ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

রক্তাক্ত সাংবাদিকতার দিন কিংবা নতুন সুর্যোদয়

প্রথমটাতে রক্তাক্ত দুই তরুণ-তরুণীর সঙ্গে। চলমান নিরাপদ সড়কের আন্দোলন কভার করতে গিয়ে ধানমন্ডির দুই নম্বর সড়কের স্টার কাবাবের সামনে আমি নিজেও ফ্রেমবন্দী হয়েছিলাম। সাবিহা আপার তোলা ছবিটা প্রথম আলো ছাপিয়েছিল, অনলাইনে।

সেদিন এক চরম ভীতিকর অবস্থা এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে প্রতিটা মুহুর্ত। শিক্ষার্থীদের ফ্রেশ আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে গেছে, এমন অভিযোগে তা দমনে মাঠে নেমেছিল ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা ভীষণ মারমুখী। আগের দিন মার খেতে খেতে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। সেদিনও যাচ্ছেতাই অবস্থা। ততক্ষণে এপির আহাদসহ আরো বেশ কয়েকজন মার খেয়েছে ভীষণ, তারা তখন হাসপাতালে।

চোখের সামনে যা ঘটছে তা ফ্রেমবন্দী করা যাচ্ছে না। অথচ এসবের সংবাদমূল্য রয়েছে, পাঠকের জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সংবাদকর্মী, যারা আমরা একসঙ্গে ছিলাম, হাত অনেকটা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তবু চারদিক থেকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল, মারপিটের হুমকি-ধমকি, চরম একটা আতঙ্ক, এই বুঝি বাঁশ বা রডের পিটুনী পড়ে শরীরে।

যদিও তার আগেই শারিরীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর ছবি তুলেছিলাম, তথ্য সংগ্রহ করেছি। সেই ছবি আমার মোবাইলে। হাতে রড-লাঠি-রাম দা’ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আশেপাশে। ভয়ে আমি মোবাইলটা ব্যাগে রেখে দিলাম। অন্তত মোবাইল চেক করতে এলে যেন কিছু একটা বলে কাটাতে পারি।

সাবিহা আপা সাহস করে একটা ছবি তুলেছিলেন, তার দিকে তেড়ে এলেন কয়েকজন, আমরা ঠেকালাম। একজন এসে প্রথম আলোর সাংবাদিক আছে কি না তা জিজ্ঞাসা করছে, তাকে পেলে পেটাবে। পাশে পুলিশের একটি দল, অসহায়, আসলে কিচ্ছু করার ছিল না তাদেরও। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বলে কথা।

কদিন ধরেই এসব আমাকে ভাবাচ্ছে খুব। দিন দিন কেন যেন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা এদেশে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মাঠের সাংবাদিকরা মার খাচ্ছে, নানা পক্ষ, যারা নিজেদের অন্যায় প্রকাশ করতে চায় না, তারাই বিরাগভাজন হচ্ছেন। গায়ে শুধু হাত তোলা হচ্ছে না, মেরে আধমরা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি আমি যতদিন সাংবাদিকতা করছি, এর আগে কখনো হয়েছে বলে আমার মনে পড়ছে না।

কেন এমনটা হচ্ছে? উত্তর দিতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে। শুধু বলি, যা হচ্ছে তা ঠিক হচ্ছে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকাটা উচিত। যদিও মত প্রকাশের নামে স্বেচ্ছাচারিতা বা গুজব ছড়ানোটা আমার পছন্দ নয়। গুজব ছড়ানোর দায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনার বিপরীতে আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগ আমি মানতে পারি না।

ধরা যাক, শহীদুল আলমের কথাই। খ্যাতিমান ফটোগ্রাফার। দেশ-বিদেশে তার ব্যপক পরিচিতি। আল জাজিরায় সংবাদ বিশ্লেষণে তিনি যে ভাষ্য দিয়েছেন তা তিনি দিতেই পারেন। সরকারের বিরোধিতা যে কেউ করতেই পারেন। তিনি ফেসবুক লাইভে অনেক কথা বলেছেন। শুধু একটি কথায় আমার আপত্তি। তিনি বলেছেন, Female students are taken and then disappearing. তার মতো একজন বিশিষ্টজন, নিশ্চিত না হয়ে একথা বলতে পারেন না।

তবু তাকে গ্রেফতারের যে কায়দা, তা আমি পছন্দ করি না। এতে বরং হিতে-বিপরীত হচ্ছে বলে আমি মনে করি। সারা বিশ্বে একটা বার্তা চলে গিয়েছে, বাংলাদেশ নিয়ে, ক্ষমতাসীন সরকার নিয়ে, মুক্তমত প্রকাশের কারণে দমন-পীড়নের নেতিবাচক একটা বার্তা। আমি তার মুক্তি কামনা করি।

এই যে এত উত্তাল একটা পরিস্থিতি, আমি তবু আশাবাদী। আমি জানি এসব অন্ধকার কেটে যাবে একদিন। শুভবুদ্ধির উদয় হবে সবার, সব পক্ষের। একদিন নতুন এক সূর্য উঠবে আমাদের এই দেশে। ঠিক আমার দ্বিতীয় ছবিটার মতো, যা তুলেছিলাম প্রায় বছর খানেক আগে, গ্রামের বাড়ীতে।

সেই নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায়…!!!

লেখক : নুরুজ্জামান লাবু : সাংবাদিক, বাংলা ট্রিবিউন

(লেখাটি লেখকের একান্তু নিজস্ব অভিমত। আজ ২৪-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)


%d bloggers like this: