ঢাকা, সোমবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৩ মুহাররম ১৪৪০

শৈশবের ছবি নিয়ে স্বজনের খোঁজে ডেনমার্ক থেকে পাবনায়

ছয় বছর বয়সে নিজের পরিবার থেকে ছিটকে পরা এক শিশু মিন্টো। হারিয়ে গিয়েছিলেন পাবনার নগরবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে। শুধু এটুকুই সৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। সঙ্গে আছে শৈশবের কয়েকটি ছবি আর শৈশবের পাসপোর্ট। বলতে পারেন না বাংলা। তিনি এখন ডেনমার্কের নাগরিক।

সেই ছবি হাতে নিয়ে ৪১ বছর পর পাবনায় ফিরে হারানো স্বজনদের খোঁজে পথে পথে ঘুরছেন মিন্টো কার্স্টেন সনিক ও তার স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে। বাবা মাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় পাবনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সন্মেলনও করেন।

মিন্টো পেশায় চিত্রশিল্পী । চিকিৎসক স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে সঙ্গে নিয়ে দিন দশেক আগে পাবনায় এসে একটি হোটেলে আছেন। কয়েক দিন ধরে এই দম্পতি পাবনা শহর আর নগরবাড়ি এলাকায় ঘুরছেন, যাচ্ছেন এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম নদী নালা পথঘাট পেরিয়ে স্থানীয়দের কাছে জানতে চাইছেন- কেউ সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির বিষয়ে কোনো তথ্য জানে কি না।

স্ত্রীর সঙ্গে মিন্টো, পাশে ছেলেবেলার ছবি

মিন্টোর শৈশবের ছবিসহ বাংলায় লেখা একটি লিফলেট তারা বিলি করছেন। সেখানে লেখা- “১৯৭৭ সালের দিকে প্রায় ৪০ বছর আগে আপনি কি আপনার পরিবারের কোনো সদস্যকে হারিয়েছেন?”

সংবাদ সন্মেলনে মিন্টো বলেন, শৈশবের আসল নাম তার আর মনে নেই। একটি শিশু সদন থেকে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন ডেনমার্কের এক নিঃসন্তান দম্পতি। তাদের স্নেহে ডেনমার্কেই বড় হয়েছেন, বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে তাদের।

সেই শিশু সদন থেকে মিন্টো জানতে পেরেছেন, তার নাম মিন্টু। পাবনার নগরবাড়ি ঘাটে অভিভাবকহীন অবস্থায় তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন ঢাকার ঠাঁটারিবাজার এলাকার চৌধুরী কামরুল হুসাইন নামের এক ব্যক্তি। তিনিই ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল তাকে শিশু সদনে রেখে যান। পরে পালক বাবা-মায়ের সঙ্গে মিন্টো চলে যান ডেনমার্কে।

মিন্টো আরো বলেন, ছোটবেলায় বিষয়গুলো তেমনভাবে উপলব্ধি করতে না পারলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সঙ্কট দানা বাঁধতে থাকে মনের ভেতরে। কারণ ডেনমার্কে আমার কাছে অনেকে জানতে চেয়েছেন আমার শেকরের খবর। মানুষিক কষ্ট আর যন্ত্রনা আমাকে উই পোকার মত কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে। ডেনমার্কের জীবনে কোনো কিছুর অভাব হয়নি কখনো, কিন্তু একটি শূন্যতা সব সময় বুকের গভীরে ক্ষত তৈরী করে বাসা বাঁধে। আমি ডাঙায় তোলা মাছের মত ছটফট করতে শুরু করলাম। কিছুই ভালো লাগত না। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেছি অকারণে। তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র হাতে ছিল না। তারপরও প্রাণের টানে নিজের বাবা-মা, স্বজনদের খোঁজে আমার পাবনায় আসা।

স্বজনদের সঙ্গে ছেলেবেলায়, দেখাচ্ছেন আগের পাসপোর্ট

দশ দিনের সন্ধানে আশা জাগার মত কোনো তথ্য মিন্টো পাননি। সকাল বেলায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পথে পথে চলে তার খোঁজ। বাংলা বলতেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না। কিন্তু বুকে হাত রেখে বাবা-মায়ের কথা বোঝাতে চান এবং তাদের সন্ধান চান।

তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে আসার পর চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলেই মনে হয় আমার সেই স্বজনদের গন্ধ পাচ্ছি। ছোটবেলায় বাংলায় হয়ত কথা বলতে পারতাম, পরে ভুলে গেছি। কিন্তু এখন বাংলা কথা কানে এলেও অন্যরকম এক অনুভূতি হয় আমার, আমি বলে বোঝাতে পারব না।

নারীর টানে শেকড়ের খোঁজে প্রায় অসম্ভব এই চেষ্টায় মিন্টোকে সহযোগিতা করছেন পাবনার বাসিন্দা স্বাধীন বিশ্বাস। ফেইসবুকে পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব।

স্বাধীন বিশ্বাস বলেন, ফেসবুকে কথা হলে ওকে দেশে আসতে বলেছিলাম আমি। ও চলে এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি ওর স্বজনদের খুঁজে বের করার। অনেকেই স্বজন সেজে এসেছে কিন্ত মিলাতে পাছেনা মিন্টো।স্বজনদের সন্ধানে ইতোমধ্যে পাবনার পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন মিন্টো। সদর থানায় একটি এজহার দায়ের করেছেন তিনি।

পুলিশ মিন্টোকে সহযোগিতা করছে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শামিমা আকতার বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব তা করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলোও হয়ত তাকে সহযোগিতা করতে পারে।

আজ ২৪ প্রতিনিধি, পাবনা


%d bloggers like this: