ঢাকা, মঙ্গলবার , ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, | ৪ পৌষ ১৪২৫ | ১০ রবিউস-সানি ১৪৪০

সৌদি’র কাছে উত্তর চান ট্রাম্প, গুপ্তঘাতক পনের জন ছিল বলছে তুরস্ক

তুরস্কের সরকারী কর্মকর্তা এবং সংবাদমাধ্যম বলছে, সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যায় গুপ্তঘাতক পনের জন ছিল। তাদের মতে, খাসোগিকে দূতাবাস কমপ্লেক্সে খাসোগিকে হত্যা করে তার মৃতদেহ কূটনৈতিক সুবিধাপ্রাপ্ত গাড়িতে সরিয়ে ফেলে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের কাছে উত্তর চেয়েছেন। স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা সৌদি সরকারের কঠোর সমালোচক জামাল খাসোগির গত সপ্তাহে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশ করনার পর এখন পর্যন্ত নিখোঁজ বিষয়ে উত্তর খুঁজেছেন ট্রাম্প। সৌদি সর্বোচ্চ পর্যায়ে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।  যদিও সৌদি আরব খাসোগি দূতাবাসে কাজ শেষে বেরিয়ে গেছে বলে জাের দাবী করছে। তবে এর সমর্থনে তুরস্কের দাবী অনুযায়ী সিসিটিভি ফুঁটেজ সরবরাহ করেনি এখনো।
বিবিসি’র অনুসন্ধানে জানা যায় গুপ্তঘাতক দলের একজন সদস্য মাহের মুটরেব সৌদি গোয়েন্দা-বাহিনীর কর্নেল হিসেব কাজ করতেন এবং লন্ডনের এম্বেসিতে কর্মরত ছিলেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে একটি প্রাইভেট বিমানে করে এই এজেন্টদের নয়জন ওইদিনই এসে পৌঁছোয় বলে খবরে বলা হয়। বাকি সদস্যরা দিনের অন্য সময় একে একে এসে পৌছায় দ্বিতীয় আরেকটি বিমানে করে । এরপর তারা দূতাবাস ভবনের কাছাকাছি দুটি হোটেলে অবস্থান নেয়।

যা বলছে তুরস্ক ও সেখানকার গণমাধ্যম
ইস্তাম্বুলের সৌদি দূতাবাসে তিনি প্রথম প্রবেশ করেন ২৮শে সেপ্টেম্বর। সেসময় তার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে তার ডিভোর্স সংক্রান্ত কাগজপত্র তুলতে এসেছিলেন তিনি। মিস্টার খাসোগি এরপর ২রা অক্টোবর দুপুরের দিকে আবার আসেন দূতাবাসে। স্থানীয় সময় দেড়টার দিকে তার অ্যাপয়নমেন্ট ছিল। ইস্তাম্বুলের কর্তৃপক্ষ মনে করছে সৌদি এজেন্টরা তাকে খুন করেছে। তুরস্কের সরকারী কর্মকর্তারা বলছেন, দূতাবাসের আঙ্গিনার বাইরে সৌদি এজেন্টদের একটি দলের হাতে মিস্টার খাসোগি খুন হয়েছেন। এর পরপরই তার মরদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে নাম প্রকাশ না করে একজন কর্মকর্তা জানান, একটি কমপ্লেক্স অপারেশন আছে এবং সেখানে মিস্টার খাসোগিকে হত্যা করা হয় পৌঁছানোর দুই ঘণ্টার মধ্যেই।
সরকার-সমর্থক তুর্কী সংবাদপত্র সাবাহ বলছে, তারা সন্দেহভাজন ১৫ জন সৌদি এজেন্ট শনাক্ত করেছেন যারা গুমের ঘটনার দিন ইস্তানবুলে ঢুকেছিল এবং পরে বেরিয়ে গেছে।

 

তুরস্কের টেলিভিশনের প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ০২ অক্টাোবর সৌদি আরবের লোকজন এয়ারপোর্টে প্রবেশের পর গিয়ে হোটেলে উঠছে। খাসোগির ভিজিটের এক ঘণ্টা আগে কিছু যানবাহন দূতাবাসে ঢুকতে দেখা যায়। এরপর আগন্তুকরা প্রাইভেট বিমানে করে দেশ ছেড়ে যায় এবং সেগুলো রিয়াদের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় কায়রো ও দুবাই হয়ে, তদন্তকারীরা এমনটাই বলছেন।
খাসোগির অন্তর্ধানে হুমকিতে পড়েছে সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক।

ওয়াশিংটন পোস্ট ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টে বলা হয়, মিস্টার খাসোগির পৌঁছানোর আগে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা সৌদি কর্মকর্তাদের কথোপকথন রেকর্ড করেতে জানতে পারেন তারা একটি ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করছিল। এ বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘কোন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে, কারো ক্ষেত্রে আমরা এমনটা ঘটতে দিতে পার না। আমি সৌদি সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর উত্তর চেয়েছি।’ হোয়াইট হাউজ বলছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং সিনিয়র কর্মকর্তারা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে কথা বলেছেন এবং মিস্টার খাসোগি সম্পর্কে বিস্তারিত খবর নিয়েছেন।

সৌদি আরব কী বলছে?
যুবরাজ মোহাম্মদ গত সপ্তাহে ব্লুমবার্গ নিউজকে বলেছেন, “আসলে কী ঘটেছে সেটা জানতে তার সরকার খুবই উদগ্রীব” এবং মিস্টার খাসোগি কিছু সময় কিংবা ঘণ্টা খানেক পরই দূতাবাস এলাকা ছেড়ে যান।

“আমাদের গোপন করার কিছুই নেই”- তিনি উল্লেখ করেন। প্রিন্স মোহাম্মদ এর ভাই এবং আমেরিকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রিন্স খালেদ বিন সালমান “মিস্টার খাসোগি গুম বা হত্যার খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা তারা সব ধরনের সহায়তার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবনটির ভেতরে একটি তল্লাশি অভিযান চালানো যেতে পারে।
তুরস্ক বলছে তারা তল্লাশি চালাবে কিন্তু তার আগে প্রমাণ দিতে হবে যে মিস্টার খাসোগি যে ভবনটি ছেড়ে গেছেন প্রমাণ দিতে হবে।খাসোগির ছেলে সৌদি মালিকানাধীন আল অ্যারাবিয়া নিউজ আউটলেটকে বলেছেন তার বাবার নিখোঁজের ঘটনা বিদেশী মহলের কারণে “রাজতৈনিক” হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “মূল ঘটনা হচ্ছে তিনি একজন সৌদি নাগরিক এবং নিখোঁজ রয়েছেন”।

কে এই সাংবাদিক?
মিস্টার খাসোগি একজন নামকরা সাংবাদিক যিনি অনেক বড় বড় সংবাদ কভার করেছেন। এর মধ্যে আফগানিস্তানে সোভিয়েত অভিযান, ওসামা বিন লাদেনের উত্থান ইত্যাদি। অনেক বড় বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি এসব খবর লেখেন।
গতবছর আমেরিকায় যান তিনি। স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে এবং ওয়াশিংটন পোস্টে প্রতিমাসে কলাম লিখতেন। যেখানে তিনি সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখা লিখেছেন। নিজের প্রথম কলামেই তিনি লেখেন যে, যুবরাজ সালমান বাদশাহ সালমানের স্থলাভিষিক্ত হলে মিস্টার খাসোগি ভিন্নমত পোষণের কারণে গ্রেপ্তার হতে পারেন।গুম হওয়ার মাত্র তিনদিন আগে বিবিসি নিউজ আওয়ার অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ” যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তারা শুধু বিদ্রোহী তা নয়, তাদের স্বাধীন মন রয়েছে। ”

প্রথমবার তার সাথে সৌদি দূতাবাসে খুব আন্তরিকতার সাথে ব্যবহার করা হয় বলে ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছিলেন তিনি। কোন সমস্যা হবেনা বললেও তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন।

এতকিছুর পরও তিনি তার তুর্কী বান্ধবী হাতিস চেঙ্গিসকে নিজের দুটো মোবাইল ফোন দিয়ে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, যদি তিনি কনস্যুলেট থেকে বের না হন – তাহলে হাতিস যেন তুর্কী প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়েপ এরদোয়ানের একজন উপদেষ্টাকে ফোন করেন। খাসোগির অপেক্ষায় দূতাবাসের বাইরে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করে থাকেন হাতিস চেঙ্গিস। কিন্তু তিনি ফিরে আসেননি।


%d bloggers like this: