ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই ২০১৯, | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০

শহিদ রীমু’র মা

জেলেনা চৌধুরী। শহিদ রীমু’র মা। অভাগা মা, যিনি তরতাজা যুবক সন্তানকে হারিয়েছেন। বীর মা, যিনি সন্তানকে বিসর্জন দিয়েও কেবল বিয়োগ-ব্যাথায় ভেঙ্গে পড়েননি বরং এ প্রজন্মের সাহসী সন্তানদের লড়াইয়ের বীজমন্ত্র শেখান প্রতিনিয়ত।আজ ১৯ সেপ্টেম্বর, শহিদমাতা জেলেনা চৌধুরীর সন্তান হারানোর দিন। আজ শহিদ জুবায়ের চৌধুরী রীমু’র মৃত্যুবার্ষিকী।
পঁচিশ বছর আগে ১৯৯৩ সালের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয়মুখ রীমুকে কুপিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে জামাত-শিবিরের খুনীরা। একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা সেদিন খুন হয়েছিলো স্বাধীনতাবিরোধী অপচক্রের হাতে।
জুবায়ের চৌধুরী রীমু ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা এবং ওই ক্যাম্পাসে জামাত-শিবির-সাম্প্রদায়িক চক্রের বিরুদ্ধে বজ্রসম কণ্ঠ। জামাত-শিবিরবিরোধী আন্দোলনে রীমু’র ভূমিকার কারণেই তিনি ওদের প্রধানতম শত্রুদের একজনে পরিণত হন। ফল হিসেবে সেদিনের সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটায় ওরা।
স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবির চক্র পঁচাত্তর-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে পুনর্বাসিত হয় সামরিক ও সামরিক-সমর্থিত দোসর সরকারগুলোর আনুকূল্যে। দুই জেনারেল জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এ কাজের প্রধান দুই কাজী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন জামাতের সশস্ত্র ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ তাদের এ নতুন যাত্রাপথে নাম পাল্টে হয় ইসলামী ছাত্র শিবির। ইসলামের লেবাস গায়ে জড়িয়ে কার্যত ধর্মের নামে খুনখারাবি আর দখলবাজির উন্মত্ততায় মেতে ওঠে তারা সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনে। আশির দশকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেন এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ছাত্র মৈত্রী নেতা জামিল আক্তার রতন খুনের মধ্য দিয়ে তাদের হত্যা-খুনের নয়া মিশন শুরু হয়। তাদেরকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দেয় জিয়া-এরশাদ ও তাদের অনুগতরা।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্মলাভ, জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে খুন করার মধ্য দিয়ে তার উল্টোরথে যাত্রা। সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সন্নিবেশ আর সমাজতন্ত্র উৎখাত করে এই উল্টোপথে কার্যত লাভবান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি। এরাই শহিদ জুবায়ের চৌধুরী রীমু’র খুনী।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী ছিলো এই জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী শক্তি। ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতের বেলা আবাসিক হলগুলোর শিক্ষার্থীরা যখন পড়াশুনা কিংবা ঘুম কিংবা টেলিভিশন দেখায় মত্ত, তখন পূর্বপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ শানায় হায়েনা শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। যারা সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তারা ভালো বলতে পারবেন, আমি অনুমান করি, রীমু’র সেদিন পালিয়ে আত্মরক্ষার সুযোগ ছিলো। কিন্তু রীমু হল অরক্ষিত রেখে, হাজারো সহপাঠী আর শত শত রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের মৃত্যুমুখে ফেলে রেখে নিজে বাঁচতে চাননি। বীরের মতো নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন। শিবিরের প্রশিক্ষিত ঘাতকরা তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে, হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করেছে।
শহিদ জুবায়ের চৌধুরী রীমু’র এই আত্মদান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে এক যুগান্তকারী ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রীমু’র রক্তের বদলা নেওয়ার শপথ নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী সারাদেশে একযোগে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে জামাত-শিবির হায়েনাদের বিরুদ্ধে। শুধু ছাত্র মৈত্রীই নয়, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সকল ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তি সেদিন আন্দোলনের নতুন দিশা পায়।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য কমরেড রাশেদ খান মেনন জাতীয় সংসদে এ ঘটনা তুলে ধরে জামাত-শিবির নিষিদ্ধের প্রস্তাব আনেন। সকল রাজনৈতিক দল এমনকি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বেগম খালেদা জিয়া’র বিএনপি’র সংসদ সদস্যরাও সেদিন এই ইস্যুতে সংসদে ঝড় তুলে একমত পোষণ করেন। তৎকালীন সংসদ উপনেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, খন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ অনেক জেষ্ঠ্য নেতাই এ প্রস্তাবের পক্ষে কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত জামাত-শিবির নিষিদ্ধের পক্ষে জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও এই বিএনপি-ই পরবর্তীতে জামাত-শিবিরের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে রাজনৈতিক সহবাস করে চলেছে।

শহীদ রীমু’র খুনের পর রাজশাহীতে যান স্বয়ং তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে সর্ব-বিরোধী দলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা সে সমাবেশে ভাষণ দেন। তিনি জামাত-শিবির নিষিদ্ধের দাবি তোলেন। আজ তিনি টানা দ্বিতীয় ও মোট তৃতীয় দফা শাসনকাল পূর্ণ করতে চলেছেন। কিন্তু জামাত নিষিদ্ধ হয়নি তো বটেই, এমনকি একটি আইনের সামান্য সংশোধন করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামাত-শিবিরের দলগত যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। উপরন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামাতের পরিবর্তিত রূপ হেফাজতে ইসলামের সাথে আপোস আর ভোটের রাজনীতির নানা দেনদরবার শেখ হাসিনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যে এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে ওই জামাতীদের রাজনীতিকে এই ভূমিতে পোক্ত করলো, আফসোসের বিষয় সেই এরশাদই নাকি আজ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির মিত্রশক্তি! রাজনীতির পরিহাস বুঝি এমনই হয়! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সরকার টানা ক্ষমতায় থাকা সত্বেও রীমু, জামিল, তোবারক-সহ এ রকম আরো বহু সহযোদ্ধার হত্যার কোনো বিচার হলো না!
শহিদ রীমু’র মা জেলেনা চৌধুরী তখন বিএনপি’র অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। কিন্তু যে জামাত-শিবিরের হাতে তাঁর প্রিয় সন্তান রীমু খুন হলেন, সেই খুনীচক্রের সাথেই যখন পরবর্তীতে খালেদা জিয়া সরাসরি জোট করলেন, তাদের এমপি-মন্ত্রী করলেন, তখন সরাসরি খালেদার হাতেই তিনি দল থেকে পদত্যাগপত্র তুলে দিয়ে নিজেকে ওই রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে নিলেন। বাস্তব অবস্থার নামে রাজনীতিতে শত্রুর সাথে আপোস যখন নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন শহিদ রীমু’র মায়ের বারবার কান্না নবায়ন করা ছাড়া আর কীই বা করার থাকে?
শহিদ রুমি যখন একাত্তরে মা জাহানারা ইমামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে শহিদ হলেন, সেই বছরই ১০ মে জেলেনা চৌধুরী নিজের মাত্র সাড়ে ১৫ বছর বয়সে রীমুকে জন্ম দিলেন। জেলেনা চৌধুরী গাইবান্ধার মেয়ে আর রিমু’র বাবা আব্দুল মুত্তালিব চৌধুরী নীলফামারীর সৈয়দপুরের লোক। অবশ্য মুত্তালিব চৌধুরীর চাকরির সুবাদে তারা পরে স্থায়ী বসতি গেড়েছিলেন সাতক্ষীরায়। রিমু’র জন্ম হয় গাইবান্ধায়। শহিদ রুমি এবং শহিদ রিমু। একজনের মৃত্যুর সময়কালেই আরেকজনের জন্ম। একই শত্রুর হাতে রুমির আত্মদানের ২২ বছর পর ১৯৯৩ সালে শহিদ হন রিমু। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তখন একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে সোচ্চার। তিনি তখন বাংলাদেশের সকল শহিদ সন্তানের জননী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। রীমু’র মায়ের পুত্রশোক ছুঁয়ে গেল তাঁকেও। জাহানারা ইমাম সেদিন জেলেনা চৌধুরী পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একই শোকগাঁথা বুকে নিয়ে। রীমু’র হত্যাকারী শিবির ক্যাডারদের বিচারের দাবিতে তিনিও সোচ্চার হয়েছিলেন। দুই শহিদ জননীর পত্র বিনিময় আজো ইতিহাসের পাতায় এক উল্লেখজনক ঘটনা হয়ে আছে। রীমু’র মাকে নিজ হাতে লেখা শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন শেখ হাসিনাও। বরেণ্য কবি ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামের আরেক অভিভাবক শামসুর রাহমান কবিতা লিখেছিলেন শহীদ রীমু’র আত্মদানকে উপজীব্য করে।

রীমুর হত্যাকাণ্ডের পর পেরিয়ে গেলো আরো পঁচিশ বছর। মা জেলেনা চৌধুরী আজো অপেক্ষা করে থাকেন কখন তার ছেলে তার কাছে আসে! মা বলে ডাকে! না, তিনি তার গর্ভজাত সন্তান রীমু’র ফিরে আসার প্রতীক্ষা আর করেন না। বরং রীমু’র রক্তে ভেজা সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সৈনিকদের প্রতীক্ষায় বসে থাকেন তিনি। ছাত্র মৈত্রীর ছেলেদের মাঝে তিনি রীমুকে খুঁজে পান। এ প্রজন্মের লড়াকু সব ছেলেদেরই তিনি নিজ সন্তান জ্ঞান করেন। মাতৃস্নেহের ডালি সাজানো তাঁর এই সব সংগ্রামী তরুণদের জন্য।
আমি জেলেনা চৌধুরীকে কখনো খালাম্মা, কখনো মা ডাকি। ব্যক্তিগতভাবে আমি জানি তিনি আমাকে কতোটা ভালবাসেন। জানি তিনি এই প্রজন্মের নতুন রীমুদের কতোখানি ভালোবাসেন। তাই এখনো সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামে এই তরুণদের দেখে যেমন তিনি উদ্বিগ্ন হন আবারও কোনো সন্তান হারানোর শঙ্কায়, অন্যদিকে সাহসী হন তার রীমু’র উত্তরসূরীরা আজ আবার নতুন করে সেই ঘাতকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্রে শান দিচ্ছে দেখে। তাই মা একবার বলেন- ‘প্রতিবাদের শক্তি সঞ্চয় করো’, আরেকবার বলেন- ‘সতর্ক থেকো বাবা’। যখনই জেলেনা চৌধুরীর সাথে আমার দেখা হয়, তিনি লড়াইয়ের বীজমন্ত্র বলে উজ্জীবিত করেন। কারণ তিনি জানেন, হায়েনারা বাংলাদেশটাকে খেতে এখনও উদ্যত।
শহিদ রীমু’র মৃত্যুবার্ষিকী আজ। আজকের দিনে তাঁর মনে যে শোকের ভার তিনি সহ্য করবেন, কোনো সান্ত্বনার ভাষা কি সে ভার লাঘব করার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। অগ্রজ সহযোদ্ধা রীমু নেই কিন্তু যে অনুজেরা আজো লড়ে চলেছে, রীমু’র মায়ের আশীর্বাদ তাদের সংগ্রামী পথের নিত্য-পাথেয় হোক।“আমার মা গো, তোর চোখে কেন জলের ধারা?

দুশমনে রুখিতে তোর এক পুত্র দিল প্রাণ,
মা, দেখ আজ তোরে মা বলে ডাকে হাজার সন্তান
আমার মা গো, কে বলে তুই সন্তানহারা!
ধন্য বীর মাতা বীর পুত্র গরবিনী, আমার মা;
সাহসী সন্তান বীর শক্তি-স্বরূপিনী, আমার মা
ঘরে ঘরে আমরা মা তোর আশিস নিয়ে মাথে
সংগ্রাম করিব হিংস্র দানবের সাথে
আমার মা গো, আঁখি মুছে উঠে দাঁড়া,
আমার মা গো, তোর চোখে কেন জলের ধারা?”

লেখক : বাপ্পাদিত্য বসু, প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।

(লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব অভিমত। আজ ২৪-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)


%d bloggers like this: