। ২০০৯ সালে তিনি ব্ল্যাক বেল্ট পান। বেশ কিছুদিন তিনি ওই শাখায় প্রশিক্ষক ছিলেন এবং ছদ্মবেশে তাঁর দলের অনেকেই সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

রাজীবুল ইসলাম : জেএমবির এই জঙ্গি আধাস্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চালনার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তিনি সারোয়ার-তামিম জঙ্গি গ্রুপে একজন অস্ত্র প্রশিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজীবুল মূলত ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জসীম উদ্দিন রাহমানির ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ২০১৫ সালে মাওলানা হাকিমের মাধ্যমে তিনি তামিম-সারোয়ার গ্রুপে যোগ দেন। ঢাকা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা এই জঙ্গি সিলেটে অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। বর্তমানে একটি সিমেন্ট কম্পানির সেলস্ রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে।

এদিকে গতকাল র‌্যাবের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাবের অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয়। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৩ জন জঙ্গিকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের বর্তমান কর্মপরিকল্পনাসহ নানা তথ্য-উপাত্ত বের হয়ে এসেছে। তবে নব্য জেএমবি সীমিত সামর্থ্যের মাধ্যমে আবারও সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। সে বিষয়ে র‌্যাব কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।


%d bloggers like this: