ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৭

আরিফ রহমান ● একাত্তরে আমাদের নারীদের ওপর পরিচালিত পাকিস্তানি সৈন্যদের যৌন নির্যাতন কতোটা মারাত্মক, কতোটা ভয়াবহ, কতোটা বীভৎস ছিলো- যুদ্ধ চলাকালে আমাদের দেশ থেকে প্রকাশিত কোনো দৈনিক পত্রিকায়ই তা প্রকাশিত হয় নি। গনহত্যা, শরণার্থীদের কথা যেমন বিদেশী সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিলো গুরুত্ব নিয়ে সে রকম করে ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতনের খবরগুলো প্রকাশিত হয়নি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে।

এখানে লক্ষণীয় এই নারী নির্যাতন ইস্যু নিয়ে সমৃদ্ধ এখনকার কাজগুলোও তেমন প্রচারণা পায়নি। ডঃ ডেভিস কিংবা সুসান ব্রাউনমিলারের গবেষণা ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন কিংবা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কিছু কাজ ছাড়াও ব্যাক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের করা কিছু দুর্দান্ত কাজ ঠিকই রয়েছে, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এসব কাজ খুব একটা আলোর মুখ দেখতে পারে নি এদেশের মানুষের কাছে। কেন এই নিষ্ক্রিয়তা, প্রথমেই আমাদের খোঁজটা হোক এই প্রশ্ন।

ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর থেকে জাতীয় দৈনিকগুলোতে পাকসেনা কর্তৃক নারী নির্যাতনের বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হলেও ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতনের ধরন, প্রকৃতি, শারীরিক, মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। “স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও দলিল প্রামাণ্যকরন” প্রকল্পের তৎকালীন গবেষক, বর্তমানে ইংরেজী দৈনিক ডেইলি স্টারের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক আফসান চৌধুরী এজন্য ইতিহাস রচনার সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করে বলেছেন, দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখনে বরাবরই সশস্ত্র লড়াই, ক্ষমতাসীন পুরুষদের কৃতিত্ব গ্রন্থিত করার উদ্যোগ চলছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে লাখ লাখ নারী অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও যেভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হয়েছে, সনাতনি মানুসিকতার কারণে কখনই তা নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সংঘর্ষকালীন ধর্ষণ এবং অন্যান্য নির্যাতনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষক ক্যাসান্দ্রা ক্লিফোর্ড, ধর্ষণ কীভাবে হয়ে ওঠে গণহত্যার অনিবার্য অস্ত্র সে সম্পর্কে লিখেছেন
“Rape as a Weapon of War and its Long-term Effects on Victims and Society”

71.04.1

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশে সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী নারী নির্যাতনের এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নয় মাসে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনকে একটি বিকৃত শিল্পের পর্যায়ে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই নির্যাতনের সংখ্যাগত মাত্রা সুবিশাল, এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা ছয় লক্ষের বেশী। যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী শিকার নারী। সম্ভবত পৃথিবীতে এমন কোন যুদ্ধ ঘটেনি যেখানে ধর্ষণ হয় নি। আক্রান্ত গোষ্ঠীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে,আতঙ্কের রাজত্ব সৃষ্টি করতে,প্রতিরোধ গড়ে ওঠার চেষ্টাকে গুঁড়িয়ে দিতে ধর্ষণ সহ অন্যান্য নারী নির্যাতন হয়ে ওঠে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রধানতম অস্ত্র। তারপরেও আগ্রাসী সেনাবাহিনীকে নারী নির্যাতনে সরাসরি উৎসাহিত করেছে কর্তৃপক্ষ , এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব বেশি ঘটেনি। এই বিরল নিদর্শন পাকিস্তান সেনাবাহিনী রেখে গেছে ১৯৭১ সালে,বাংলাদেশ ভূখণ্ডে।

ডঃ মুনতাসির মামুন যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন নিয়ে লিখেছেন অনেক। তিনি তার ‘মুক্তিযুদ্ধ, নির্যাতন, বিচার’ শীর্ষক প্রবন্ধে গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন যুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস লুকোনোর প্রচেষ্টা নিয়ে।

তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমের কথা। তার অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছিলো ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নামে দু’খণ্ডে এ সম্পর্কে তিনি গ্রন্থও। তার বিবরণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের নারী নির্যাতনের অনেক বিবরণ আছে। যেমন ‘আমাদের শাড়ি পরতে বা দোপাট্টা ব্যবহার করতে দেয়া হতো না। কোনো ক্যাম্পে নাকি কোনো মেয়ে গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই আমাদের পরনে শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ। যেমন ময়লা তেমনি ছেঁড়া-খোঁড়া। মাঝে মাঝে শহরের দোকান থেকে ঢালাও এনে আমাদের প্রতি ছুঁড়ে ছেড়ে দিত। যেমন দুর্গাপূজা বা ঈদের সময় ভিক্ষা দেয় অথবা যাকাত দেয় ভিখারিকে। চোখ জলে জলে ভরে উঠত।

শাহরিয়ার কবিরকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বীরাঙ্গনাদের যে তালিকা ছিল স্বয়ং বঙ্গবন্ধু তা বিনষ্ট করে ফেলার জন্য বলেছিলেন কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ হলেও সমাজের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। সমাজ এদের গ্রহণ করবে না।

71.03.1 (1)

স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য এবং যুদ্ধাপরাধ এ মাটিতে কী পর্যায়ে গিয়েছিল তার সাক্ষ্য হিসেবে। সেই মহিলারা এতদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছিলেন। কিন্তু এ ঘটনার পর সমাজপতি ও পরিবারের সদস্যবৃন্দ তাদের প্রায় পরিত্যাগ করে। খুলনায় আমি একজন মহিলাকে পাগলিনি বেশে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি যিনি ’৭১ সালে নির্যাতিত হয়েছিলেন। খুলনার অনেকেই তা জানেন, কিন্তু কেউ তার পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেন নি। এই হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালির আসল রূপ। ডঃ মামুন লিখেছেন; সবাই প্রিয়ভাষিণী নন। প্রিয়ভাষিণীর যা আছে তা হলো চরিত্র, যা আমাদের নেই। থাকলে বাংলাদেশকে পোড়ার বাংলাদেশ বলতাম না।

নির্যাতনের জন্য পাকিস্তানী সৈন্যরা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতো তা নিয়ে আলোচনা করেছেন শাহারিয়ার কবির এবং মুনতাসির মামুন। এছাড়া এ সম্পর্কে গবেষণা লব্ধ “নারী নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ICSF এর অফিসিয়াল ওয়েবে। সব কিছু মিলিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নির্যাতনের কয়েকটি প্রচলিত পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলোঃ

১. অশ্লীল ভাষায় গালাগালি, তৎসঙ্গে চামড়া ফেটে রক্ত না বেরুনো পর্যন্ত শারীরিক প্রহার,
২. পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা এবং সেই সঙ্গে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো এছাড়া রাইফেলের বাঁট দিয়ে নির্মম ভাবে প্রহার,
৩. উলঙ্গ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা,
৪. সিগারেটের আগুন দিয়ে সারা শরীরে ছ্যাঁকা দেয়া,
৫. হাত ও পায়ের নখ ও মাথার ভিতর মোটা সুঁচ ঢুকিয়ে দেয়া,
৬. মলদ্বারের ভিতর সিগারেটের আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া এবং বরফখন্ড ঢুকিয়ে দেয়া,
৭. চিমটে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা,
৮. দড়িতে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মাথা গরম পানিতে বারবার ডোবানো,
৯. হাত-পা বেঁধে বস্তায় পুরে উত্তপ্ত রোদে ফেলে রাখা,
১০. রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ ও মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়া,
১১. নগ্ন ক্ষতবিক্ষত শরীর বরফের স্ল্যাবের ওপরে ফেলে রাখা,
১২. মলদ্বারে লোহার রড ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া,
১৩. পানি চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেয়া,
১৪. অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন চোখের ওপর চড়া আলোর বাল্ব জ্বেলে ঘুমোতে না দেয়া,
১৫. শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ প্রভৃতি।

এটা তো সার্বজনীন ছিল। গণহত্যার একেবারে শুরুতে ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ধরণ যেমন ছিল সেটা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। অবশ্য নির্যাতনের ভয়াবহতার কোনো পরিবর্তন হয়নি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই মাত্রায় নৃশংসতা চালানো হয়েছে।

71.16.1_0

নির্যাতনের এই ধরণগুলো সংক্ষেপে এরকম –
১. মার্চ এপ্রিলের দিনগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। কখনো ধর্ষণের পর তাদেরকে রাজাকার,আলবদর ও অন্যান্য দোসরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ধর্ষণ ও ভোগ শেষে হত্যা করার জন্য।

২. মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েদেরকে ( যাদের সংখ্যা মোট নির্যাতিতার শতকরা আশি ভাগ ) যেখানে পেয়েছে সেখানেই ধর্ষণ করেছে, বিশেষ করে একাত্তরের এপ্রিল থেকে।ক খনও তাদের বাসস্থলে,এককভাবে কিংবা পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও নিকটজন বিশেষ করে স্বামী-সন্তান। শ্বশুর-শাশুড়ি,বাবা-মায়ের সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের এই বর্বর প্রক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছিল ধর্ষিতা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনসহ বাঙালি সম্প্রদায়ের অহংকার ও অস্তিত্বকে আঘাত করার জন্য। সেই সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিকারগ্রস্ত প্রকৃতি চরিতার্থ করার জন্য।

৩. কখনও তারা বাঙালি মেয়েদেরকে ক্যাম্পে বন্দি রেখে ভোগ্যপণ্য ও যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহার করেছে।

৪. কখনও একক সম্পদ ও দাসী হিসাবে মেয়েদেরকে তারা এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গেছে।

৫. প্রাথমিক অত্যাচারের সময় অথবা দীর্ঘভোগের পর পালিয়ে যাবার সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই মেয়েদের স্তন, উরু, যৌনাঙ্গসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের অংশ কেটে নিয়ে গেছে fetichistic crisis ও মনোবিকারে আক্রান্ত হয়ে।

৬. সৈনিকেরা প্রতিটি যুবতী, মহিলা ও বালিকার পরণের কাপড় সম্পূর্ণ খুলে একেবারে উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ধর্ষণে লিপ্ত হতো।

৭. সৈনিকেরা অনেক সময় মেয়েদের পাগলের মত ধর্ষণ করে আর ধারালো দাঁত দিয়ে বক্ষের স্তন কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিত, এতে অনেক অল্পবয়স্ক মেয়ের স্তনসহ বুকের মাংস উঠে এসেছিল। মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বুক, পিঠ ও কোমরের অংশ পাকিস্তানি সৈনিকের অবিরাম কামড়ে রক্তাক্ত হয়ে যেত।

৮. সাধারণত যে সকল বাঙালি মেয়ে এধরণের পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করতো তাদেরকে তখনই চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছিঁড়ে ফেলে,যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যা করা হতো।

৯. অনেক উচ্চপদস্থ অফিসার মদ খেয়ে উলঙ্গ বালিকা,যুবতী ও বাঙালি মেয়েদের সারাক্ষণ পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করতো। বহু অল্প বয়স্ক বালিকা উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে রক্তাক্ত শরীরে কাতরাতে কাতরাতে মারা যেত।

১০. অনেক সময় প্রাণভয়ে অন্যান্য মেয়েরা স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি সৈনিকদের কাছ আত্মসমর্পণ করতো।তাদেরকেও হঠাৎ একদিন ধরে ছুরি চালিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে হত্যা করে আনন্দ উপভোগ করতো সৈনিকেরা।

Pakistani Rapists in 1971

১১. অনেক সময় যুবতী মেয়েকে মোটা লোহার রডের সাথে চুল বেধে ঝুলিয়ে রাখা হতো।পাকসেনারা প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত করতো,কেউ কেউ এসে সেই উলঙ্গ যুবতীদের উলঙ্গ দেহে উন্মত্তভাবে আঘাত করতো,কেউ তাদের স্তন কেটে নিয়ে যেত,কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করতো।এসব অত্যাচারে কোন মেয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হতো।

১২. অনেক মেয়ের হাত পিছনের দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। সৈনিকেরা এসব মেয়েদের এলোপাথাড়ি ভাবে প্রহার করতো।এভাবে প্রতিদিন বিরামহীন প্রহারের মেয়েদের শরীর থেকে রক্ত ঝরতো।কোন কোন মেয়ের সম্মুখের দিকে দাঁত ছিল না,ঠোঁটের দু’দিকের মাংস কামড়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল এবং প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল লাঠি ও রডের আঘাতে ভেঙ্গে,থেঁতলে গিয়েছিল।এক মুহূর্তের জন্যও প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনেও এসব মেয়ের হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হতো না। অবিরাম ধর্ষণের ফলে ফলে অনেক মেয়ে ঝুলন্ত অবস্থাতেই মারা যেত।

১৩. অনেক সময় বন্দি বাঙালি মেয়েদের নদীতে শিকল বাঁধা অবস্থায় গোসল করতে যেতে দিত।এসময় একটু দেরি হলেই সৈনিকেরা তাদের ঘাঁটি থেকে শিকল ধরে টানাটানি করতো।এধরণের টানাটানিতে অনেক সময়ই প্রায় বিবস্ত্র শরীরে এসব মেয়েকে ঘাঁটিতে ফিরতে হতো।

১৪. গণহত্যার প্রথম দিকে ক্যাম্পে পাকিস্তানি সৈনিকদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক মেয়ে ওড়না বা শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।এর পর থেকে এসব মেয়েকে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা হয়।

১৫. পাকিস্তানি সৈনিকেরা গর্ভবতী এবং প্রসূতি নারীদেরও ধর্ষণ করে।এতে অনেকেরই মৃত্যু হয়।

১৬. সৈনিকেরা অনেক সময় হঠাৎ গ্রামে বা বসতিতে আক্রমণ চালিয়ে পলায়নরত মহিলাদের ধরে এনে উন্মুক্ত স্থানেই ধর্ষণে লিপ্ত হতো।

১৭. অনেক সময় পিতার সামনেই মেয়েকে, সন্তানের সামনে মাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করতো পাকিস্তানি সৈনিকেরা। কখনও কখনও পিতাকে,ছেলেকে বা ভাইকে আদেশ করতো মেয়েকে,মাকে অথবা বোনকে ধর্ষণ করতে। এতে অবাধ্য হলে সাথে সাথে তাদের হত্যা করা হতো।

তথ্যসূত্র:
১) বীরাঙ্গনাদের কথা – সুরমা জাহিদ
২) ‘৭১ এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ – ডা. এম এ হাসান
৩) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান – শাহনাজ পারভিন
৪) A Tale of Millions – Rafiqul Islam BU
৫) Against Our Will : Men,Women and Rape – Susan Brownmiller
৬) Rape as a Weapon of War and it’s Long-term Effects on Victims and Society – Cassandra Clifford
৭) East Pakistan The Endgame – Brigadier A. R. Siddiqi
৮) মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ – মুনতাসীর মামুন
৯) icsforum.org
১০) ৭১-এর নারী নির্যাতন,কাজী হারুনুর রশীদ সম্পাদিত
১১) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র,অষ্টম খন্ড,হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত
১২) ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২
১৩) আমি বীরাঙ্গনা বলছি – নীলিমা ইব্রাহীম

আজ/এআর/এমকে/৩০৪

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan

আরও পড়ুন:

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —২

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৩

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৪

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৫

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৬


%d bloggers like this: