ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৫ মুহাররম ১৪৪০

মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্যে ভেজাল

ট্যানারি কারখানায় চামড়া প্রসেসিংয়ে যেসব রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যে ক্রোমিয়াম উল্লেখযোগ্য। এটি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। এই ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন রাসায়নিক-মিশ্রিত ট্যানারির বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বিনষ্ট করে ফেলার কথা; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক খবর হচ্ছে, সেই ক্রোমিয়ামসহ কয়েক প্রকার ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোলট্রিফিড তৈরি হচ্ছে। এটা যেমন হাঁস-মুরগির খামারে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি তা মাছের খামারেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পোলট্রি ও মাছের খামারে রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার ব্যবহারের ফলে তা মাছ-গোশতের মাধ্যমে সহজেই মানবদেহে চলে যায়। এতে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিশেষ করে কিডনি, লিভার, ফুসফুস, প্যানক্রিয়াস প্রভৃতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানুষ অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ট্যানারির বর্জ্য নষ্ট না করে অর্থের বিনিময়ে পোলট্রি ও মাছের খামারিদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। এতে যে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতির কারণ ঘটছে সে দিকে কারো খেয়াল নেই। ফলে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাঙালির প্রিয় খাদ্যতালিকায় মাছের স্থান সবার ওপরে। মুরগি ও হাঁসের অবস্থানও খুব নিচের দিকে নয়; কিন্তু মাছ ও মুরগিপ্রিয় বাঙালির জন্য ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোলট্রিফিড ও মাছের খাবার প্রস্তুত করার এই খবর নিশ্চয়ই উদ্বেগজনক। একশ্রেণীর ট্যানারি ব্যবসায়ী ক্রোমিয়ামসহ নানা রাসায়নিক-মিশ্রিত ট্যানারি বর্জ্য পোলট্রি খামারি ও মৎস্য খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন অবৈধভাবে। তেমনি পোলট্রি মালিক ও মৎস্য খামারিরাও স্বল্পমূল্যে বিষাক্ত এসব বর্জ্য কিনে হাঁস-মুরগি ও মাছকে খাওয়াচ্ছেন। এর ফলে যে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে কিংবা ট্যানারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক ক্রোমিয়াম মানবদেহের সর্বনাম করে ছাড়ছে, সে দিকে নজর দেয় কে?
আমাদের খাদ্যদ্রব্য, চাল, ডাল, আটা, তেল ইত্যাদি মানসম্পন্ন কি না অথবা এগুলোতে কোনো রাসায়নিক মিশিয়ে তা মানহীন বা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হওয়ার কারণ সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখভালের জন্য একটি সরকারি বিভাগ রয়েছে; কিন্তু এ বিভাগের তেমন কোনো কর্মতৎপরতা চোখেই পড়ে না। মাঝে মধ্যে র‌্যাব ও খাদ্য বিভাগের লোকজন অভিযান পরিচালনা করলেও তা অপ্রতুল।
অথচ আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করার জন্য এ বিভাগটিকে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করা দরকার। নিয়োগ দেয়া দরকার প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবলও। এ দিকে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা একদমই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সবখানেই ভেজালের দৌরাত্ম্য। ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছেন খাদ্য বাজারজাত করে জনগণের অর্থ লুটে নিয়ে রাতারাতি বড়লোক হচ্ছেন। খাদ্য মানসম্পন্ন এবং ঝুঁকিমুক্ত কি না সে দিকে তাদের নজর নেই।
বাংলাদেশে আজ খাদ্যে ভেজাল মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানেও অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাচ্ছে। এ দিকে প্রায় প্রতিটি খাদ্যসামগ্রীর বিষক্রিয়ার ফলে কিডনি ও লিভারের অসুখে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতা আসলে দেশবাসীর বিরুদ্ধে, খাদ্যে ভেজালদাতাদের পক্ষে যাচ্ছে। সরকারকে খাদ্যে ভেজালদাতার বিরুদ্ধে জনস্বাস্থ্যের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
খাদ্যে নকল ও ভেজাল বন্ধ করতে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠলে এ বিপদ থেকে সহজেই নিস্তার পাওয়া যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে নকল ও ভেজালের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্যে ভেজালকারীদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে কঠোর সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করে আমাদের এ জাতির আগামী প্রজন্ম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছে, তারা মেধাশূন্যতারও শিকার হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ভেজাল ও মানহীন খাদ্যপণ্য একটি জাতিকে পঙ্গু করতে করতে কোথায় নিয়ে যাবে, তা কেবল ভবিতব্যই বলতে পারে। তাই খাদ্যপণ্যের ভেজাল ও মানহীনতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাই।


%d bloggers like this: