ঢাকা, সোমবার , ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, | ৩ পৌষ ১৪২৫ | ৯ রবিউস-সানি ১৪৪০

শয্যার দ্বিগুণ রোগী নিয়ে হিমশিম হৃদরোগ হাপসাতালের!

শয্যার চেয়েও অনেক বেশি রোগী নিয়ে হিমশিম ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। বুকে ব্যাথা নিয়ে ভোলার লালমোহন  থেকে ঢাকা এসেও কোনো ওয়ার্ডে বিছানা পাননি হেলাল উদ্দিন। তার ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের দক্ষিণ ব্লক থেকে উত্তর ব্লকে যাওয়ার সংযোগ স্থানে। তার ভাষ্য, কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে, কবে সিট পাবো, বা আদৌ পাবো কি না, তা জানি না। গরমের ভেতরে এখানেই থাকতে হচ্ছে।

তবে শুধু কেবল হেলাল উদ্দিন নয়, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ওয়ার্ড ও কেবিন ছাপিয়ে তার মতো  অনেক রোগীরই স্থান হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতে, বারান্দায়, সিঁড়ির মুখে, এমনকি বাথরুমের সামনেও। চিকিসকরা বলছেন, গত কয়েকবছর ধরেই দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আর সে কারণেই এ রোগের জন্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালটিতেও বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।

সরেজমিনে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় জরুরি বিভাগের সামনে বসে রয়েছেন রোগীরা। তিন তলা ও চার তলার ওয়ার্ডের বেডগুলোতে তো বটেই, মেঝেতে অতিরিক্ত প্লাস্টিকের বিছানা পেতে ঠাঁই নিতে হয়েছে রোগীদের। বারান্দা, সিঁড়ির মুখ আর বাথরুমের সামনেও পাটি পেতে রয়েছেন রোগীরা। রোগীরা রয়েছেন তৃতীয় তলায় প্রশাসনিক ভবনের সামনের অংশেও। সেখানে রোগীদের মাথার কাছে ছোট টেবিল ফ্যান, অন্ধকার বারান্দাতে গরমে একাকার অবস্থা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে গরম। তার মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে তাদের।

চিকিৎসকরা জানালেন, হাসপাতালটির সিসিইউয়েও (করোনারি কেয়ার ইউনিট) রোগীরা সিট পাচ্ছেন না, সেখানেও তাদের মেঝেতে বিছানা পেতে থাকতে হচ্ছে।

উত্তর ব্লকের ভিভিআইপি কেবিন ব্লকের পাশের বারান্দাতেও সারি সারি রোগীদের বিছানা। তবে এর চেয়েও ভয়ংকর অবস্থা ভেতরের দিকে বিছানা পেতে স্থান নেওয়া রোগীদের। সেখানে আলো নেই, বাতাস নেই, ভ্যাপসা গরমে রোগীর সঙ্গে থাকা সুস্থ স্বজনরা পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। হাসপাতালের এই অংশটিতে কথা হয় মিলন নামে একজনের সঙ্গে।

মাদারীপুর থেকে বাবাকে নিয়ে এসে ভর্তি হয়েছেন গত সপ্তাহে। মিলন  বলেন, ‘বাইরের দিকে তবু আলো-বাতাস পাওয়া যায়। কিন্তু ভেতরের দিকে তাও নেই। গরমে এখন আমিই অসুস্থ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু কিছুই করার নেই। কোনো বেড তো পাচ্ছি না।’

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিশেষায়িত সরকারি এই হাসপাতালটিতে উপচে পড়া ভিড়ের কারণে এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. এস টি এম আবু আজম ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ওয়ার্ডের মতো করেছিলেন নির্ধারিত বিছানার বাইরে ২০টি বিছানা দিয়ে। ওই ২০টি বেডসহ হাসপাতালে মোট বেডের সংখ্যা ৪৩৫। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হাজারের বেশি। ৫০ থেকে ৫৩ বিছানার একেকটি ওয়ার্ডে রোগী থাকছেন দুই শতাধিক রোগী। আর প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন দেড় থেকে দুইশ জন।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. পীযুষ বিশ্বাস বলেন, ‘এখান থেকে কোনো রোগীকে ফেরত দেওয়া হয় না। যেসব রোগীর ভর্তি দরকার বলে চিকিৎসা মনে করেন, তাদের সবাইকেই ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত রোগীকেও রাখতে হয়। এত রোগীর সেবা দেওয়ার মতো অবকাঠামো ও জনবল হাসপাতালের নেই। তবু চিকিৎসকরা তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।’

হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বেশ কম। সে কারণেও এই হাসপাতালে সারাদেশ থেকে আসা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ একটু বেশি বলে জানালেন ডা. পীযুষ। তিনি বলেন, হৃদরোগের জন্য এই হাসপাতালকে বলা হয় ‘মাদার হসপিটাল’। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই হৃদরোগে আক্রান্তদের এই হাসপাতালে রেফার করা হয়। তাই সবসময়ই এই হাসপাতালে ভিড় লেগে থাকে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, এটি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং সারাদেশ থেকে এখানে রোগীরা আসেন। তাই সিট নেই বলে কাউকে ফেরত দেওয়া যায় না। আবার অনেক রোগী অন্য হাসপাতালে সিট না পেয়ে এখানে আসেন। তাদেরও ফেরত দেওয়া যায় না। এসব কারণে এখানে সবসময় রোগীদের চাপ থাকে।

তিনি আরো জানান,  রোগীর চাপ সামলানে হাসপাতালের ভবনের বর্ধিত অংশের কাজ চলছে। এ বছরের মধ্যেই ওই কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্ধিত ভবন হয়ে গেলে এ সমস্যা থাকবে না।

আজ ২৪ প্রতিবেদবক, ঢাকা


%d bloggers like this: