ঢাকা, বুধবার , ২৪ জুলাই ২০১৯, | ৯ শ্রাবণ ১৪২৬ | ২০ জিলক্বদ ১৪৪০

পাকিস্তান—তুরস্ক : চোরে চোরে মাসতুতো ভাই

সহুল আহমদ ● 

নিজামীর ফাঁসির পরমুহূর্তেই তুরস্কের রাষ্ট্রীয়দূত প্রত্যাহারের মাধ্যমে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্বয়ং গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত তুরস্ক। এর আগে সাকা, মুজাহিদদের বিচারের সময়ও বিচার ও ফাঁসির প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তানের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করেছিল তুরস্ক সরকার। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে যে তুরস্ক সৌদির আরবের ঘটনায় বলে যে সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, সেখানে তুরস্ক কোন প্রয়োজনে নাক গলাতে আসে বাংলাদেশের ব্যাপারে? কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তারা বারে বারে পাকিস্তান ও একাত্তরের তাদের দোসরদের পক্ষ নিচ্ছে?

পাকিস্তান ও তুরস্ক— ৩২৪৬ কিলোমিটার দূরত্বের দুটো দেশকে যে জিনিস একই বিন্দুতে মিলিয়ে দিচ্ছে বার বার সেটা হচ্ছে ‘গণহত্যা’ অর্থাৎ Genocide। অবশ্য তুরস্ক যখন গণহত্যা চালায় তখনো Genocide শব্দটার উৎপত্তি হয় নি আর পাকিস্তান যখন গণহত্যা চালায় পৃথিবী তখন ভয়াবহতম দুটো গণহত্যার স্বাক্ষী। মোটামুটি ৫৫ বছর ব্যাবধানে সংঘটিত দুটো গণহত্যা এক হয়ে যাচ্ছে আজ এই দুই দেশের আদর্শিক মিলের কারণে। দুই দেশই অস্বীকার করে চলেছে তাদের নির্বিচারে চালানো গণহত্যাকে, গণধর্ষণকে।

তুরস্কে তখন, মানে ১৯১৫ সালের দিকে আর্মেনিয়ানদের সংখ্যা ছিল ২০ লাখ; আর ১৯২২ সালের দিকে যখন গণহত্যা শেষ হয় তখন পুরো অটোম্যান সাম্রাজ্যে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৮ হাজারে। ১৯১৫ সালের ২৪ এপ্রিল ২৫০ জন বুদ্ধিজীবিকে গ্রেফতার এবং পরবর্তীতে তাদের হত্যার মাধ্যমে যে গণহত্যা শুরু হয়েছিলো সেটাতে আনুমানিক ১৫ লাখ আর্মেনিয়ান প্রাণ হারান। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই পরিচালিত সে গণহত্যায় তুরস্ক দেখিয়েছিলো নির্মমতার নতুন নতুন পদ্ধতি, পরবর্তীতে যা উৎসাহ জুগিয়েছিলো আরেক নরখাদক হিটলারকে। হিটলার যখন পোল্যান্ড আক্রমনের পরিকল্পনা করছিলো, তখন তার সামনে আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ তুললে সে বলেছিলো, “Who ever heard of the extermination of the Armenians?”

পাকিস্তানিদের সঙ্গে বেশ একটা মিল ছিলো তুর্কিদের। পাকিস্তানি ও জামায়াত নেতাদের মতো অটোম্যানের ধর্মীয় নেতারাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সকল খ্রিস্টানকে(নিজেদের পক্ষের শক্তি ব্যাথিত) ইসলামের শত্রু আখ্যা দিয়ে ‘জিহাদ’ এর ডাক দিয়েছিলেন। এবং অবশ্যই যেহেতু আর্মেনিয়ানরাও খ্রিস্টান সেহেতু তাদের বিরুদ্ধেও সে জিহাদ চলবে! এই উদ্দেশ্যেই ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে হাজারখানেক সন্ত্রাসীকে জেল থেকে বের করে অটোম্যান সাম্রাজ্য নতুন এক Special Organization গঠন করে, পরবর্তীতে যাদের ডাকা হত “butchers of the human specie” নামে। আর্মেনিয়ানদের তাড়িয়ে দেয়া হলো সিরিয়ার মরুভূমির দিকে। ঐতিহাসিকদের মতে, আর্মেনিয়ানদের বিশাল একটা সংখ্যা সে মরুভূমিতেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণাতেই প্রাণ হারান।

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-2 aaj24.com
ছবিটি ১৯১৫ সালের আর্মেনিয়ান গণহত্যাকালীন। ক্ষুধার্ত আর্মেনিয়ান শিশুদের সঙ্গে এক টুকরো রুটি দেখিয়ে পরিহাসে মেতে ওঠা এক তুর্কি অফিসার।[কৃতজ্ঞতায়: রাজেশ পাল]
তুর্কিরা ম্যাসাকার চালানোর জন্যে প্রধানত যে সকল পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছিলো সেগুলো—
১) পুড়িয়ে মারা। Eitan Belkind নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছিলেন তিনি নিজেই ৫০০০ আর্মেনিয়ানদের পুড়িয়ে মারতে দেখেছিলেন। “The shortest method for disposing of the women and children concentrated in the various camps was to burn them.”

২) ডুবিয়ে মারা। মহিলা ও বাচ্চাদের নৌকায় তুলে দেয়া হতো এবং মধ্যসাগরে ডুবিয়ে দেয়া হতো সে নৌকা। একজন প্রত্যক্ষদর্শী লিখেছিলেন, “I saw thousands of innocent women and children placed on boats which were capsized in the Black Sea”। বলা হয়ে থাকে যে, শুধুমাত্র Trabzon প্রদেশেই ৫০ হাজার আর্মেনিয়ানকে ডুবিয়ে মারা হয়েছিলো।

৩) বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক দ্রব্যের মাধ্যমেও মারা হতো। উইকিপিডিয়ার তথ্যসূত্রে, এমন তিনটি পদ্ধতির কথা জানা যায়— Morphine overdose, Toxic gas এবং Typhoid inoculation. নারীদেরকে বিখ্যাত অটোম্যান হেরেমেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-1 aaj24.com

আর্মেনিয়ানদের সে অন্ধকার দিনগুলো একসময় শেষ হয়েছে; কিন্তু তুর্কিরা কখনো স্বীকার করেনি তাদের জঘন্য অপকর্মের কথা। The Armenians were an enemy force, they argue, and their slaughter was a necessary war measure— এই যুক্তিকে ঘিরেই তারা আবর্তিত হচ্ছে গত একশো বছর যাবত। বলা হয়ে থাকে যে, “Genocide deniers are three times more likely to commit genocide again than other governments.” এই অস্বীকারের ফল পৃথিবী পেয়েছিলো হিটলারের মাধ্যমে মাত্র কয়বছরের মধ্যেই। গতবছর, ২০১৫ সালে আর্মেনিয়ানদের গণহত্যার শতবছরে তুরস্ক সরকারের প্রতি EU আবেদন জানিয়েছিলো যেন ‘গণহত্যা’টাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু এর জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, “In one ear and out from the other!”

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-6 aaj24.com

এবার আসি পাকিস্তানিদের দিকে, তাহলে বোঝা যাবে কেন পাকিস্তান ও তুরস্কের এতোটা আদর্শগত সদ্ভাব। পাকিস্তানিরা গণহত্যা চালিয়েছিলো ১৯৭১ সালে, মাত্র ৪৫ বছর আগে। তাদের হাতে শহীদ হওয়া বাঙালিদের প্রথম প্রজন্ম এখনো জীবিত, তাদের হাতে নির্যাতিতরা এখনো জীবিত, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধারা এখনো জীবিত, বীরাঙ্গনারা এখনো জীবিত তবুও পাকিস্তান স্বীকার করছে না তাদের নৃসংশতম পাপকর্ম। এই ২০১৫ সালে এসেও পাকিস্তানিরা অস্বীকার করছে গণহত্যার কথা, বলছে ভিত্তিহীন এসব অভিযোগ। ৩০ নভেম্বর পাকিস্তানি পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গণহত্যার কথা অস্বীকার করে বলা হয়, “baseless and unfounded assertions of Bangladesh against Pakistan.”

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-4 aaj24.com

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নাকি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এই অভিযোগ করে বাংলাদেশের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে সে বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, “It is regrettable that attempts have been made by the Government of Bangladesh to malign Pakistan, despite our ardent desire to develop brotherly relations with Bangladesh. Pakistan believes that the peoples of both countries not only want to maintain but also further strengthen the bonds of friendship and brotherhood. However, sadly, the Government of Bangladesh does not seem to respect these sentiments.”

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-3 aaj24.com

Denying Genocide— এই জায়গাতেই এক হয়ে যাচ্ছে এই দুটো রাষ্ট্র। বর্তমানে পাকিস্তান ছাড়া আর সবাই স্বীকার করে যে ১৯৭১ এ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। অতএব, ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’— কথার আক্ষরিক অর্থকে প্রমাণ করেই তুরস্ক তাদের নৈতিক দায়িত্ব বিবেচনা করে এগিয়ে এসেছে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ‘তুরস্ক’ নামক রাষ্ট্রের কোনো সংযোগ আছে কি না জানা নেই, তবুও তাদের গণহত্যা অস্বীকারের নৈতিক ভিত্তি হতেই পাশে দাঁড়িয়েছে নিজামী, মুজাহিদদের মতো দালালদের। নিজেদের হাত এখনো আর্মেনিয়ানদের রক্তে রঞ্জিত রেখে বাংলাদেশকে ‘ফাঁসি’ দেয়ার ব্যাপারে মানবতা শেখাতে আসাটাই তাদের ধূর্ততার সর্বোচ্চ পরিচয় বহন করে।

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-7 aaj24.com

অবশ্য, আমি তুরস্ককে কতোটা দোষ দেব? নিজামীকে যখন এদেশের মানুষরাই সাংসদ নির্বাচিত করে, মন্ত্রী বানায় কিংবা নিজামীর গায়েবানা জানাযায় যখন এদেশেরই মানুষের ঢল দেখি, এদেশের শিক্ষিত মানুষদের যখন দেখি নিজামী, মুজাহিদদের পক্ষে বুলি আওড়াতে, তখন ‘তুরস্ক’ নামক ভিনদেশটাকে কতোটা দোষ দিতে পারি? আমাদের দেশের পিএইচডিধারী শিক্ষিতদের যখন দেখি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তখন আমি তুরস্ককে দোষ দিয়ে কি করবো?

তুরস্ক Turkey Armenian Genocide আর্মেনিয়ান গণহত্যা 160516-5 aaj24.com

“আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে.. ”

তথ্যসূত্র—
১) উইকিপিডিয়া
২) armenian-genocide –www.history.com
৩) 8 things to know about the mass killings of Armenians 100 years ago –CNN
৪) বিভিন্ন ওয়েবসাইট

(aaj24.com)/আজ/এসএ/এমকে/৩০৪

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan

[‘আজ’ এর সব কনটেন্ট কোনো ধরনের বিকৃতি ছাড়া ইতিবাচক ও সামাজিক কাজে ব্যবহার করা যাবে। এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকুন।]


%d bloggers like this: