ঢাকা, মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই ২০১৯, | ১ শ্রাবণ ১৪২৬ | ১২ জিলক্বদ ১৪৪০

সততার রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমার বাবা

সূচনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ● আমরা দু’বোন। বাবা আমাদের বন্ধু। অধিকাংশ সময় বাবার সাথে গল্প করেই আমরা ধাপে ধাপে বেড়ে উঠেছি। মা অফিস করেন। তাছাড়া মা একটু মেজাজী। মাও আমাদের বন্ধু। কিন্তু বাবা আমাদের ডানা মেলে উড়বার আকাশ, খোলা জানালার দখিনা বাতাস। বাবা আমাদের শুধু বাবা নয়, একজন শুদ্ধ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবার পাঠশালা। বাবা আমাদের আদর্শের প্রতীক, আমাদের সততার ঠিকানা।

আজ মায়ের কথা কিছু লিখবো না। শুধু বাবার কথাই লিখবো। বাবর জন্যই লেখাপড়ার বাইরে প্রথম কলম ধরেছি। বাবা বলেন নিজের অনূভুতি প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম কাগজ-কলম। এই যে কলম তুলেছি তাও বাবার শিক্ষা, বাবা শিখিয়েছেন। প্রচণ্ড কষ্টের দিশাহীন অস্থিরতার মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে; তবেই ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তাই আজ যখন চারিদিকে বহু মানুষের অমানবিকতা আর আমার মনের অস্থিরতার দ্বন্ধ বিবেককে চঞ্চল করে তুলেছে, তখনও বাবার শেখানো পথেই হাঁটছি মাথা ঠান্ডা রেখে।

আমার বাবা একজন সৎ রাজনৈতিক, ক্লিন এবং গুডবয় ইমেজের মানুষ। কথাগুলো শুধু আমার না,অগণিত মানুষের। বলতে গেলে বাবা চব্বিশ ঘন্টাই রাজনীতি করেন। বাসায় আমরা সবাই বলি বাবা ঘুমেও বুঝি দেশ ও জাতির কথা ভাবেন। বাবা খুব কম সময় ঘুমান। বাবা বলেন ৩/৪ ঘন্টার বেশি একজন মানুষের ঘুমানোর প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ বেঁচে থাকবে ততক্ষণ খোলা চোখে পৃথিবীকে জানার চেষ্টা করবে। প্রচুর পড়াশুনা করবে। পৃথিবীর বড় বড় মনীষীদের জীবন কাহিনী জানার চেষ্টা করবে। সেখান থেকে শিখবে কিভাবে বড় মানুষ হতে হয়। কেননা শুধু বয়স বাড়লেই বড় হওয়া যায় না, জানার গভীরতা থাকতে হয়। বাবা সব সময় বলেন দেশের কথা ভাবতে হবে, মানবতার কথা ভাবতে হবে। মানবতার কথা বলতে হবে। তবেই না তুমি মানুষ। সেখানেই তো তোমার বাঁচবার স্বার্থকতা । আমি প্রায়ই ভাবি আমাদের ভালবাসার বাবাটা এতো ভাল কেন?

হাবিব উন নবী খান সোহেল00120

বেশ কয়েক মাস আগের কথা বাবার বিরুদ্ধে অগণিত মামলা, দেশে চরম অস্থিরতা; বাবা বাসায় থাকতে পারছে না। একদিন বাবাকে বললাম চলো আমরা অন্য কোনো দেশে চলে যাই। শান্তিতে তো থাকতে পারবো। বাবার চেখে কি ভীষণ বিষন্নতা, নরম গলায় কঠিন করে বললেন, এই দেশ আমার দেশ। এদেশের মানুষ আমার আত্মার আত্মীয়। এ আমারই সোনার বাংলা। আমি এই বাংলার একজন প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। আমি আমার বাংলাদেশকে ভালবাসি। জন্ম-মৃত্যু, এই দেশেই হবে আমার ঠিকানা। আমি তো স্তম্ভিত। বাবার এই মূর্তি আগে কখনো দেখিনি। আমি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে হতাশ হলাম। মনে মনে গর্ব হলো আমাদের অহংকার পিতা, তোমায় শত কোটি সালাম। সালাম আমাদের দাদা মরহুম অধ্যাপক নূর-উন-নবী খান সাহেবকে (গনিত শাস্ত্র), যিনি আমার বাবাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। যিনি পাঁচজন মেধাবী সন্তানের পিতা। ছালাম আমার দাদীমাকে যিনি আমার বাবার মত একজন সৎ-সাহসী যোদ্ধা সন্তানের গর্ভধারিণী। এখানে বলে রাখা ভালো আমার দাদীমাও একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। দাদীমার বাবা মরহুম অ্যাডভোকেট আকবর আলী আকন্দ তৎকালীন সরকারের একজন এম.এল.এ ছিলেন। দাদীমার কাছে গল্প শুনেছি মাওলানা ভাষানী সাহেবকে তিনি বহুবার নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছেন। বাবার মামারা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদার পরিবারেও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কম নয়। নজরুল ইসলাম খান, মঞ্জুরুল আহসান খান, মারুফ কামাল খান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ আরও অনেকে আছেন তন্মধ্যে। এই পারিবারিক পরিচয় কেন তুলে ধরলাম তা বলছি। আমি বিশ্বাস করি আমার বাবা একজন জন্মরাজনীতিবিদ, একজন জন্মযোদ্ধা। বাবার রক্তে আছে রাজনৈতিক অক্সিজেন, আর চোখের তারায় স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি বাবার রাজনৈতিক শুরুটাই হয়েছে পরিবারের গণ্ডি হতে। যাকে বলে জন্মগত। হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসলে এতো সততা আর দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হতো কিনা জানি না। রক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্নাঙ্গ রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন। কত কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে, নানা বাধা পেরিয়ে বাবা হেঁটে চলছেন গন্তব্যের পথে। এরই ধারাবাহিকতায় ফজলুল হক হল শাখার ছাত্রদলের (ঢাবি) সভাপতি, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির তারুণ্যের প্রতীক জনপ্রিয় সাধারণ সম্পাদক এবং ছাত্রদলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সভাপতি (কেন্দ্রীয় কমিটি)। সিনেট সদস্য (ঢাবি)।

হাবিব উন নবী খান সোহেল00123

এমতাবস্থায় ২০০৬ সালে রংপুর সদর থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ। এক পর্যায়ে মৃতপ্রায় স্বেচ্চাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। বাবার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সততা ও নিরলস পরিশ্রম দিয়ে দেখিয়ে দিলেন ইচ্ছা যদি সৎ হয়, মনোবল যদি দৃঢ় হয়, অন্যায়ের সাথে আপোষকামী যদি না হয় তবেই একটি সংগঠন সবাইকে ছাড়িয়ে প্রথম সারির মর্যাদা পেতে পারে। এতে করে হয়তো শত্রুর সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু আদর্শের জয় সুনিশ্চিত। বাবা সততা আর পরিশ্রমের মূল্য পেলেন ২০০৯ সালে। জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনের সুযোগ পেলেন। দলের অনেক নেতাদের বিরোধীতার পরও বাবা তার যোগ্য সম্মান পেয়েছেন। নির্বাচনে ১২ দিন সময় পেয়েছিলেন বাবা। কি অমানবিক পরিশ্রম তার। রাতে বাড়ি ফিরে সারাদিনের ধূলোবালি নিয়েই লুটিয়ে পরতেন বিছানায়। মা মাঝরাতে ঘুমের মধ্যেই বাবাকে ভাত মেখে খাওয়াতেন। বাবার এত কষ্ট দেখে একদিন বললাম, বাবা তুমি শুধু মানুষের কথাই ভাববে, দেশের কথাই ভাববে, আমাদের কথা ভাববে না? আমরাও তো তোমাকে পাশে পেতে চাই। বাবা বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, সংসারটা তো ছোট, এটা তোমরাই সামলাতে পারবে। আমার অনেক বড় কাজের দ্বায়িত্ব রয়েছে। সংসারের চাইতে অনেক বড় এ জাতিকে নিয়ে ভাবতে হয় আমাকে। স্বাধীন দেশটা ধীরে ধীরে পরাধীন হয়ে যাচ্ছে। এটা অনেক বাজে সংকেত। দেশের এ দুঃসময়ে দেশের পাশে থেকে কাজ করতে হবে। মানুষকে নিশ্চিন্তে বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বাবা সব সময় একটা কথা বলেন, Simple living high thinking.

কিন্তু এই বক্তব্যে এখন বাবার সাথে আমার চরম বিরোধীতা। মানুষের মন নিচের দিকে নামছে। মানুষ ভালবাসতে জানে না, ক্ষমা করতে জানে না, মানুষকে সম্মান করতে জানে না। কিভাবে বলবো মানুষ মানুষের জন্য? কি লাভ হলো বাবার সৎ চিন্তা করে, শুদ্ধ রাজনীতি করে? সেইতো আমার বাবার চরিত্র হরণের পালা শুরু হয়েছে। বাবা আমাকে আর আমার ছোট বোন মাটিকে বলেন, সৎ রাজনীতিবিদ হতে হবে, বাবার নাম রাখতে হবে। আমরাও বাবার স্বপ্ন সাথে নিয়ে ঘুমাই। কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই যখন পত্রিকার পাতায় আমার বাবার চরিত্র হরণের নির্লজ্জ প্রচেষ্টা চলতে দেখি, তখন রাতের সব স্বপ্ন ভাঙ্গার শব্দ পাই। আক্রোশে ফেটে পড়ি। এই দেশ এই সোনার বাংলার জন্য আমাদের বুকের ভেতর আর কত রক্তক্ষরণ হবে? এর শেষ কোথায়? বোধগম্য হচ্ছে না, ভাল হওয়াটা কি পাপ? সত্য ও ন্যায়ের কথা বলাটি কি অন্যায়? হে খোদা! তুমি নির্ধারণ করে দাও আমি এখন কি করবো?

আামর খুব মনে পরছে সুনীল বাবুর সেই বিখ্যাত কবিতাটা-
‘‘আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি
তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখব বলে’’

বাবাকে নিয়ে গল্প বলা এ জনমে হয়তো শেষ হবে না। বাবা চব্বিশ ঘন্টা রাজনীতি করেন ঠিকই, কিন্তু পার্টি অফিসের কোনো মিটিংয়ে বা সমাবেশে অংশগ্রহণের পর দলের কোনো কাজ ছাড়া কখনোই কোনো আড্ডায় সময় কাটান না। এমনকি কারো সাথে দাড়িয়ে এক কাপ চাও খান না। কাজ শেষে বাবা বাসায় চলে আসেন। কখনো অকারণে রাত করে বাসায় ফেরেন না। অর্থাৎ দলের কোন প্রয়োজন ছাড়া বাইরে তিনি কারো সাথে ৫ মিনিটও আড্ডা দেন না। বাবার বন্ধুরা বা নেতাকর্মীরা সবাই আমাদের বাসায় আসেন। আমাদের বাসা সর্বদা সবার জন্য খোলা। বাবা মৃদুভাষী কিন্তু দারুণ শ্রোতা। তিনি সবার কথাই মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন। বাসায় ফেরার পর আমাদের সাথে বাবার বহু রাজনৈতিক আলোচনা হয়। অনেক বির্তক হয়। এখানেই হয় কোনো কোনো সমস্যার সমাধান।

আমাদের দু’বোনের সকল চাহিদার কেন্দ্রবিন্দু আমাদের বাবা। মা আমাদের তেমন সময় দিতে পারে না। কিন্তু বাবা এ ব্যাপার পটু। আমাদের মার্কেটে নিয়ে যায়, খেতে নিয়ে যায়। আমাদের সাথে আমাদের পছন্দের মুভি দেখেন। এই সৎ, স্বচ্ছ মনের একজন মানুষ কখনোই, কোনদিনও খুনি হতে পারে না। নিশ্চয়ই পারে না, অবশ্যই পারে না। বাবাকে নিয়ে এই নোংরা খেলা বন্ধ করা উচিৎ। অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরাও চাই বিদেশী নাগররিকদের হত্যার সঠিক তদন্ত হোক। কঠিন বিচার হোক। একটা কথা নিশ্চিত, সত্য কখনোই গোপন থাকে না। কিন্তু এতদিনে যদি সব শেষ হয়ে যায়?

হাবিব উন নবী খান সোহেল00122

অনেকদিন বাবাকে দেখি না। বুকের ভেতরটা কেমন শুন্য শুন্য লাগে। অসহায় লাগে নিজেকে। আমার ছোট বোন মাটি, বাবার বুকে ঘুমানো তার অভ্যাস। তার দিকে তাকালেই কান্না পায়। প্রতি রাতেই মাটি কখনো মায়ের কখনো আমার বুকে মাথা রেখে শোয়। কি ভীষন যন্ত্রনা হচ্ছে মাটির ছোট্ট বুকে।

বাবা আমাদের প্রেরণার উৎস, আমাদের অস্তিত্বের অংশ, আমাদের চেতনার সূর্য। বাবার মতো আমিও দেশের রাজনীতিতে কোনো একদিন অংশ নিব। আমাদের বাবা যেমন আমাদের অহংকার তেমনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সততার অলংকার। যখন দেশের সাধারণ মানুষের কষ্টে অর্জিত অর্থ বহু নেতাদের পকেটে, যখন মানুষের মুখের কথা চোখে এসে থেমেছে, যখন মায়ের পেটে শিশু নিরাপদ নয়, যখন সন্তানের সামনে মাকে নগ্ন করা হয় তখনো কেন আমাদের বিবেকের দরজা বন্ধ হয়ে আছে? আসুন না আমরা সবাই দল-মত ভেদাভেদ ভুলে আগে আমাদের দেশটাকে বাঁচাই। সবাই মুক্ত কন্ঠে গেয়ে উঠি-
‘‘আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালবাসি’’।

তারিখ: ২৮/১০/২০১৫ইং

কার্টেসি: মেঘে ঢাকা তারা

আজ/এফবি/এমকে/৩০৪

ফেসবুকে আজ ● facebook/aaj24fan


%d bloggers like this: