ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই ২০১৯, | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০

লাল শাড়ির ব্যঞ্জনায় নারী

শাড়িতে পরিপূর্ণ প্রকাশিত হয় বাঙ্গালী নারী। এটি চিরকালীন সত্য। শাড়ি তার বারো হাত বহরে ধারণ করেছে আমাদের বৈচিত্র্যময় ইতিহাস। উৎসবে-পার্বণে নিজেকে সাজিয়ে তুলতে শাড়ি বিকল্প কিছুই নেই। সময়ের আবর্তনে শাড়ি সমাদৃত হয় তার নকশায় আর রঙে। তাই পাশ্চাত্য পোশাকের পাশাপাশি পোশাক হিসেবে শাড়ির গ্রহণযোগ্যতাও একদম কম নয়।
 
শাড়ির ব্যঞ্জনায় নারী :  ‘শাড়ি’ নামের দুই অক্ষরের ছোট্ট শব্দটি নারীর পরিধানে নানা ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়। প্রাচীন যুগের শাড়ির রঙ ও নকশা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া না গেলেও তার পরার ভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিকরা কথা বলেছেন। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন, ‘পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড় পরার রেওয়াজ আদিমকালে ছিল না।
এই অখণ্ড বস্ত্র পুরুষের বেলায় অভিহিত হয় ধুতি আর মেয়েদের বেলায় শাড়ি নামে।’ মধ্যযুগে এসে এক প্যাঁচে শাড়ি পরার পদ্ধতিটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। ঊনবিংশ শতকে বঙ্গরেনেসাঁর প্রভাবে বাঙালি নারী ঘরের বাইরে কর্মক্ষেত্রে পা রাখে। শাড়ি পরার আঙ্গিক তার সাথে তাল মিলিয়ে যায় বদলে। আসে কিছু নতুনতর পদ্ধতি। সামনে কুঁচি ঝুলিয়ে দিয়ে বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে আঁচল। কাজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ এবং পরিপাটি একটা ভাব এনে দেয় বলে এখনো কর্পোরেট রমণীদের কাছে অধিক জনপ্রিয় এই শাড়ি। প্রায় ৮০ ভাবে শাড়ি পরা যায় !!!!!! নিভি, বাঙ্গালি, রাজস্থানী, রাজরানী, কুরগি,মহারাষ্ট্র, মারমেইড, মমতাজ ,টামিলিয়ান, হিপহপ, গুজরাটি, অরিয়া, ,কদাগু, দ্রাভিদিয়ান, মাদিসার, গোব্বি, মালায়লি, কুনবাই, কেরালা, ফিজিয়ান, আন্ধ্রাস্টাইল, ঘাঘরাস্টাইল,দুপাট্টাস্টাইল, দক্ষিনি, রেডি শাড়ি , ইত্যাদি। আবার শাড়ির রঙ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কিছু প্রথাগত সংস্কার লক্ষণীয়। যেমন লাল রঙের বেনারসী শাড়ি হবে নববধূর পরিধেয়। বাঙালি নারীর সজ্জায় তাই লালের প্রাধান্য¬ সিঁদুর, আলতা, কুমকুম সব লাল। কবির কবিতাতেও তাই লাল রঙের ভাবনার ছড়াছড়ি – রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন। আগে ওকে বারবার দেখেছি লালরঙের শাড়িতে- দালিম-ফুলের মতো রাঙা; আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়, আঁচল তুলেছে মাথায় দোলন-চাঁপার মতো চিকন-গৌর মুখখানি ঘিরে। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, – “আমাদের মেয়েদের পাড়ওয়ালা শাড়ি, তাদের নীলাম্বরী, তাদের বেনারসি চেলি — মোটের উপর দীর্ঘকাল বদল হয়নি– কেননা ওরা আমাদের অন্তরের অনুরাগকে আঁকড়ে আছে।” তাই তো তার
কবিতায় উঠে এসেছে- ধলেশ্বরীনদীতীরে পিসিদের গ্রাম। তাঁর দেওরের মেয়ে, অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক। লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল — সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে। মেয়েটা তো রক্ষে পেলে, আমি তথৈবচ। ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া — পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।
রক্তরাংগা লাল উদ্ভাসে:  বাঙালির জীবনে লাল রঙকে দু’ভাবে দেখা যায়। এক হলো প্রাণ-প্রাচুর্য, শক্তি; আর দুই হলো সমৃদ্ধ সম্ভাবনার প্রত্যাশা। তাই যেকোনো উৎসবের রঙ হিসেবে বেছে নেয়া হয় লাল রঙ। যেমনঃ বৈশাখের লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। লাল, সাদা রঙের ব্যপারটি হটাৎ করে আসেনি। প্রাচীন বাংলার সম্ভ্রান্ত নারীদের গায়ে যেমন শোভা পেতো মোটা পারের গরদ বা ঢাকাই শাড়ি, ঠিক তেমনই চাষিবউদের জন্য ছিল সাধারণ সুতি শাড়ি। সুবোধ সরকারের “শাড়ি” কবিতার ভেদনশক্তিতে আদ্র হয়েছে কত প্রেমিক পুরুষের নিঃসঙ্গ দুপুর। এছাড়া ময়মনসিংহের এ লোকগীতিকায় মসলিন শাড়ি সম্বন্ধে বলা হয়েছেঃ ‘ তাঁতেতে লইলে শাড়ি মুইণ্ঠেতে মিলায়/ মিরতিকাতে থুইলে শাড়ি পিঁপড়ায় লইয়া যায়…’ মসলিন পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোৎকৃষ্ট মানের সুতিবস্ত্র। সূক্ষ্মতার জন্যই প্রাচীনকালে এর আরেক নাম ছিল ওয়েভ অব দ্য ওভেন উইন্ড অর্থাৎ ‘হাওয়ার ইন্দ্রজাল’। লোককবি কমলা পারার এই বচনে অতিরঞ্জন নেই- ‘শূন্যেতে থুইলে শাড়ি শূন্যে উড়া করে।’ ইতালির লেখক আলেসান্দ্রো বারিককো ১৯৯৬ সালে লিখেছিলেন ‘সেতা’, ইংরেজিতে ‘সিল্ক’ নামের বইটি। এর মূল চরিত্র এর্ভে জোঁকু ছিলেন সিল্ক ব্যবসায়ী। ডিম অবস্থায় রেশম পোকা কিনে বিক্রি করতেন বাজারে।
হাতের তালুতে রাখা মৃতবৎ পোকাগুলো নিয়ে তার উচ্ছ্বাস ছিল, ‘বলতে পারেন আমার হাতের মুঠোয় ভাগ্য’। প্রাচীন লেখকেরা চীন দেশকে রেশমের আদি বাস বলে মত প্রকাশ করেন। চীনের বাইরে কী করে রেশমের গুটিপোকা ছড়িয়ে পড়ে, এ নিয়ে অনেক চমকপ্রদ গল্প আছে। কিন্তু জেমস টেলর অনুমান করেন, পৃথিবীতে প্রথম রেশম উদ্ভাবনের গৌরব বাংলাদেশের। তাঁর যথার্থ মনে হয় কয়েকটি কারণে। এ উপমহাদেশে চীনের পাঁচ হাজার বছর আগের সাহিত্যে রেশমি পশমি বস্ত্রের উল্লেখ দেখা যায়। রামায়ণ মহাভারতে রেশমি পশমি বস্ত্রের কথা আছে। মনুসংহিতায় তসর ও রেশমের উল্লেখ পাওয়া যায়। রামায়ণ মহাভারতে রেশমি পশমি বস্ত্রের কথা আছে। মনুসংহিতায় তসর ও রেশমের উল্লেখ পাওয়া যায়। রামায়ণে কিষ্কিন্ধা ৪০২/৩ শ্লোকে পুন্ড্ররাজ্যে (বর্তমান বগুড়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল) কোষকার তথা রেশম উৎপাদনকারী জনপদের কথা জানা যায়। সময়ের বিবর্তন ঘটে চলেছে, কালিদাস-এর আমলের শাড়ি আর এখনকার শাড়ি এক নয়। বঙ্গরমণীর আদি ও অকৃত্রিম আবরণ এই শাড়ি। এখন এই দেশীয় সংস্কৃতির সাথে আবির্ভাব ঘটেছে আধুনিকতার, কিন্তু ঘুরেফিরে পুরনোকে অনুকরণ, অনুসরণ আর চর্চা। কবিগুরুর মতে- ‘হৃদয়হীন অগভীর বিলাসের আয়োজন অকারণে অনায়াসে ঘন ঘন ফ্যাশনের বদল হয়।’
মডেল : ইলোরা ছবি : তানভীর আহমেদ
আজ ফিচার/ ইলোরা শারমীন/ হা.আ

%d bloggers like this: