ঢাকা, মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ | ১৫ মুহাররম ১৪৪০

‘সাহসই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার’

ছেলেবেলায় ‘বুদ্ধিমতি মাশা’, ‘সাত রঙ্গা ফুল’ কিংবা অন্য কোন মনোহারি রঙিন ছবির বইয়ে স্বপ্ন বোনার দিনগুলোতে হঠাৎ নজরে আসে ঢাউস সাইজের একটি বই। নাম ‘নদীর তীরে ফুলের মেলা’। চামেলীবাগের যে বাড়ী থেকে আলবদরের পশুরা আমার বাবাকে অপহরণ করেছিল একাত্তরে – সে বাড়ীর বাড়ীওয়ালী (যাকে আমরা সব ভাইয়েরা সেঝে আপা বলে ডাকতাম)-এর সংগ্রহে ছিলো বইটি। নামের সাথে মিল রেখে বইটির মলাটে প্রচ্ছদশিল্পী যে চিত্রখানা এঁকেছিলেন তা আমার শিশু মনে প্রবল দাগ কাঁটে, যা এখনো অম্লান রয়েছে। বইটির মূল লেখক লরা ইঙ্গেলস। তাঁর বই ‘লিটল হাউজ অন দ্যা প্রেইরী’কে শিশু-কিশোরদের পড়ার উপযোগী করে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন যিনি – তিনি জাহানারা ইমাম। বইটি্র হৃদয়-কাড়া অনুবাদের কারণে সেই ছেলেবেলা থেকেই লরা ইঙ্গেলস ও জাহানারা ইমাম নাম দুটি মনে গেঁথে গিয়েছিল। তখনো জানি না তিনি (জাহানারা ইমাম) শহীদ রুমির মা, কেননা শহীদ রুমি সম্পর্কে কোন ধারণাই পাইনি তখন। ধারণা পেলাম আরো অনেক পরে।

আশির দশকের শেষের দিকে সচিত্র সন্ধানী ম্যাগাজিনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’। আমাদের বাসায় অন্যান্য পত্রিকার সাথে সচিত্র সন্ধানীও রাখা হত। আমরা ছোটরাও পাতা উল্টিয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সচিত্র সন্ধানী ইত্যাদি ম্যাগাজিন দেখতাম। সচিত্র সন্ধানী দেখতে যেয়ে নজরে আসে একাত্তরকে নিয়ে লেখা তাঁর কালজয়ী দিনপঞ্জি।

বয়স কাঁচা হলেও জাহানারা ইমামের লেখার মধ্যে যে অদ্ভূত যাদু রয়েছে – তার কল্যাণে নিজের অজান্তেই ‘একাত্তরের দিনগুলি’র নিয়মিত পাঠক হয়ে যাই। একাত্তরে তাঁর সন্তান রুমী ও রুমীর সঙ্গীদের বীরত্ব গাঁথা, এবং এসব কেন্দ্র করে তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ট্রাজেডী তিনি এমন হৃদয়-নিংড়ানো ভাষায় বর্ণনা করেছেন যে সময়ান্তে অন্য আরো পাঠকের মতো রুমি, বদি, জুয়েল, আলম, আজাদ, মায়া’রা আমার মনের গভীরেও ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার স্থায়ী আসন করে নেন। একই সাথে আমার হৃদয়ে লেখিকা জাহানারা ইমামের প্রতি ছেলেবেলায় তৈরী হওয়া ভালোবাসার সাথে যোগ হয় একজন শহীদ মাতার প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধাবোধ। তাঁকে প্রথম স্বচক্ষে দেখি আশির দশকের একেবারে শেষের দিকে বাংলা একাডেমীর বইমেলায়। আমার সহোদরাসম ফৌজিয়া আপা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের দিকে আঙ্গুল নিবদ্ধ করে বলেন, “ঐ যে দেখ – উনি জাহানারা ইমাম – রুমির মা”। কলাপাতা শেডের মার্জিত শাড়ী পরিহিত বব ছাট চুলের এই ‘ভালো লাগা’ মানুষটির মুখে তখন শেষ বিকেলের কিরণ এসে এমন এক মায়াময় আভা তৈরি করেছে যে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ প্রগাঢ় থেকে প্রগাঢ়তর হয়। তখনো জানি না এই মহীয়সী নারীর এতো কাছে আসতে পারবো কোনদিন এবং কাজ করবো একসাথে একই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য!

সে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম এর কয়েক বছর পরেই ১৯৯১ এর শেষে। তিনি ১৯৯৪ এর জুনে চলে গেলেন আমাদের সকলকে ছেড়ে কিন্তু শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ঋণে বেঁধে গেলেন এমন করে যে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবার, ভালবাসবার অনুভূতি অটুট থাকবে চিরদিন। মনে পড়ছে, গণ মানুষের তীব্র আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটার পর দেশে গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনার বিকাশ ঘটবে – তেমন প্রতিশ্রুতি ছিল তিন জোটের রূপরেখায়। কিন্তু ঘটলো ঠিক তার উল্টো ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামের সহযোগিতা নিয়ে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করার অব্যবহিত পর পাকিস্তানের নাগরিক গোলাম আজমকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর আমির হিসেবে প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়ায় মুক্তিযুদ্ধ-চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের যেন ‘সম্বিৎ’ ফিরে এলো। এর ফলে আমরা ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশে না কি মুক্তিযুদ্ধে পরাভূত দেশ পাকিস্তানে বসবাস করছি তাঁর হিসেব মেলাবার প্রশ্নটি জরুরি হয়ে পড়লো। এই প্রশ্ন মেলাবার কাজে ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লিঙ্গ-পেশা-স্থান-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলেই এক ছাতার তলে আসার প্রয়োজনীতা অনুভব করতে থাকার এই সন্ধিক্ষণে জন্মলাভ করলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি, যার আহ্বায়ক হিসেবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবার দায়িত্ব বর্তালো জাহানারা ইমামের ওপরে। মুক্তিযুদ্ধ পক্ষের সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক শক্তি তখন জাতীয় সমন্বয় কমিটির ছাতার তলে সমবেত হয়ে এই আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেবার কাজটি করছে। শহীদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ’৭১ এই আন্দোলনে শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছে, এবং সেই সুত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ আসে। তাঁর মতো একজন মহীয়সী নারীকে খুব কাছ থেকে দেখতে পাবার, এবং তাঁর সঙ্গে থেকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের জন্য কাজ করতে পারার সুযোগ লাভ আমার জীবনের একটি অমুল্য অভিজ্ঞতা। এ নিয়ে দীর্ঘ কলেবরে লিখব পরে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যারা নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল তাদের বিচারের দাবীতে দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেল ‘পাবলিক ট্রায়াল’-এর আয়োজন করেছিলেন – যা সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলো। সেই একই আদলে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী শিরোমণি গোলাম আজমের জন্য ‘গণআদালত’ গঠন করে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ারদী উদ্যানে বিচারের আয়োজন করে জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এ এক মহা-যজ্ঞ। এ কাজে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে আগুয়ান হলে দেশে-বিদেশে এই আন্দোলন ব্যাপক সাড়া জাগায়। যদিও দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ তখন ভীষণ বৈরী ছিল, কিন্তু জাহানারা ইমামের ডাইনামিক নেতৃত্ব তরুণ প্রাণ আন্দোলিত করতে সমর্থ হয় – ফলে তরুণেরা দলে দলে ঘাতক-দালাল বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়। আজ ২০১৭ সালে এসে স্মরণ করছি, কি ভয়ংকর সময় পার করে এসেছি আমরা! সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল এই আন্দোলনের প্রতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গঠিত সরকারের অগণতান্ত্রিক মনোভাব এবং এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জামাত-শিবির-ফ্রিডম পার্টি-যুবকমান্ডের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতি সরকারের প্রশ্রয় ও মদদ দান। সর্বোপরি, খালেদা জিয়া সরকারের রাজনৈতিক দর্শনই ছিল স্বাধীণতা-বিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বন করা যার নিকৃষ্টতম পদক্ষেপ ছিল হত্যাকারী-হত্যার পরিকল্পনাকারীদের বিচার চাইবার অপরাধে শহীদ মাতা জাহানারা ইমামসহ গণআদালতের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা। আন্দোলনের তীব্রতায় ১৯৯২ সালের ২৯ জুন সরকার বাধ্য হয় সংসদে বিরোধী দলের সাংসদবৃন্দের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে – কিন্তু সরকার তা বাস্তবায়ন না করে চড়াও আন্দোলনের নেত্রী জাহানারা ইমামের ওপরে। খালেদা জিয়ার লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে জাহানারা ইমামকে লাঠিপেটা করে। অন্যায় আচরণের ষ্টিম রোলার চলতেই থাকে। কিন্তু জাহানারা ইমাম অটল থাকেন তাঁর দাবীতে। এ কথা অনস্বীকার্য, রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা – তখন সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী – জাহানারা ইমামের পাশে কায়-মনে থাকায়, তিনি তাঁর লক্ষ্যের দিকে বিপুল গতিতে এগিয়ে যেতে পেরেছেন। সঙ্গে অন্যান্য সংগঠনও তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস যুগিয়েছে।

বিরানব্বই সালের অক্টোবরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম ’৭১-এর প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উদ্বোধন করেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ঢাকার নীলক্ষেত সংলগ্ন এলাকার বাংলাদেশ পরিকল্পনা একাডেমীতে হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান। ঢাকাসহ  দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে তিনি দীর্ঘ সময় কাটান। এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা ‘উত্তরসূরি’ নামের একটি সংকলন প্রকাশ করি। সংকলনটিতে প্রকাশের জন্য জাহানারা ইমামের একটি নাতিদীর্ঘ সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছিলাম। এই সাক্ষাতকারে তরুণদের উদ্দ্যেশ্য করে কিছু বলতে বলা হলে শহীদ জননী যা বলেছিলেন – তার গুরুত্ব আজকের  বাস্তবতায় একটুও কমেনি। তিনি তরুণদের ভয় না পেয়ে সাহসী হতে বলেছিলেন কেননা তাঁর মতে ‘সাহসই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার’। আরো বলেছিলেন, ‘একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে উদ্যোগী হও। কেউ বিকৃত করতে চাইলেও তা মুখ বুজে মেনে নেবে না। খুঁজে বের কর আসলেই কি ঘটেছিল একাত্তর সালের ঐ নয় মাসে’। তিনি তরুণদের বলেছেন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এবং যারা মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে কি ঘটেছিল তা জেনে নিতে। বলেছেন, ‘কোটি কোটি মানুষ এখনো বুকে গভীর ক্ষত ও যাতনা  নিয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের কাছে যাও – তাঁদের কাছ থেকে জেনে নাও মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাস’। এ যেন যুদ্ধ জয়ের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সৈন্যদলের প্রতি প্রধান সেনাপতির অলঙ্ঘনীয় আদেশ! ম্যাক্সিম গোরকীর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাদার’-এর নায়ক পাভেল ভ্লাসভের মা যেমন ‘নবযুগ’-এর স্বপ্ন-দেখা তরুণ বিপ্লবীদের দানব শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবার সাহস যুগিয়েছেন, উদ্দীপিত করেছেন – শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সে কাজটিই করেছেন আমাদের দেশে। তরুণ প্রজন্মের মনে মুক্তিযুদ্ধের হৃত-চেতনা ফিরিয়ে আনার সাহস যুগিয়েছেন, ঘাতক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার সঙ্কল্প তৈরি করতে প্রেরণা যুগিয়েছেন। তাই তো জাহানারা ইমাম চিরদিন টিকে থাকবেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির আন্দোলনে। আজ জাহানারা ইমামের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

তৌহীদ রেজা নূর

 


%d bloggers like this: