ঢাকা, বুধবার , ১৯ জুন ২০১৯, | ৫ আষাঢ় ১৪২৬ | ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

স্থূলতায় কিডনি-হৃদরোগের ঝুঁকিতে শিশুরা

বিশ্বের প্রায় সাড়ে ১২ কোটি শিশু-কিশোর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে। আর এর ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশেও। এই স্থূল স্বাস্থ্যের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগ, চোখের সমস্যা, বাত ও হেপাটাইসিসসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বাড়ছে শিশুদের।

দেশে ফাস্ট ফুড কালচারের কারণে বিদ্যালয়, শপিং মলসহ চারপাশে তাকালেই বয়সের চেয়ে অনেক বেশি অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের চোখে পড়ে বলেও বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক কাঠামো ও বয়সের তুলনায় অতিমাত্রায় ওজন শিশুদের স্বাভাবিক স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা কেড়ে নিচ্ছে। তারা ভুগছে বিভিন্ন রোগে। একইসঙ্গে বাড়ছে ভবিষ্যতের ঝুঁকি। এভাবে যদি শিশুরা অতিরিক্ত ওজন নিয়ে বড় হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে একটি প্রজন্ম মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। তারা বলছেন, স্থুলতা শিশুদের ভয়াবহভাবে ঠেলে দিচ্ছে আজীবনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। ইতোমধ্যেই বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন তারা।

চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের খাবারে জাংক ফুডের আধিক্য, কায়িক পরিশ্রম না করা, হাঁটা-চলা সীমিত থাকা, খেলাধূলার পরিবেশ না থাকা, ভিডিও গেমস, কম্পিউটার ও টেলিভিশনে আসক্তি শিশুদের অতিরিক্ত ওজনের জন্য দায়ী। একইসঙ্গে শিশুদের স্থূলস্বাস্থ্যের জন্য বাবা-মায়ের অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন।

সম্প্রতি শিশু-কিশোর ও বড়দের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালে যেখানে মাত্র দশমিক শূন্য তিন শতাংশ ছেলে শিশু ছিল স্থূলকায়, সেখানে ২০১৬ সালে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে তিন শতাংশ। অন্যদিকে, একই বছরে মেয়ে স্থূলকায় মেয়েশিশুর সংখ্যা দুই দশমিক তিন শতাংশ হলে কয়েক দশক আগে সে সংখ্যা ছিল শূ্ন্যের কাছাকাছি।

২০১৩ সালে প্রথম ‘বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতার প্রকোপ, খাদ্যাভাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ধরন’ শীর্ষক এক জরিপ করে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি)। কম ওজন, স্বাভাবিক ওজন, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা; এই চারভাগে ভাগ করা হয়েছে ওই জরিপে। এতে বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে ১০ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে ও ৪ শতাংশ শিশু ভুগছে স্থূলতায়। আর ঢাকা মহানগরে এর সংখ্যা যথাক্রমে ১৪ ও ৭ শতাংশ। স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের ৭০ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১২ বছর। বাকি ৩০ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূল শিশুর সংখ্যা শিক্ষিত পরিবারে বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

গতবছর জুলাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ১১ শতাংশ শিশু স্থূলকায় আর অতিরিক্ত ওজনের ১৩ শতাংশ। আর এসব শিশু ৪০ বছর পার হওয়ার পরই হৃদরোগ ও কিডনির সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগবে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিকেল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মশিউর রহমান খসরু বলেন, ‘বাচ্চারা এখন খুব বেশি ফাস্টফুড ও প্রসেসডফুড (প্রক্রিয়াজাত খাবার) খাচ্ছে। নিম্নমানের চিপস, বিস্কুটের মতো প্রসেসডফুড গ্রামাঞ্চলেও পাওয়া যাচ্ছে। টেস্টিং সল্ট, নিম্নমানের ক্রিম ও মাখনসহ যে ধরনের প্রিজারভেটিভ এসব খাবারে দেওয়া হয়, সেগুলো শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শরীরের স্বাভাবিক বিকাশে এগুলো সমস্যা তৈরি করে। এই সমস্যা এড়াতে কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ সুষম খাবার ও ঘরে তৈরি সাধারণ খাবার শিশুদের খেতে দিতে হবে।’

প্রায় একই অভিমত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদের। তার মতে, ‘বর্তমানে শিশুদের স্থূলকায়কে নতুন এক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখছি আমরা। খুবই আতঙ্কের বিষয় এটি। এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের খুব ভোগাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিশুরা মাঠে খেলে না, সারাক্ষণ টিভি দেখে, গেমসে ব্যস্ত থাকে। তাদের শারীরিক পরিশ্রম নেই বললেই চলে। অন্যদিকে রিচফুড, জাংকফুড বেশি খাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগে শিশুরা ভুগছে শুধু এই স্থূলকায়ের কারণেই।’

ডা. ইফফাত আরা শামসাদ বলেন, ‘এখন বাচ্চারা কাঁদলেই আমরা চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দেই। এভাবেই আমরা শিশুদের অভ্যাস তৈরি করে ফেলি। পরবর্তী সময়ে শিশুরা নিজেরাই এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শহরে শিশুরা ফাস্টফুড যত খায়, তত পরিশ্রম করে না। অতিরিক্ত চর্বি ও মেদ পোড়ানোর জন্য যতটা পরিশ্রম করা দরকার, তারা সেই সুযোগ পায় না বা পেলেও পরিশ্রম করে না। এ কারণেও তাদের মধ্যে স্থূলতা বাড়ছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য শিশুদের আউটডোরে খেলতে দিতে হবে, টেলিভিশন দেখা, মোবাইল ফোনে গেমস খেলা, ভিডিও গেমস খেলার আসক্তি কমাতে হবে, খাবার-দাবারে সচেতন হতে হবে।’ বাড়িতে তৈরি সুষম খাবার খেতে উৎসাহিত করারও পরামর্শ দেন তিনি।

আজ ২৪ প্রতিবেদক, ঢাকা


%d bloggers like this: