ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —১০

আরিফ রহমান ● রাজশাহীর বাগমারা গ্রামের দেলজান বিবির কথা বলছি। সময়টা ছিলো ১৯৭১ সালের রমজান মাস, দেলজান বিবি রোজা ছিলেন। হঠাৎ পাকসেনারা তার ঘরে ঢুকে পড়ে এবং ধর্ষণ শুরু করে। দেলজান বিবিকে রোজা থাকা অবস্থায় ধর্ষণ করে পাকসেনারা। একই গ্রামের সোনাভান খাতুনকেও রাস্তায় প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা হয়।

১০ ডিসেম্বর যশোরের মাহমুদপুর গ্রামের একটি মসজিদ থেকে এগারোটি মেয়েকে উলঙ্গ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাদেরকে যুদ্ধের সময় প্রায় সাত মাস ধরে মসজিদের ভেতরেই ধর্ষণ এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়।

রাজশাহী শহরের একটি বাড়িতে আনুমানিক তিরিশ বছর বয়স্কা একজন মহিলা নামাজ পড়ছিলেন। সেই অবস্থাতেই ফেলে দিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়; তিনি মারা যান জায়নামাজের উপরেই। এই ঘটনা দেখে তার স্বামীও তখনই মারা যান।

মসজিদ, নামাজ এবং রোজাও যে পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বতার পথে বাধা হয়নি, সেটা বোঝাতেই ‘পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য’ সিরিজের এ পর্বের শুরুটা এই ঘটনাগুলো দিয়ে করা। যেসব বাঙালি মুসলমানরা ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানপ্রেম এখনো অটুট রেখেছেন, সেসব বাঙালিদের পাকিস্তানপ্রেম কমাতে এই ঘটনাগুলো একটু হলেও ভূমিকা রাখবে আশা করছি। আমরা বাঙালি।

Pakistani_genocide_1971_23022016 008 aaj24.com

পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার আরো উন্মোচন হবে সিরিজের এই পর্বে। আবারো বলছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি নরপিশাচদের নৃশংসতার শিকার হয়েছেন, চোখ বন্ধ করে একবার ভেবেছেন কি তাদের জায়গায় গিয়ে ১৯৭১ সালে? এই সিরিজের ৯টি পর্ব পড়ার পরও যদি কোনো বাঙালির পাকিস্তানপ্রেম এখনো অটুট থাকে, এবারের পর্বটা পড়লে হয়তো সেই অটুট ভাবটা কিছুটা হলেও টলবে…

Pakistani_genocide_1971_23022016 001 aaj24.com

সুজান ব্রাউনমিলার লিখেছেন তের বছরের কিশোরী খাদিজার কথা—

Khadiga, thirteen years old, was walking to school with four other girls when they were kidnapped by a gang of Pakistani soldiers. All five were put in a military brothel in Mohammedpur and held captive for six months until the end of the war. Khadiga was regularly abused by two men a day; others she said, had to service seven to ten men daily… At first, Khadiga said, the soldiers tied a gag around her mouth to keep her from screaming. As the months wore on and the captives’ spirit was broken, the soldiers devised a simple quid pro quo. They withheld the daily ration of food until the girls had submitted to the full quota.

২৭ মার্চ, ১৯৭১। ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে লাশ ট্রাকে তুলতে গিয়ে একটি চাদরে ঢাকা ষোড়শী মেয়ের লাশ দেখতে পান ডোম পরদেশী। সম্পূর্ণ উলঙ্গ লাশটির বুক এবং যোনিপথ ছিল ক্ষতবিক্ষত, নিতম্ব থেকে টুকরো টুকরো মাংস কেটে নেয়া হয়েছিল। ২৯ মার্চ শাঁখারিবাজারে লাশ তুলতে গিয়ে পরদেশী সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরে নারী, পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতার লাশ দেখতে পান। লাশগুলি পচা এবং বিকৃত ছিলো। বেশিরভাগ মেয়ের লাশ ছিল উলঙ্গ, কয়েকটি যুবতীর বুক থেকে স্তন খামচে, খুবলে তুলে নেয়া হয়েছে; কয়েকটি লাশের যোনিপথে লাঠি ঢোকানো ছিলো। মিল ব্যারাকের ঘাটে ৬ জন মেয়ের লাশ পান তিনি। এদের প্রত্যেকের চোখ, হাত, পা শক্ত করে বাঁধা ছিলো, যোনিপথ রক্তাক্ত এবং শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা ছিলো।

Pakistani_genocide_1971_23022016 011 aaj24.com

তৎকালীন ঢাকা পৌরসভার সুইপার সাহেব আলী ২৯ মার্চ তার দল নিয়ে শুধুমাত্র মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে কয়েক ট্রাক লাশ উদ্ধার করেন। তিনি আরমানিটোলার এক বাড়িতে দশ এগারো বছরের একটি মেয়ের লাশ দেখতে পান, সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত, জমাট বাঁধা ছোপ ছোপ রক্ত সারা গায়ে এবং তার দেহের বিভিন্ন স্থানের মাংস তুলে ফেলা হয়েছিলো। ধর্ষণ শেষে মেয়েটির দুই পা দুইদিক থেকে টেনে ধরে নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিলো।

৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের চারতলার ছাদের উপরে আনুমানিক ১৮ বছরের একটি মেয়ের লাশ পান সাহেব আলী, যথারীতি উলঙ্গ। পাশে দাঁড়ানো এক পাকসেনার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন মেয়েটিকে হত্যা করতে ধর্ষণ ছাড়া অন্য কিছু করার দরকার পড়েনি, পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের ফলেই তার মৃত্যু ঘটে। মেয়েটির চোখ ফোলা ছিলো, যৌনাঙ্গ এবং তার পার্শ্ববর্তী অংশ ফুলে পেটের অনেক উপরে চলে এসেছে, যোনিপথ রক্তাক্ত, দুই গালে এবং বুকে কামড়ের স্পষ্ট দাগ ছিলো।

Pakistani_genocide_1971_23022016 004 aaj24.com

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুজিত সরকার, ১৯৭১ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র। ক্যাম্পে বন্দী থাকার সময় দেখেছেন অনেক মেয়েকে অসুস্থ হয়ে যেতে। তাদের শরীরে দগদগে ঘা হয়ে যাচ্ছিলো, যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত হতো, তারপরও রেহাই পেতেন না তারা। দুই একজন উন্মাদ হয়ে প্রলাপ বকতেন। একদিন রাজাকারেরা ধর্ষণের সময় সুজিত সরকারকেও ধর্ষণে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা জোর করে মেয়েদের যৌনাঙ্গে তার মুখ চেপে ধরে ঘষে দেয়।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনের একজন সুবেদার খলিলুর রহমানেরও হয়েছিলো ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে, ট্রাক থেকে নামিয়ে সাথেই সাথেই শুরু হতো ধর্ষণ, দেহের পোশাক খুলে ফেলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ধর্ষণ করা হতো। সারাদিন ধর্ষণের পর এই মেয়েদের হেড কোয়ার্টার বিল্ডিংয়ে উলঙ্গ অবস্থায় রডের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখ হতো এবং রাতের বেলা আবারো চলতো নির্যাতন। প্রতিবাদ করা মাত্রই হত্যা করা হতো, চিত করে শুইয়ে রড, লাঠি, রাইফেলের নল, বেয়নেট ঢুকিয়ে দেয়া হত যোনিপথে, কেটে নেয়া হত স্তন। অবিরাম ধর্ষণের ফলে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলেও থামতো না ধর্ষণ।

Pakistani_genocide_1971_23022016 002 aaj24.com

১৯৭১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে পাকবাহিনীর একটি বিরাট ক্যাম্পে পরিণত করা হয়। এখানে বন্দী ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মঞ্জিলা এবং তার দুই বোন মেহের বানু এবং দিলরুবা। তাদেরকে আরো ৩০ জন মেয়ের সাথে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকতো দুজন সশস্ত্র গার্ড। এই মেয়েগুলোকে ওই ক্যাম্পের সামরিক অফিসারদের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়া হত ৫/৬ জন মেয়েকে এবং ভোরবেলা ফিরিয়ে দেয়া হতো আধমরা অবস্থায়। প্রতিবাদ করলেই প্রহার চলতো নারকীয় কায়দায়। একবার একটি মেয়ে একজন সৈনিকের হাতে আঁচড়ে দিলে তখনই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বন্দীশালায় খাবার হিসাবে দেয়া হত ভাত এবং লবণ।

সাংবাদিক রণেশ মৈত্রের একটি অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, রংপুর ক্যান্টনমেন্ট এবং রংপুর আর্টস কাউন্সিল ভবনটি নারী নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হতো। এখানে বন্দী ছিলো প্রায় একশ মেয়ে এবং প্রতিদিনই চলতো নির্যাতন। আর যারা অসুস্থ হয়ে পড়তো তাদের হত্যা করা হতো সাথে সাথেই। স্বাধীনতার পরে আর্টস কাউন্সিল হলের পাশ থেকে অনেক মহিলার শাড়ি, ব্লাউজ, অর্ধগলিত লাশ, কঙ্কাল পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, রংপুর থেকে প্রায় তিন/চারশ মেয়েকে ঢাকা এবং অন্যান্য জয়গায় পাচার করে দেওয়া হয়, যাদের আর কোনো সন্ধান মেলেনি।

Pakistani_genocide_1971_23022016 005 aaj24.com

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের একটি গবেষণায় জানা যায়, রাজশাহীর জুগিসশো গ্রামে মে মাসের কোনো একদিন পাকবাহিনী ১৫ জন মহিলাকে ধর্ষণ করে এবং অন্যান্য নির্যাতন চালায়। এ অঞ্চলের ৫৫ জন তরুনীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে পাকবাহিনী প্রায় দেড়শো জন বিভিন্ন বয়সী মেয়েকে ঘর থেকে বের করে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে। এদের মধ্যে ১০ জনের তখনই মৃত্যু ঘটে।  এই গবেষণা থেকেই এ পর্বের শুরুতে বলা বাগমারা গ্রামের দেলজান বিবি, সোনাভান খাতুন এবং যশোরের মাহমুর গ্রামের ঘটনা জানা যায়।

যশোর ক্যান্টনমেন্টে চৌদ্দ দিন বন্দী থাকা হারেছ উদ্দিনের ভাষ্যে জানা যায় ক্যান্টনমেন্টে ১২ থেকে ৫০ বছর বয়সের ২৯৫ জন মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছিলো; তাদের উপর নির্যাতন চলতো প্রতি রাতেই। হারেছ উদ্দিনের সেলটি বেশ খানিকটা দূরে থাকলেও নির্যাতনের সময় মেয়েদের চিৎকার তিনি শুনতে পেতেন। প্রতিদিন বিকালে একজন সুবেদার এসে, কে কোথায় যাবে তার একটি তালিকা বানাতো। সন্ধ্যা হলেই এই তালিকা অনুযায়ী মেয়েদের পাঠানো হতো। অনেক সময় খেয়াল খুশি মতো বাইরে নিয়ে এসে তাদের এলোপাতাড়িভাবে ধর্ষণ করা হতো।

Pakistani_genocide_1971_23022016 010 aaj24.com

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মাটিরহাট গ্রামের ফুলজান যুদ্ধের সময় আট মাসের গর্ভবতী ছিলো। তার বাবা মায়ের সামনেই তাকে কয়েকজন পাকসেনা ধর্ষণ করে। তার গর্ভের সন্তানটি মারা যায়।

কুমারখালীর বাটিয়ামারা গ্রামের মোঃ নুরুল ইসলামের বর্ণনায় একটি আপাত-অদ্ভুত ঘটনা জানা যায়। ঐ এলাকার একজন রাজাকারকে একদিন দুজন পাকসেনা মেয়ে যোগাড় করে দিতে বললে সে তাদেরকে তার বাড়ি নিয়ে যায়। এই খবর পেয়ে বাড়ির সব মেয়ে পালিয়ে গেলেও তার বৃদ্ধা মা বাড়িতে থেকে যান। দুই পাকসেনা রাজাকারটির বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে তার মাকে ধর্ষণ করে। এরপর রাজাকারটির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি।

নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কম যায়নি বিহারীরাও। নৃশংসতায় তারা কখনো কখনো ছাড়িয়ে গিয়েছিলো পাকবাহিনীকেও। ২৬ মার্চ ’৭১ মিরপুরের একটি বাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবা ও ছেলেকে আদেশ করা হয় যথাক্রমে মেয়ে এবং মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি না হলে প্রথমে বাবা এবং ছেলেকে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সঙ্গে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

খুলনার ডা. বিকাশ চক্রবর্তীর কাছ থেকে জানা যায়, সেখানকার পাবলিক হেলথ কলোনি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্থাপিত ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক মেয়েকে(প্রায় সববয়সের) আটকে রেখে পূর্বোক্ত কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। যুদ্ধশেষে ক্যাম্পের একটি কক্ষ থেকে কয়েকটি কাঁচের জার উদ্ধার করা হয়; যার মধ্যে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিলো মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ। অংশগুলি কাটা হয়েছিলো খুব নিখুঁতভাবে।

যৌনদাসী হিসেবে বাঙালি মেয়েদের বন্দী করে রাখার একটি ঘটনা প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়, ২৫ অক্টোবর ১৯৭১–

One of the most horrible revelations concerns 563 young bengali women,some of 18, who have been held captive inside Dacca’s dingy military cantonment since the first five days of the fighting,Seized from University and Private Homes and forced into military brohees,the girls are all three to five months pregnant.

১৯৭২ সালে নরওয়ের একদল টেলিভিশন সাংবাদিকের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেসময়কার স্বাস্থ্য ও শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী জানান, মিত্রবাহিনী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করে সাতশ বিবস্ত্র নারীকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পায়। জানা যায়, ২৫ মার্চের পর থেকেই সারাদেশ থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে এখানে রাখা হতো। এছাড়াও সিলেট বিমান বন্দরে তিনশ মেয়েকে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো বিবস্ত্র অবস্থায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর ৩টি বন্দিশিবিরে পাঁচশর বেশি মেয়ে বন্দী ছিলো।

টাঙ্গাইলের ছাব্বিশা গ্রামের ভানু বেগমকে ধর্ষণ করতে গেলে তিনি বাধা দেন। তখন পাকসেনারা তার এক বছরের শিশু সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে উদ্যত হয়। নিরুপায় ভানু বেগমকে এরপর বার বার ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণশেষে জ্বলন্ত আগুন চেপে ধরে পাকসেনারা ঝলসে দেয় তার শরীরের বিভিন্ন অংশ।

এখানে কয়েকজন নারীর কথা উল্লেখ করছি, যারা ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ফলে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হয়েছেন।

‘গণ্ডগোল শুরু হওয়ার পর থাইকাই তো পালাইয়া পালাইয়া বেড়াইছিলাম। একদিন ঐখানে নিছে, কালাই ক্ষেতে। তখন নয় মাসের বাচ্চা পেটে। ছেলেটা হইছিলো। পেটে বাচ্চাটা তহনই পইড়া যায়। তহন তো আমার অবস্থাও যায় যায় করে। একদিকে এই অত্যাচার আবার অন্য দিকে পেটের সন্তানও মারা গেছে। একভাবে তো বাইর করতে হইবো। …আমার অবস্থা ক্রমে খারাপ হইতেছে। এক সময় আমারে বাঁচানোই দায় হইয়া পড়ছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন কাউকেই পাওয়া যায়নি তখন গ্রামের লোকেরাই আমারে বাঁচানোর জন্য আগাইয়া আইলো। তখন তারা দা, বটি দিয়ে ছেলেটারে কাইটা কাইটা পেট থেকে বের করে। তখন দেখে সেই সন্তান ছেলে সন্তান। তারপর তো আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়। তখন আমারে তাড়াতাড়ি করে মেডিকেলে নিয়ে গেলো। ৪ বৎসর রইছি মেডিকেলে। নির্যাতনের কারণে পায়খানার রাস্তাটা আর সন্তানের রাস্তা এক হইয়া গেছিল। অপারেশন করতে হয় পাঁচটা বড় বড় অপারেশন। এই জায়গাটা এভাবেই আছে, সেই ৩০ বছর ধরে এভাবেই। এই পর্যন্ত কত কষ্ট করতাছি। সারাদিন ডোমা (কাপড়ের ন্যাকড়া) দিয়া পেঁচায়া রাখি। ঐ যে খাঁচাটা আছে না, তার মধ্যে জমাই। পরে একবারে নিয়া ধুইয়া আনি। সারাদিন কি ধোয়া সম্ভব। একটু পর পর ডোমা পাল্টাইতে হয়। এই পাঁচ, দশ মিনিট পরপর।… রাস্তা দুইটা এক হওয়াতে পায়খানার রাস্তা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তাই পায়খানার রাস্তাটা পেটের ঠিক নাভির পাশে করিয়ে দেয়। তাই কোন নির্দিষ্ট সময়ে তা করতে হয় না। সারাক্ষণই পায়খানা বের হতে থাকে। তাই এই ডোমা দিয়ে রাখি। গায়ে দুর্গন্ধ হয়ে থাকে। ঐ কাজ করার পরে তো পায়খানা আর পেশাবের রাস্তা এক হয়ে গেছে। ২টা পর্দা আছে না? এক হয়ে গেছে। পরে পায়খানা সারাক্ষণ আসতেই থাকে সন্তানের রাস্তা দিয়ে। জরায়ু কয় না? জরায়ু দিয়েও পায়খানা আসে। তারপরই অপারেশন করে এই ব্যবস্থা করে দেয়। …ধইরা নিছে সকাল ১১টার দিকে। আনছে একেবারে মাগরিবের পরে হয়তো। আমি কইতে পারি না কহন আনছে। আমার একটা ননদ আছিলো, ঐ ননদের মেয়ে দেইখ্যা বাড়িতে কইলে অন্যরা যাইয়া নিয়ে আসে, কোনো কোনো সময় জ্ঞান ছিলো। আবার কোনো কোনো সময় অজ্ঞান ছিলাম। অনেক পাকবাহিনী ছিলো। আর দুইজন রাজাকার।” গাজীপুরের বীরাঙ্গনা মমতার বর্ণনা থেকে উপরের অংশ তুলে ধরা হয়েছে।

Pakistani_genocide_1971_23022016 009 aaj24.com

ফরিদপুরের আন্না সেনকে যখন ধর্ষণ করা হয় তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। স্বাধীনতার পর যদিও বিয়ে হয় আন্নার, ততদিনে তিনি নির্যাতনের তীব্রতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এমন মানসিক জটিলতায় আচ্ছন্ন। বিয়ের পরপরই আত্মহত্যা করেন আন্না।

যুদ্ধের পর লজ্জায় অনেক নারীই পাকিস্তানি সেনাদের অনুগামী হয়েছেন। চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও তারা এপথে পা বাড়িয়েছেন পরিচিত সমাজে মুখ দেখানোর লজ্জায়।

কাপাসিয়ার মনোয়ারা বেগমের স্বামীকে হত্যা করার পর এক সিপাহী তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পে ক্যাম্পে রাখতো, গণহারে ধর্ষণ করতো। যুদ্ধশেষে ঐ সৈনিক মনোয়ারাকে নিয়ে যায় পাকিস্তানের করাচি। করাচির আয়েশা কলোনীতে রেখে সেই সিপাহী মনোয়ারাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর প্রতি রাতেই বড় বড় অফিসারদের কাছে নিয়ে যেতো। আস্তে আস্তে আরো বড় বড় জায়গায় নিয়ে যেতো আর সারাদিন থাকতো বন্দী। এক সময় তাকে বিক্রি করে দুবাই, দুবাই থেকে ফ্রান্স, তারপর সৌদিআরবে, তারপর আবার ফ্রান্স, এভাবেই চলেছে তার উপর নির্যাতন ধর্ষণ। একসময় যখন সে অচল হয়ে পড়ে, তাকে দিয়ে আর এসব কাজ চলে না, তখন ফেলে দেয় রাস্তায়। সেই মনোয়ারা একসময় অর্ধপাগল অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে আসে। যখন সে পাকিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাঁদছে, তখন এক বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার কাছে মনোয়ারা জানিয়েছিলো তার জীবনের একটা ইচ্ছার কথা। সে মরার আগে যেন তার দেশ, প্রিয়জনদের দেখতে পায়। তার এই আকুল আবদারটুকু সেই বাঙালি রেখেছিলো। বহু চেষ্টা করে তার জীবনের এই একটা ইচ্ছা পূরণ করলেন সেই মনোয়ারাকে উদ্ধারকারী সাইফুল ইসলাম, দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ১৯৯১ অথবা ১৯৯২ সালের দিকে মনোয়ারা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে এখন তিনি ভিক্ষা করে খান।

Pakistani_genocide_1971_23022016 003 aaj24.com

‘পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য’ সিরিজের ৭,৮,৯ এবং ১০ পর্বের ঘটনাগুলো কেবল নির্বাচিত কয়েকটি। এছাড়াও এমন অজস্র অগণিত নির্মম বর্বরতা ঘটেছে ’৭১ সালে, দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে। সম্ভবত, এখন সময় এসছে এসব ঘটনাগুলোকে সামনে নিয়ে আসার। তা না হলে এই রক্তের ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়।

আজ/এআর/এমকে/৩০৪

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan

আরও পড়ুন :

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —২

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৩

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৪

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৫

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৬

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৭

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৮

পাকিস্তানপ্রেমী বাংলাদেশীদের জন্য —৯

‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ৩০ লাখের কম, পারলে প্রমাণ করেন’

শহিদ বলতে আপনি কী বুঝেন?

পঞ্চাশজন ‘নিরপেক্ষ’ বুদ্ধিজীবী বনাম একজন তরুণ ছাত্র

[‘আজ’ এর সব কনটেন্ট কোনো ধরনের বিকৃতি ছাড়া ইতিবাচক ও সামাজিক কাজে ব্যবহার করা যাবে]


%d bloggers like this: