ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৫

আরিফ রহমান
এক.
ছবিতে নিচে যাকে দেখছেন, মানুষটার নাম ন্যান্সি গ্রেস অগাস্টা ওয়েক। তিনি পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম নারী গুপ্তচর হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফ্রান্স রেজিসটেন্সের গেরিলা বাহিনী মাকিস এর একজন নেতৃস্থানীয় এজেন্ট ছিলেন। ১৯৪০ সালে জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করলে তিনি ফ্রান্স রেজিসটেন্সের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেন ও পরে ক্যাপ্টেন আইয়ান গ্যারোর নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৪২ সালের পর গেস্টাপো বাহিনীর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে ছিলেন ন্যান্সি ওয়েক এবং সেই সময় তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয় ৫ মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক। জার্মানরা তাকে ‘হোয়াইট মাউস’ বলে ডাকত। তাকে হত্যার জন্য উঠেপড়ে লাগে পুরো গেস্টাপো এলিটফোর্স।

যুদ্ধের প্রথম তিন বছর তিনি যুদ্ধাহতদের সেবা শুশ্রূষা করতেন, তাদের পালাতে সাহায্য করতেন এবং বার্তাবাহকের কাজ করতেন। তিনি সৈন্যদের বিভিন্ন ধরনের নকল কাগজপত্র যেমন পাসপোর্ট, ভিসা, পরিচয়পত্র ইত্যাদি তৈরি করে দিতেন। অতঃপর তিনি ফ্রান্স রেজিসটেন্স ও পরে আইয়ান গ্যারোর এস্কেপ নেটওয়ার্কে যোগ দেন।

জার্মানির গেস্টাপো বাহিনীর অন্যতম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দেন ওয়েক। রেজিসটেন্সের সৈন্যরাও তার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতো; কারণ তারা জানতো গেস্টাপো বাহিনী ওয়েকের টেলিফোন ও মেইল টেপ করছে। জার্মান একজন সার্জেন্ট হ্যারোল নামে ইংরেজ স্পাই ছিলেন, যার কাছ থেকেও তারা ওয়েক সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিলো। যখন তার নিজের দলের লোকেরা তার সাথে প্রতারণা করলো তখন ওয়েক মার্সিলিতে তার স্বামীর কাছে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

Nancy Wake 0104

১৯৪৩ সালের মে মাসে গেস্টাপো তার পিছু নেয় ও ওয়েক পালিয়ে ফ্রান্স থেকে স্পেন চলে আসেন। কিন্তু তার স্বামী পরে গেস্টাপো বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন ও তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এজন্য ওয়েক সবসময় নিজেকে দোষ দিতেন। তিনি বলতেন, তার কারণেই তার স্বামী খুন হয়েছেন। তার সাথে দেখা না করলেই তার স্বামী বেঁচে যেতেন।

Nancy Wake 0103

ন্যান্সি যুদ্ধের সময়কার তার কৌশল সম্পর্কে বলেন, ‘আমি যখন জার্মান বাহিনীর তল্লাশি চৌকি পার হতাম তখন মুখে পাউডার মেখে, মদ খেয়ে মাতাল হওয়ার ভান করতাম এবং জার্মানদের বলতাম, তোমরা আমাকে সার্চ করতে চাও?’

Nancy Wake 0106

যুদ্ধের পরপরই ওয়েক অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন। তার মধ্যে আছে জর্জ মেডেল, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা পুরস্কার, মেদেলি দে লা রেজিসটেন্স এবং তিনবার ক্রোইস ডি গ্যারে। ওয়েক ১৯৭০ সালে ক্যাভালিয়ার (নাইট) অফ দ্য লিজি’য়ন অফ অনার লাভ করেন এবং অফিসার অফ দ্য লিজি”য়ন অনার লাভ করেন ১৯৮৮ সালে ফেব্রুয়ারি। ২০০৪ সালে তিনি কম্পেনিয়ন অফ দ্য অর্ডর অফ অস্ট্রেলিয়া গ্রহণ করেন। ২০০৬ সালের এপ্রিলে ওয়েক রয়্যাল নিউজিল্যান্ড রিটার্ন্ড অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ‘আরএসএ স্বর্ণ ব্যাজ’ লাভ করেন।

দুই.
বরিশালের বীরাঙ্গনা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ভাগীরথীর বীরত্বের ইতিহাস অনেকে জানে না, অথচ সেই বীরত্ব ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমি তাই ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টাও করলাম না। ন্যান্সি গ্রেস ওয়েকের বীরত্বের কাহিনী বর্ণনা করলাম। এবারে শুনুন স্বাধীনতার পর দৈনিক আজাদ পত্রিকায়, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে ছাপা হওয়া এই বীরাঙ্গনার বীরত্বের ইতিহাস। তারপর তুলনা করে দেখুন বিশ্বশ্রেষ্ঠ নারী যোদ্ধাদের সাথে। রিপোর্টটি হুবুহু তুলে ধরা হলো—
“মহাদেবের জটা থেকে নয় বাংলা মায়ের নাড়ী ছিঁড়ে জন্ম নিয়েছিলেন যে সোনার মেয়ে সে ভাগীরথীকে ওরা জ্যান্ত জীপে বেঁধে শহরের রাস্তায় টেনে টেনে হত্যা করেছে। খান দস্যুরা হয়তো পরখ করতে চেয়েছিলো ওরা কতখানি নৃশংস হতে পারে। বলতে হয় এক্ষেত্রে ওরা শুধু সফল হয়নি, বর্বরতার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অষ্টাদশী ভাগীরথী ছিল বরিশাল জেলার পিরোজপুর থানার বাঘমারা কদমতলীর এক বিধবা পল্লীবালা। বিয়ের এক বছর পর একটি পুত্র সন্তান কোলে নিয়েই তাকে বরণ করে নিতে হয় সুকঠিন বৈধব্য। স্বামীর বিয়োগ ব্যাথা তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নেমে এল ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। মে মাসের এক বিকালে ওরা চড়াও হল ভাগীরথীদের গ্রামে। হত্যা করলো অনেক কে, যেখানে যেভাবে পেলো। এ নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভাগীরথীকে ওরা মারতে পারল না। ওকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এলো পিরোজপুরে। তারপর ক্যাম্পে তার উপর চালানো হল হিংস্র পাশবিক অত্যাচার।

Nancy Wake 0105
সতী নারী ভাগীরথী। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে তিনি একমাত্র পরিত্রাণের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এলো নতুন চিন্তা, হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরণ করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেব কেন? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিলো এবার। এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয়, দস্তুরমত খানদের খুশি করতে শুরু করলো, ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগালো।

বেশি দিন লাগলো না অল্প কদিনেই নারীলোলুপ সেনারা ওর প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করলো। আর সেই সুযোগে ভাগীরথী ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে শুরু করলো পাকবাহিনীর সব গোপন তথ্য। এক পর্যায়ে বিশ্বাসভাজন ভাগীরথীকে ওরা নিজের ঘরেও যেতে দিতো। আর কোনো বাধা নেই। ভাগীরথী এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যায় আবার ফিরে আসে নিজ গ্রামে। এরই মধ্যে চতুরা ভাগীরথী তার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেল অনেকখানি। গোপনে মুক্তিবাহিনীর সাথে গড়ে তুললো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এরপরই এলো আসল সুযোগ। জুন মাসের একদিন ভাগীরথী খান সেনাদের নিমন্ত্রণ করলো তার নিজ গ্রামে। এদিকে মুক্তিবাহিনীকেও তৈরি রাখা হল যথারীতি। ৪৫ জন খানসেনা সেদিন হাসতে হাসতে বাঘমারা কদমতলা এসেছিলো কিন্তু তার মধ্যে মাত্র কয়েকজনই ফিরতে পেরেছিলো।

Nancy Wake 0107
এরপর আর ভাগীরথী ওদের ক্যাম্পে যায় নি। ওরা বুঝেছে এটা তারই কীর্তি। কীর্তিমানরা তাই হুকুম দিলো জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে নগদ এক হাজার টাকা পুরুস্কার দেয়া হবে।

কিন্তু ভাগীরথী তখনও জানতো না ওর জন্য আরও দুঃসহ ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পরলো ভাগীরথী। তাকে নিয়ে এল পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে। খান সেনাদের এবার ভাগীরথীর উপর হিংস্রতার পরীক্ষার আয়োজন করলো। এক হাটবারে তাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হলো জনবহুল চৌমাথায়। সেখানে প্রকাশ্যে তার অঙ্গাবরণ খুলে ফেললো কয়েকজন খান সেনা। তারপর দু’গাছি দড়ি ওর দুপায়ে বেঁধে একটি জীপে বেঁধে জ্যান্ত শহরের রাস্তায় টেনে বেড়ালো ওরা মহাউৎসবে। ঘণ্টা খানিক রাজপথ পরিক্রমায় পর আবার যখন ফিরে এলো সেই চৌমাথায় তখনও ওর দেহে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে।

Nancy Wake 0102
এবার তারা দুটি পা দুটি জীপের সাথে বেঁধে নিল এবং জীপ দুটিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে। ভাগীরথী দু ভাগ হয়ে গেল। সেই দুভাগে দুই জীপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এলো সেই চৌমাথায় এবং সেখানেই ফেলে রেখে গেল ওর বিকৃত মাংসগুলো। একদিন দুদিন করে মাংসগুলো ঐ রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়। বাংলা মায়ের ভাগীরথী এমনি ভাবেই আবার মিশে গেলো বাংলার ধূলিকণার সাথে।”

মুক্তিযুদ্ধ

তিন.
নাহ ভাগীরথী কোনো পদক পান নাই ন্যান্সি ওয়েকের মত।

আজ/এআর/এমকে/৩০৪

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan

আরও পড়ুন:

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —২

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৩

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৪


%d bloggers like this: