ঢাকা, সোমবার , ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, | ৩ পৌষ ১৪২৫ | ৯ রবিউস-সানি ১৪৪০

মানসিকতা মিথ্যাচার, ডা. জাফরুল্লাহ ও একজন নষ্ট মানুষের গল্প

ডা. জাফরুল্লাহ

‘নুক্তা’ লাগিয়ে দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার মিথ্যাচার করার পরে অবশেষ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সাধারণ ডায়েরিটি (জিডি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই মামলা এখন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।
একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানের বিরুদ্ধে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার সেনা সদরের পক্ষ থেকে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় ওই জিডি করা হয়।
‘সময়’ টেলিভিশনে গত ৯ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। এসময় তিনি বলেন, ‘দেখেন, এটা ছোট দেশ, আমরা একে-অপরকে চিনি। তবে অনেকগুলো তাদের বিরুদ্ধে পার্শ্ব সারকুমেস্টেনশিয়াল এভিডেন্স যে, আর্জেস গ্রেনেড কোত্থেকে এসেছে? দেখেন, আর্জেস গ্রেনেড, আমি জানি না, সময়টি মিলে কিনা, আমাদের বর্তমান চিফ অব আর্মি আজিজ সাহেব চট্টগ্রামের কমান্ডার ছিলেন, জিওসি ছিলেন, কমান্ড্যান্ট ছিলেন। তার ওখান থেকে একটা ব্যাপক সংখ্যক সমরাস্ত্র, গোলাগুলি চুরি হয়েছিল, হারিয়ে গেছিল, বিক্রি হয়ে গেছিল এবং এজন্য একটা কোর্ট মার্শালও হয়েছিল আজিজের নামে, জেনারেল আজিজের নামে কোর্ট মার্শালও হয়েছিল। আজকে উনি…, কিন্তু উনার কেন এসেছে, উনি হলেন ওভার অল, উনি নিশ্চয়ই এখন তো ওখান থেকে এবং আমরা আরও দেখছি মিরপুরে সম্প্রতি কয়েক বাক্স পুকুরের মধ্যে পাওয়া গেছে, এ সবগুলি আমাদের ব্যর্থতা…’।
এটা নিয়ে আইএসপিআর কড়া প্রতিবাদ করলে পরেরদিন এক সংবাদ সম্মেলন করে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘সময় টেলিভিশনের বিশেষ অনুরোধে শারীরিক দুর্বলতা নিয়েই আমি ৯ অক্টোবর রাত ১০টায় তাদের একটি টক শোতে অংশ নিই। ওই টক শোতে অপর অতিথিরা ছিলেন সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ আলম লেলিন। আলোচনাকালে আমি দেশের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ সম্পর্কে অসাবধানতাবশত একটি ভুল তথ্য উল্লেখ করেছিলাম। জেনারেল আজিজ একজন দক্ষ আর্টিলারি সেনা কর্মকর্তা। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ‘জিওসি’ ছিলেন না, ‘কমান্ড্যান্ট’ও ছিলেন না। তিনি তাঁর কর্মজীবনের একসময়ে চট্টগ্রাম সেনাছাউনিতে আর্টিলারি প্রশিক্ষক ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘কোর্ট মার্শাল’ হয়নি একবার ‘কোর্ট অব এনকোয়ারি’ হয়েছিল’।

আইএসপিআর আবারো ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, ‘বর্ণিত সময়ে চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা সেনানিবাসে কোনো সমরাস্ত্র বা গোলাবারুদ চুরি বা হারানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি’। এর ফলে এটা প্রমানিত হয় যে, কথার মার প্যাঁচে দক্ষ এই এনজিও ব্যবসায়ী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর আগের কথা থেকে সরে আসেন নি। তিনি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সুনাম ক্ষুন্ন করার এজেন্ডা নিয়ে এটা করেছেন তা বুঝতে বড় কোন ডিগ্রী থাকার দরকার হবে না। ‘নীল হেলমেট’ বা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে খুব সুনামের সাথে কাজ করছে বাংলাদেশের সেনা ও পুলিশ সদস্যগণ অনেকদিন ধরেই। তাঁদের সুনাম এতে বেশী যে সিয়েরেলিয়ন নামের একটা দেশ তাঁদের রাষ্ট্রীয় ভাষায় বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে করে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য কাজ করে দেশের সুনামের পাশাপাশি বিপুল আর্থিক ও আনুসাংগীক সুবিধা পাচ্ছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিতর্কিত হলে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি বাহিনীতে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে তা সবাই অনুমান করতে পারেন। এর মানে এই দাঁড়ায় যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জেনে বুঝেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করতে চেয়েছিলেন, অসুখের কথা তাঁর বাহান মাত্র।

শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিলেও আসলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অসুখটা মনে। তাই দুঃখ প্রকাশের সময়ও তাঁর মুখ দিয়ে মনের কথা বেরিয়ে এসেছে। সারা জীবন সুবিধাবাদী হিদেবে খ্যাত এই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অতীত কী তা জানতে গেলে দেখা যায় যে, তিনি ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণের পর তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে ডক্টর এ এইচ সাইদুর রহমানকে সভাপতি আর ডক্টর জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদপক করে ইউকে তে অবস্থান করা প্রায় ১০০০ এর ও বেশী ডক্টরদের নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন, ইউকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি চূড়ান্ত পর্ব শেষ না-করে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার নিমিত্তে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। এরপরে ডা. এম এ মবিনের সাথে মিলে সেখানে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। দেশ স্বাধীন হলে হাসপাতালটি প্রথমে ১৯৭২ সালে ইস্কাটনে স্থানান্তর করা হয় এবং ঐ সালেই (এপ্রিলে) রেজিস্ট্রেশন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সহায়তায় কিছু জমি নিয়ে সাভারে স্থানান্তরিত হয় এই হাসপাতাল।

তার পারিবারিক সুত্রে জানা যায় যে, বঙ্গবন্ধু সাভারে তাঁকে অনেক জমি বরাদ্দ দিলেও সব জমি রেজিস্ট্রেশন করে দিতে পারেন নি নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। তখন থেকেই অর্থলোভী, বহুগামী এই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে মনে সে বঙ্গবন্ধুর প্রতি নাখোস হয়ে পড়েন। ছোটকাল থেকেই লোভী, সুবাধাবাদী, মিস্টি মুখের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী লন্ডনে পড়াকালীন সময়ে ওখানে একটা বিয়ে করেন। সেই ঘরে একটা মেয়ে হয়। লন্ডনের স্ত্রীর মাধ্যমে তিনি তাঁর গণসাস্থ্যের জন্য অনেক টাকা সংগ্রহ করলেও পরে সেই লন্ডনী স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ঢাকার ধানমন্ডিতে এক ধনী পরিবারে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এর পর তাঁর চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে তিনি বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনী জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন। উদ্দেশ্য টাকা, আর বহুগামীতার বৈধতা। তাই তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, কানাডায় পলাতক তার চাচাতো ভাই মেজর নূর চৌধুরীকে ক্ষমা করে দিতে বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কণ্যার পালস দেখেন। বলা তো যায় না মাফ করলেও করতে পারেন, কারণ শেখ হাসিনার শরীরে তো বঙ্গবন্ধুরই রক্ত, তাই। আরেকটি কারণ হল শেখ হাসিনা অনেককেই তো মাফ করে দিয়ে সাথে নিয়ে কাজ করছেন এখন।

তথাকথিত অসুস্থ্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এই আচরন দেখে একটা গল্প মনে পড়ে গেলো। কোন এক গ্রামে জাফর নামে (কল্পিত নাম) একটা খুব দুষ্টু প্রকৃতির বুদ্ধিমান লোক ছিল। তার সাথে কথায় আর খারাপ কাজে কেউ পারতো না। হঠাৎ তার কঠিন অসুখ হল। কবিরাজ মহাশয় বললেন, এবার ছুটি। দুই এক দিনের মধ্যেই উনি মারা যাবেন। এ কথা শুনে জাফর তার ছেলেদের দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার জন্য গ্রামের সব লোককে তার কাছে আসার অনুরোধ জানালো। গ্রামের সব লোক এলে। জাফর সবার কাছে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চেয়ে বলল যে, ‘আমি সারা জীবন আপনাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। তাই আমার একটা শেষ অনুরোধ আপনাদের সবার কাছে। যদি পূরণের আশ্বাস দেন তো বলি’। গ্রামবাসী বললেন হ্যাঁ তাঁরা জাফরের শেষ ইচ্ছা পূরণ করবে যদি তা তাঁদের সাধ্যের মধ্যে হয়। এবার জাফর কেঁদে কেঁদে বললেন যে, ‘আপনারা যদিও সবাই ক্ষমা করেছেন, কিন্তু আমি আশে পাশের গ্রামের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে পারলাম না। তাই আমার মৃত্যুর পরে আমাকে উলঙ্গ করে আমার পশ্চাৎদেশে বাঁশ ঢুকিয়ে গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে টাঙ্গিয়ে রাখবেন, তাতেও আমার প্রায়শ্চিত্ত হবে’।

গ্রামের সরল মানুষেরা দ্বিধা-দন্দের মধ্যে রাজী হলেন জাফরের শেষ ইচ্ছা করার। জাফর মরার পরে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গ্রামের মাতবর সাহেবরা মিলে জাফরের মৃতদেহ গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে বাঁশের মাথায় টাঙ্গিয়ে রাখলেন। এর পরের দিন গ্রামে পুলিশ এসে গ্রামের সব মাতব্বরকে ধরে নিয়ে গেলো মৃতদেহের প্রতি অসম্মান জানানোর জন্য। এটা দেখে গ্রামের সব চেয়ে বুড়ি মহিলা বললেন যে, ‘নষ্ট মানুষ মরার সময়ও তাঁর নষ্ট চিন্তা ছাড়ে না, এটা তাঁর প্রমাণ’।

লেখক :  সায়েদুল আরেফিন : উন্নয়ন কর্মী ও কলামিস্ট

(লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব অভিমত। আজ ২৪-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)


%d bloggers like this: