ঢাকা, শনিবার , ২০ অক্টোবর ২০১৮, | ৫ কার্তিক ১৪২৫ | ১০ সফর ১৪৪০

মসলার বাজারে দামের ‘পাগলা ঘোড়া’

আমাদের দেশটিতে প্রায় সব কিছু যেন উল্টাে নিয়মে চলে। অন্যসব জায়গায় উৎসবে পার্বণে জিনিসের দাম কমে। আর বাংলাদেশে তার বিপরীত। এখানে প্রতিবছর কোরবানির ঈদের আগে বেড়ে যায় মসলার দাম। চিরাচরিত এই নিয়মে এবারও কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। বাজারে এক শ্রেণির মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীরা বাড়তি টাকা আয় করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তারা সিন্ডিকেট করে মসলার বাজারে লেলিয়ে দিয়েছেন পাগলা ঘোড়া। এদিকে এই ‘পাগলা ঘোড়া’ বাগে আনতে মাঠে নামছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বিশেষ বাজার মনিটরিং সেল।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বাজারে সব ধরনের মসলাই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে মসলার দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করায় চাপ পড়ছে ভোক্তার কাঁধে। আমদানির ওপর নির্ভরশীল বেশির ভাগ মসলা পাইকারি ও খুচরায় দামের ব্যবধান অনেক বেশি। কুরবানির ঈদে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, দারুচিনি, এলাচ, জিরা, লবঙ্গ, তেজপাতা ও গোলমরিচের চাহিদা বেশি থাকে। ফলে এ সময়টাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু মসলা আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, আদা ১০-২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়, গত সপ্তাহে ৪৮ টাকা বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের দাম বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা, রসুন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা থেকে ১১০ টাকায়। অথচ গত সপ্তাহে এটি বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। প্রতিকেজি এলাচ বিক্রি করতে দেখা যায় ১ হাজার ৮৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি এলাচ ১ হাজার ৫৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দারুচিনি বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা কেজি দরে যা আগে বিক্রি হয়েছে ২১০ টাকায়। জিরা টার্কি ৪১০ ও ইন্ডিয়ান জিরা ৩১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। এর আগে টার্কি জিরা বিক্রি হয়েছে ৩৫০ টাকায়, ইন্ডিয়ান জিরা বিক্রি হয়েছে ২৮০ টাকায়।

অন্যদিকে কারওয়ান বাজার পাইকারি বাজারে বার্মিজ আদা ৪৫-৫০, ছোট এলাচের কেজি ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা, বড় এলাচ ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। কালো গোলমরিচ পাইকারিতে ৫৮০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা, প্রতি কেজি দারুচিনি পাইকারিতে ২৫০-২৭০ টাকা, তেজপাতা পাইকারিতে ৯০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, আলুবোখারা ৫২০ টাকা; লবঙ্গ ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা এবং কাজু বাদাম ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিশমিশ ৩৫০, জিরা ৩০০ থেকে ৩৫০০ টাকা ও ধনিয়া ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। পাইকারি দাম বাড়ার ফলে এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও।

কারওয়ান বাজারের উপহার স্টোরের বিক্রেতা চুন্নু মিয়া বলেন, মসলার বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। আমদানি কম হলে বাজারে সরবরাহ কম থাকে। এতে কিছুটা দাম বেড়ে যায়। তবে কোরবানির ঈদ এলেই মসলা আমদানিকারকরা সিন্ডিকেট করে এর দাম বাড়িয়ে দেয়। তারা দাম বাড়ালে আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের বাড়তি দামে কিনতে হয়- যার প্রভাব খুচরা বাজারেও এসে পড়ে।

মহাখালী কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা সাকিব আহমেদ বলেন, কোরবানির ঈদ আসার আগেই ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ সব ধরনের মসলার দাম বাড়িয়ে দেয়। এসব পণ্য কিনতে এসে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ঈদের এক বা দুই সপ্তাহ আগে বাজার বিশেষভাবে মনিটরিংয়ের কিছু নাই। কারণ ব্যবসায়ীরা যে পণ্যে অতি মুনাফা করবে, তা এক মাস আগ থেকেই বাড়িয়ে দেয়। আর ঈদের আগে তোড়জোড় করে মনিটরিংয়ের ফলে দাম কমে। কিন্তু দেখা যায়, দাম কমানোর আগে ব্যবসায়ীরা যে টাকা মুনাফা করা দরকার সেটা করে নেয়। তাই সরকারের নিয়মিত খুচরা বাজার মনিটরিং করলে সাধারণ ক্রেতাদের এত বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না।

এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, অন্য বছরের মতো এবার যাতে কোনোভাবেই পণ্যের দাম না বাড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে। তাই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে কোরবানির ঈদ ঘিরে বিশেষভাবে মনিটরিং সেল নামানো হবে- যাতে অসাধুভাবে কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়াতে না পারেন।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, কোরবানির ঈদ আসার আগেই মসলাসহ সব ধরনের খাদ্য পণ্যের বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। তবে এবার দেশে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। তবুও বাড়ছে। তবে ব্যবসায়ীরা বাজারে আনতে যেন চাঁদাবাজির শিকার না হন, সেদিকে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে- রাখতে হবে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা।


%d bloggers like this: