ঢাকা, রবিবার , ২৬ মে ২০১৯, | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ | ২০ রমযান ১৪৪০

সেই দিতি, এই দিতি

মিশুক চৌধুরী ● দিন গুনছেন দেশে ফেরার। শরীরের অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরতেও পারেন। গত ২৯ জুলাই ভারতের চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অব অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড ট্রমালোজিতে(এমআইওটি) উনার মস্তিষ্কে সফল অস্ত্রোপাচার শেষে শুরু হয় দেশে আসার দিন গোনার পালা। আর মায়ের স্বাস্থ্যের আপডেট সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে নিয়মিত জানাচ্ছেন মেয়ে লামিয়া চৌধুরী। লামিয়ার মা পারভিন সুলতানা দিতি আশির দশকের শেষের দিক আর নব্বইয়ের শুরুতে ঢাকাইয়া সিনেমার শুধু পরিচিত মুখই ছিলেন না; বলা চলে ঢালিউড সে সময় শাবানা ও দিতির উপর নির্ভর ছিল।

আর শাবানা মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে গেলে পুরো নির্ভর হয়ে পড়ে দিতির উপর। তবে সে যাত্রায় খৈ হারিয়ে ফেলেন দিতি। একসময় দেশ ছেড়ে পাড়ি জামান সুদূরে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে দেশে ফিরেনও বটে। তবে, বেশ দেরি হয়ে গেছে। কেননা, এর কিছুদিন পরই ঢাকার সিনেমার মান অবনমন শুরু হতে যাচ্ছিল। আর সে সিনেমার সাথে নিজেকে মানানোর চেষ্টা না করে আস্তে আস্তে সরে সরে যেতে থাকলেন দিতি। তবে, এ নিয়ে অভিযোগও আছে দিতির বিরুদ্ধে। বিদেশফেরত দিতিকে নিয়ে কাজ করতে ভয় পেত পরিচালকরা। আবার কখন বিদেশে চলে যায়। অবশ্য দিতির ভাষ্য ছিল, তার মধ্যে কাজের সততা ছিল। দেশে ফেরে একসঙ্গে সাইন করা ১২টি সিনেমার কাজই শেষ করেছিলেন দিতি।

পরিচালকদের অভিযোগের জবাব দিতি দিলেও তার অভিনয় করা প্রথম ছবি যে এখনও মুক্তি পায়নি তা নিয়ে অবশ্য বেশ দুঃখ থাকাটা স্বাভাবিক দিতির। ১৯৮৪ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকাই সিনেমাতে পদার্পণ করেন তিনি। উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘ডাক দিয়ে যাই’ ছিল দিতির ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা। কিন্তু সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। দিতি অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আমিই ওস্তাদ’, আর পরিচালক ছিলেন আজমল হুদা মিঠু। এ ছবিতে দিতির অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের বেশ নজর কাড়ায় আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এরপর দর্শকদের বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে গেছেন ঢাকার সিনেমার সোনালি যুগের এ নায়িকা। এরপর ২৮ বছরে প্রায় দুইশ মত ছবিতে অভিনয় করেছেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘স্বামী-স্ত্রী’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য এ পুরষ্কার ঘরে তুলেন তিনি। এ ছবিতে দিতি আলমগীরের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন।

দিতি 0010 ‍aaj24.com
ছেলে মেয়ের সঙ্গে দিতি

সিনেমায় দিতি সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জুটি আবদ্ধ হয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে। এ জুটির প্রাণবন্ত অভিনয় গোগ্রাসে দর্শকরা গিলে ফেললেও বাস্তব জীবনে প্রাণবন্ত হতে পারেনি এ জুটির সংসার। দুজনেরই ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। তবে, ডিভোর্সেই পরিসমাপ্তি ঘটে কাঞ্চন-দিতির সংসার। তার আগে দিতি প্রথম বিয়ে করেছিলেন ১৯৮৬ সালে। বর চলচ্চিত্রেরই মানুষ সোহেল চৌধুরী। নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রম দিয়ে দিতির সঙ্গে একই সময়ে পা বাড়ান এ জগতে। চলচ্চিত্রে আসার পর প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক এফ কবীর চৌধুরী সোহেল চৌধুরীকে ‘পর্বত’ নামের ছবিতে নায়ক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। ওই ছবিতে তার বিপরীতে নায়িকা ছিলেন দিতি। দুজনের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। এর পরের বছর ১৯৮৫ সালে আমজাদ হোসেনের ‘হীরামতি’ ছবিতে অভিনয় করেন সোহেল। এই ছবিতেও তার নায়িকা দিতি। এই ছবিতে অভিনয় করতে গিয়েই প্রেমে পড়েন দুজন। এরপর সাতপাঁকে বাধা পড়েন।

দিতি 0011 ‍aaj24.com
সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে দিতির প্রথম সংসার

১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাত দুটার দিকে সোহেল চৌধুরী খুন হন বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবে। আর এ খুনের ঘটনা সারাদেশে বেশ আলোচনায় আসে। এ খুনের রহস্য আজও কিনারা হয়নি। কিন্তু তার পূর্বেই দিতি-সোহেলের ঘর ভেঙেছিল। তাদের ঘরে ১৯৮৭ সালে জন্ম নেন মেয়ে লামিয়া চৌধুরী আর ১৯৮৯ সালে জন্ম নেয় ছেলে দীপ্ত। মেয়ে কানাডা থেকে মেকিং নিয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ফিরেছেন দেশে। দীপ্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। এ দুই সন্তান নিয়েই দিতির জ্ঞান-ধ্যান। সন্তানদের নিয়ে গুলশানে বসবাস দিতির। বেশ কদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন চলচ্চিত্রের ব্যস্ততম এই অভিনেত্রী। ঈদের ঠিক আগেই অসুস্থতা তীব্রতর হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আশানুরূপ কোনো ফল না পেয়ে ভারতে যান। সেখানেই ধরা পড়ে তার ব্রেইন টিউমার, এরপর অপারেশন।
পারভিন সুলতানা দিতি অভিনয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে পাড়ি দিয়েছেন নাটকে, পরিচালনায়, সঙ্গীত আর বিজ্ঞাপনের মডেলিং-এ। ও! ওপার বাংলায়ও অভিনয় করেছেন দিতি। প্রসেনজিতের সঙ্গে অভিনয় করেছেন ‘প্রিয় শত্রু’ সিনেমায়। ছবিটির ‘চিঠি কেন আসে না আর দেরি সহে না’ শিরোনামের গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দুই যুগেরও আগে অনুপম রেকর্ডিং মিডিয়ার ব্যানারে দিতির প্রথম একক অ্যালবাম ‘তোমার ও চোখে’ বাজারে আসে। এরপর মাঝে দু-একটি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করলেও দীর্ঘদিন আর কোনো অ্যালবাম প্রকাশ করেননি তিনি। ২০১১ আবার সালে লেজার ভিশনের ব্যানারে বাজারে আসে তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ফিরে যেন আসি’। এটিও বেশ প্রশংসিত হয়। আর পরিচালনায় অভিষেক ঘটান ছোট পর্দা দিয়ে।

ইলিয়াস কাঞ্চন
দিতির দ্বিতীয় স্বামী ইলিয়াস কাঞ্চন

১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ নায়ারণগঞ্জের সোনারগাওয়ে জন্ম নেয়া দিতি ইডেন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন।

দিতির উল্লেখযোগ্য কিছু সিনেমা—দুই জীবন, ভাই বন্ধু, উছিলা, লেডি ইন্সপেক্টর, খুনের বদলা, আজকের হাঙ্গামা, স্নেহের প্রতিদান (১৯৯৯), শেষ উপহার, চরম আঘাত, স্বামী-স্ত্রী, অপরাধী, কালিয়া , কাল সকালে(২০০৫, মেঘের কোলে রোদ(২০০৮), আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা (২০০৮), মুক্তি (২০১৪), কঠিন প্রতিশোধ (২০১৪), জোনাকির আলো (২০১৪), তবুও ভালোবাসি (২০১৩), পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনি (২০১৩), হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ (২০১১), মাটির ঠিকানা, (২০১১), নয় নম্বর বিপদ সংকেত (২০০৭), দূর্জয় (১৯৯৬), সুইট হার্ট (নির্মাণাধীন), ধূমকেতু (নির্মাণাধীন)।

আজ/৩০১


%d bloggers like this: