ঢাকা, সোমবার , ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, | ৩ পৌষ ১৪২৫ | ৯ রবিউস-সানি ১৪৪০

ফসিলস এর রূপমের স্মৃতিচারণে ‘গিটার গড’ আইয়ুব বাচ্চু

আইয়ুব বাচ্চু
  • আনন্দবাজারে আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রক ব্যান্ড ‘ফসিলস’ এর রূপম ইসলাম। যার কাছে আইয়ুব বাচ্চু মানে গিটার গড। যার কাছে আইয়ুব বাচ্চু মানে বাংলা রকের সীশানা ভেঙ্গে দেওয়ার স্বাপ্নিক অনুপ্রেরণা। তার মতে, হার্ড রক ঘরানার হওয়া সত্ত্বেও আইয়ুব বাচ্চুর গানে মিশে ছিল বাংলাদেশের ট্রাডিশনাল মেলোডি। আর তাঁর গিটারে ছিল সব সীমানা ভেঙে দেওয়ার আহ্বান। যিনি স্বপ্ন দেখতেন, এ পার-ও পার ছাড়িয়ে বাংলা গান সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে।

 যেখানে বসে এই লেখাটা লিখছি, আমার বাড়ির ঠিক সেই জায়গাটিতেই মাত্র ন’মাস আগে বসেছিলেন ভদ্রলোক। হাতে আমারই একটি অ্যাক্যুস্টিক গিটার। আজকের এই ফেসবুক লাইভের যুগে যখন-তখন ক্যামেরা চালু হয়ে যায়। সে দিনও হয়েছিল। ওঁর পরামর্শেই আমার নতুন প্রকাশিত একটি গান ‘চাঁদনিতে উন্মাদ একজন’ গাইতে শুরু করলাম। উনি বাজাচ্ছেন। গিটারের তারে আঙুলের অনায়াস মোচড়ে উঠে আসছে নতুন নতুন না-বলা গল্পেরা। আমি গাইছি আর অবাক চোখে তাকিয়ে সে সব গল্প দেখছি, শুনছি।

‘চাঁদনিতে উন্মাদ একজন’ গানটার সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে ইম্প্রম্পটু গিটার বাজাচ্ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। আমার স্বচক্ষে দেখা কতিপয় ‘গিটার গড’দের মধ্যে এক জন। আমি ওঁর মনোযোগ দেওয়াটাকে শুষে নিতে চাইছিলাম সঙ্গীতের বাধ্য ছাত্র হিসেবেই। এক সময়ে এই লাইনগুলো এল, ‘আমার ইচ্ছের ব্যাপ্তিগুলো বিশাল/ কর্মক্ষমতা সীমিত’…

বাচ্চুভাই আমার দিকে তাকালেন। পরের লাইনগুলোয় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমি গাইলাম, ‘এই দ্বন্দ্বতে খুন হতে পারি/ আর থাকতেও পারি জীবিত।’ এই দুটো লাইনের মাঝখানে বাচ্চুভাইয়ের মুখে হাসি, জোরালো ‘ও হো!’ উচ্চারণ, এবং গানটার মধ্যে আরও বেশি করে ঢুকে পড়া। ‘এই দ্বন্দ্বতে খুন হতে পারি/ আর থাকতেও পারি জীবিত’— এই দুটো লাইনের মাঝখানে আইয়ুব বাচ্চুর অভিব্যক্তিটা তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণেই যে মানুষটা আর জীবিত নেই। সে দিনের সেই ফেসবুক লাইভটা দেখতে দেখতে কাঁদব কী, বেশ কয়েকবার জোরে হেসে উঠতে হল। পারফর্মারের সহজাত অভ্যেসে এবং কায়দায় বাচ্চুভাই সেই মুহূর্তগুলো তৈরি করছিলেন, যেগুলোর জেরে মানুষ তারিফ করে, হেসে ওঠে। একটা গিটার লিড শেষ করে ড্রামার রুমেলের সঙ্গে চোখাচোখি করে ‘অ্যা’ বলে সজোরে ইতিবাচক রসিকতাময় কোরাস ধ্বনি অথবা ‘সেই তুমি’-র একটা অংশে ফেসবুকের দর্শকদের বলা যে ‘‘আমরা চুপ, তোমরা গাও,’’ বা ‘‘দর্শকদের গলা তো আমরা শুনতে পাচ্ছি, তাই না রূপম?’’ এই সব অংশের হাসি আমায় খানিকটা সহজ করে তোলে।

কিন্তু শেষটা বড় কষ্টের। লাইভের শেষ অংশে বাচ্চুভাই বলছেন, ‘‘রূপমের সঙ্গে একসঙ্গে গানবাজনা এই প্রথম নয় এবং (বারবার, জোর দিয়ে) এই শেষও নয়। আবার হয়তো সারারাত ধরে বসবে আমাদের আড্ডা আর গানের আসর।’’— এই অংশটা দেখার পরে চোখ আর শুকনো থাকে?

আইয়ুব বাচ্চুর গান আমি প্রথম শুনি ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে। সে বছরই তাঁর ব্যান্ড এলআরবি (এলআরবি মানে প্রথমে ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, পরে পাল্টে হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’) বাংলাদেশের প্রথম আনপ্লাগড লাইভ অ্যালবাম প্রকাশ করেছিল। অ্যালবামের নাম ‘ফেরারী মন’। এলআরবি মূলত একটি হার্ড রক ব্যান্ড। ‘ফেরারী মন’ অ্যালবামে যে গানগুলো গাওয়া হয়েছিল, সেগুলোর প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল আগেই, ইলেকট্রিক রক অ্যারেঞ্জমেন্টে। মজার কথা, আমি কিন্তু সেই ভার্শনগুলো আগে শুনিনি, অর্থাৎ অরিজিনালগুলো। আমার কানে এসে পৌঁছল অ্যাক্যুস্টিক গিটার-ড্রামস-বেস এবং অতিথি শিল্পী সুনীল দে-র বেহালার মূর্ছনায় মাখা আইয়ুব বাচ্চুর ভরাট, গম্ভীর গলার বেদনাবহ রোম্যান্স। দারুণ লাগল ‘ফেরারী এ মনটা আমার’ অথবা ‘এখন অনেক রাত/ খোলা আকাশের নীচে/ জীবনের অনেক আয়োজন/ আমায় ডেকেছে/ তাই আমি বসে আছি/ দরজার ওপাশে’। অ্যালবামটিতে ইতিমধ্যেই এলআরবি-র আইকনিক হয়ে যাওয়া দুটি গান ‘সেই তুমি’ এবং ‘রুপালী গিটার’-ও ছিল। ক্যাসেট ইনলেতে ‘সেই তুমি’ গানটির আসল নামটি লেখা— ‘চলো বদলে যাই’। যুগের প্রবাহে, তারুণ্যের উৎসাহে সেই সময়কালে আমি ধুমধাড়াক্কা অর্থাৎ বেশি গতিশীল, বেশি ধাক্কা-দেওয়া তীব্র যন্ত্রানুষঙ্গে আকৃষ্ট হতাম, স্বাভাবিকভাবেই। হার্ড রক ব্যান্ড হিসেবে পরিচিত এবং বিখ্যাত এলআরবি কিন্তু আবার আমায় মাধুর্যে ফেরত নিয়ে গেল। ফেরত নিয়ে গেল বাংলাদেশি সঙ্গীতের মেলোডিয়াস ঐতিহ্যে।

ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে বাংলাদেশের আধুনিক গান শুনি। সে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী বসির আহমেদ ছিলেন আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর বহু জনপ্রিয় গান শুনেছি। যেমন ‘পিঞ্জর খুলে দিয়েছি/ যা কিছু কথা ছিল বলে দিয়েছি/ যা রে যাবি যদি যা’ অথবা ‘সজনী গো/ ভালবেসে এত জ্বালা/ কেন বলো না’। সঙ্গীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলির গানও শুনেছি। রুণা লায়লা, কুমার বিশ্বজিৎ তো বটেই। একটা সুরের ধারা, একটা কথার পরিচিত আবেগী প্যাটার্ন লক্ষ করতাম। এলআরবি হার্ড রক ব্যান্ড হওয়া সত্ত্বেও ওই পরিচিত নির্ভরতার সন্ধান দিতে পারছিল তাদের সুর সংযোজনায়। আইয়ুব বাচ্চুর গায়কি শুনে বুঝলাম, তিনিই প্রধান পুরোহিত। তাঁর গিটারবাদন তখনও আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি।

এলআরবি বা আইয়ুব বাচ্চুর সব ক’টি অ্যালবাম বা প্রকাশিত সিঙ্গল নিয়ে আলোচনা আমি করছি না, সে যোগ্যতাও আমার নেই। তবে এঁরা কতটা এক্সপেরিমেন্টাল ছিলেন তার প্রমাণ যেমন ওই ‘ফেরারী মন’ অ্যালবামে পেয়েছিলাম, হার্ড রক ব্যান্ড হয়েও বাংলাদেশি ট্র্যাডিশনাল মেলোডি আবহের প্রতি সুবিচার এবং বেহালা যন্ত্রটিকে ব্যান্ডের গানে ব্যবহার, ঠিক তেমনই ধাক্কা দিয়েছিল তাঁদের ডাবল অ্যালবাম ‘আমাদের বিস্ময়’। দুটি ক্যাসেট— একটির নাম ‘আমাদের’ অপরটির নাম ‘বিস্ময়’। ভিন্ন এবং প্রগতিশীল দর্শন ছিল গানগুলোর মধ্যে। দুটি গান মনে করতে পারি, ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’ এবং ‘প্রজাপতি’। প্রথমটিতে বলা হচ্ছে মানুষের শেষ ঠিকানা আর কিছুই নয়— সাড়ে তিন হাত মাটি, অন্য গানটির উচ্ছলতায় যেন প্রজাপতির পাখা ঝাপটানোর ছন্দ। যন্ত্রানুষঙ্গে এ বারে পেয়েছি হার্ড রকের ঝাঁঝ, গিটারবাদনে বেড়া ভেঙে দেওয়ার আবাহন।

আইয়ুব বাচ্চু নিজে আমাকে একটি অ্যালবাম উপহার দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত সাক্ষাতের প্রথম ধাপের কোনও এক সময়। এই অ্যালবাম আরও গতিশীল, আরও ছন্দময় এবং এনার্জেটিক, নাম— ‘মন চাইলে মন পাবে’। আমাদের এখানে বাংলা গান হল প্রাদেশিক সঙ্গীত, ওঁদের ওখানে জাতীয়। ফলে অনেক বহুজাতিক সংস্থা ওখানে বাংলা গানের সঙ্গে জড়িত থাকেন, এখানে না। যেমন ‘মন চাইলে মন পাবে’ অ্যালবামের নিবেদক ছিল পেপসি। আমি বাংলাদেশে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে মনিহারি দোকানগুলোতে পেপসি হাতে আইয়ুব বাচ্চুর ছবি দেখেছি, যা আমাদের এখানে শাহরুখ-রণবীরে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীকালে নেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে বাচ্চুভাই আমাকে এই কথাটাই বলেছিলেন বাংলা গানকে আন্তর্জাতিক করে তোলার প্রসঙ্গে। তাঁর ভাষায়, ‘‘ওই স্বপ্নটাই দেখছি, টার্গেট শুধু এপার বাংলা বা ওপার বাংলা নয়। আমি স্বপ্ন দেখি গ্লোবালি। একটা বড় পুকুরে ঝাঁপ দিতে চাই, ছোট পুকুরে অনেক দাপাদাপি হয়েছে।’’

সে ঝাঁপ দিতে পেরেছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে ইগলস, ট্র্যাফিক, ক্যুইন, এরিক ক্ল্যাপটন, বব মার্লে, স্যান্টানা, রিচি ব্ল্যাকমোর প্রমুখ শিল্পীদের ইংরেজি গান কভার করা দিয়েই ওঁর শুরু। প্রথম দিকে ওঁর ব্যান্ডের নাম ছিল ‘ফিলিংস’, ওঁরা ছেড়ে চলে আসার পরে যেখানে যোগ দেন আর এক তারকা জেমস। পরে ১৯৯১ সালে তৈরি করেন ‘এলআরবি’, ইংরেজি কভার সং-এর জায়গায় এ বার প্রাধান্য পেতে শুরু করে মৌলিক বাংলা গান। বাংলাদেশের ওই প্রজন্মের সমস্ত রকস্টারদেরই গুরু একজন— আজম খান। বিটলস-ভক্ত আজম ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘হাইকোর্টের মাঝারে’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’, এই সমস্ত মেগা জনপ্রিয় গান একের পর এক প্রকাশ করে আইয়ুব বাচ্চুদের পাশ্চাত্য-ঘেঁষা প্রজন্মের বাংলা প্রাপ্তির বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। সেটাই ছিল বাংলা রকের সূচনাকাল। আইয়ুব বাচ্চুর শুরু ১৯৭৬-এর শেষ দিকে, যদিও তাঁর বাংলা গানে আসতে একটু সময় লেগেছে। তবে গিটারের তো কোনও ভাষা হয় না। কাজেই আইয়ুব বাচ্চু ভাষা বদলেছেন, এটা তেমন জোরগলায় বলা যাবে না। পিঠোপিঠি সময়েই পশ্চিমবঙ্গেও বিটলস-এর গানবাজনা কিছু তরুণ সঙ্গীতশিল্পীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অবশ্য গিটার বাজিয়ে বাংলা গান বাঁধা শুরু ১৯৫৬ সালে অরুণেন্দু দাসের হাতে। দশ বছরের মধ্যেই তিনি প্রবাসী হন ইংল্যান্ডে। সেখানে নিয়মিত মূলত অনুবাদ গান তৈরি করতে থাকেন। খবর এসে পৌঁছয় এই বাংলার গৌতম চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জনপ্রসাদ প্রমুখের কাছে। এঁরাও পরীক্ষামূলক বাংলা গান তৈরি করা শুরু করেন। ভাল ভাল কাজ হয়েছিল, কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক বাজারে তার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলা রক প্রতিষ্ঠা করবার জন্য আরও খানিকটা সময়ের প্রয়োজন ছিল।

কলকাতার কোনও এক কনসার্টে বাজিয়ে আইয়ুব বাচ্চু ফিরে এসেছেন গোলপার্কের কাছে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করা গেস্ট হাউসটিতে। ভেতরে ঢুকবেন-ঢুকবেন করছেন, ফুটপাতের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছল কাঁধে কিটব্যাগ ঝোলানো এক যুবক। যুবকটি বাংলাদেশের গানবাজনা নিয়ে একটি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখে, নিজেও গান তৈরি করে। দু’চারটে কথাবার্তার পরেই বাচ্চু আবিষ্কার করেন যুবকটির মধ্যে সম্ভাবনাকে। তিনি তাকে ভেতরে নিয়ে যান। একটি বড় ডর্মিটরিতে এলআরবি-র সবাই একসঙ্গে ছিলেন। রাতের রুটি-মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। বাচ্চু খাওয়া শুরু করলেন। যুবকটির হাতে তুলে দিলেন একটা অ্যাক্যুস্টিক গিটার। বললেন, ‘গান গা।’ সেই যুবকটি— আমি।

আমার প্রথম অ্যালবাম ১৯৯৮ সালের পুজোয়, নাম ‘তোর ভরসাতে’। কাঁটাতার পেরিয়ে, পাইরেসি-বাহিত হয়ে এ গান পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশে। অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। এতটাই, যে একটি টেলি-নাটকের প্রযোজকের বিশেষ আবদার ছিল যে ‘নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয়’ গানটিকে ওই নাটকে রাখতেই হবে। পরিচালক রিঙ্গো বাংলাদেশ থেকে আমার গানের প্রকাশককে চিঠি দিয়েও জবাব পাননি। ফলে গানের শুটিংয়ে আমাকে তাঁরা পেলেন না। অন্য এক জনকে মডেল করে প্রতিবেশী দেশে তৈরি হয়ে গেল আমার তৈরি করা একটি গানের মিউজিক ভিডিয়ো। এ সব আমি জানতেও পারিনি তখন। পরে রিঙ্গো কলকাতায় চলে আসে। ওঁর মুখেই আমি এ খবর পাই। টেলি-নাটকটিও দেখি। ওই নাটকে আইয়ুব বাচ্চুরও একটা মিউজিক ভিডিয়ো ছিল। রিঙ্গো আমায় জানায়, বাচ্চুভাই আমার গানের ভিডিয়োটি নিয়ে ভয়ানক উত্তেজিত ছিলেন।

আমরা যখন ‘ফসিলস’ গঠন করি, তখন নিজের চোখেই দেখেছি, বাচ্চুভাইয়ের চোখেমুখে ঠিকরে বেরোচ্ছে উত্তেজনা। তিনি প্যাশনেট লোক ছিলেন, অ্যাগ্রেসিভও ছিলেন, নইলে কি কেউ আর চট্টগ্রামের হোটেলে কভার প্লেয়িং থেকে লন্ডনের অ্যালেন গার্ডেনের আশি হাজার দর্শকের সামনে বা শারজা স্টেডিয়ামে তিন মিলিয়ন মানুষের সামনে মৌলিক বাংলা গান শোনানোর সাহস দেখাতে পারেন? আমার গানের ক্রুদ্ধ প্যাশন, জোরালো এবং খ্যাপা পরিবেশন তাঁর মনে ধরেছিল। উত্তেজিত হয়ে নিজের ভঙ্গিতে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘‘তোদের ধরনটাই পারবে কলকাতায় রক মিউজিক আনতে। তোরা ঠিক যেমন ভাবে করছিস তেমনই করে যা। আজ যা নাই, কাল তা আসবে।’’ ওঁর ভাষায়: ‘আজ যা ভাবছিস খেলা, কাল তাই-ই হবে মেলা!’

ফসিলস-এর নামডাক হল। সে বার একটা অনুষ্ঠানে আমরা আগে বাজাচ্ছি, পরে আসবে এলআরবি। আমরা তখন বাজাচ্ছি ‘বাইসাইকেল চোর’, ও মা! সটান আমাদের মঞ্চে চলে এলেন চরম উত্তেজিত আইয়ুব বাচ্চু। ‘‘আমায় একটা গিটার দে তো!’’ বলে গিটার চড়ালেন কাঁধে, তত ক্ষণে আমাদের স্টেজে উঠে এসেছেন এলআরবি-র অন্যান্যরাও। আমাদের ‘হাসনুহানা’, ‘অ্যাসিড’, ওঁদের ‘সেই তুমি’, ‘মন চাইলে মন পাবে’ একযোগে পরিবেশিত হল নজরুল মঞ্চের সেই সন্ধ্যায়। দুই বাংলার রক আন্দোলনের ইতিহাসে এমন স্বতঃস্ফূর্ত আদানপ্রদান আর কখনও লাইভ অনুষ্ঠানে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।

সে দিন অনুষ্ঠান শেষে আইয়ুব বাচ্চু বললেন, ‘‘দেখেছিস তো, আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম, বাংলা রক চলে এসেছে। বাংলা রক ইজ় হ্যাপেনিং রাইট নাও!’’ এর পর থেকে যখনই দেখা হয়েছে, তাঁর চোখেমুখে এই বাংলার রক গানের জন্য, আমার জন্য— গর্ব দেখেছি। এই সে দিনও যখন আমার হাত থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার নিলেন, তখনও গর্ব করেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘‘গিভ মি মাই গিটার। এখন আমি বাজাব, রূপম গাইবে।’’ তাঁর প্রতিটি দৃষ্টিনিক্ষেপে আমি পড়তে পারছিলাম ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে দেওয়ার অপার তৃপ্তি।

সবই তো ঠিক ছিল! গোলমাল পাকাল শুধু আমার বাড়ির ফেসবুক লাইভে বলা তাঁর শেষ কথাগুলো। ‘‘এটাই শেষ নয়। আবার আমি আসব। সারা রাত ধরে এক দিন আড্ডা চলবে, গানও।’’ সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এ বারে বাচ্চুভাই ‘ল অব অ্যাভারেজ’-এরই শিকার হলেন। শেষ প্রেডিকশনটা সত্যি হবার অপেক্ষা না করেই প্রজাপতির মতো ধাবমান দ্রুততায় হঠাৎই অন্তর্হিত হলেন ‘গিটার গড’ আইয়ুব বাচ্চু। মাত্র ছাপ্পান্ন বছর বয়স। চেহারায় আগের থেকে অনেক ফিট। হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর আগের রাতেও রংপুরে অনুষ্ঠান করেছেন দাপটে! কী যে হল!


%d bloggers like this: