ঢাকা, শনিবার , ২৩ মার্চ ২০১৯, | ৯ চৈত্র ১৪২৫ | ১৫ রজব ১৪৪০

স্মরণে নির্মল সেন : তিনি বেঁচে থাকবেন শোষণমুক্তির স্বপ্নে

বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক, বাম রাজনীতির পুরোধা, মুক্তিযোদ্ধা নির্মল সেনের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে ৮৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় নির্মল সেন স্মৃতি সংসদ এক স্মরণসভার আয়োজন করেছে।

১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার দিঘিরপাড় গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন নির্মল সেন। তার বাবা সুরেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত ও মা লাবণ্য প্রভা সেনগুপ্তা। পরিবারের ছয় ভাই ও বোনের মধ্যে নির্মল সেন ছিলেন চতুর্থ। তার বাবা কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের গণিত শিক্ষক ছিলেন। ভারত বিভাগের ঠিক আগে ১৯৪৬ সালে তার পুরো পরিবার বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গেলেও নির্মল সেন এদেশেই থেকে যান।

তিনি কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে চতুর্থ শ্রেণী ও টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতি এমই স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর ফুপুর বাড়িতে থেকে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী বি এম একাডেমিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে প্রবেশিকা (এসএসসি) পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে আইএসসি পাস করে বিএসসিতে ভর্তি হন। পরে ১৯৬১ সালে জেলে বসেই বিএ পরীক্ষায় অংশ নেন ও কৃতকার্য হন। তিনি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবনের শুরু। ১৯৬২ সালে তিনি দৈনিক জেহাদ এবং ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় যোগ দেন। এরপর দৈনিক বাংলা পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়ে পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

নির্মল সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে অতিথি শিক্ষক ছিলেন। দৈনিক বাংলা পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর পার্টির সিদ্ধান্ত না মেনে সাংবাদিকদের স্বার্থে তিনি অমরণ অনশনে বসেন এবং সাংবাদিকদের পাওনা আদায়ে সরকারকে বাধ্য করেন। এছাড়া সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া জাতীয় প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন নির্মল সেন।

১৯৪২ সালে নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে স্কুল গেটে ১৬ দিন ধর্মঘট করার মাধ্যমে নির্মল সেনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি ১৯৪৪ সালে রেভ্যুলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টিতে (আরএসপি) যোগদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। এক পর্যায়ে আরএসপির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগে যোগ দেন। শ্রমিকদের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার তাগিদ থেকে তিনি বাংলাদেশ সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন।

পরে ১৯৬৯ সালে আদমজীতে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল নামে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন নির্মল সেন। এই দলের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতাত্তোর সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে নির্মল সেন ছিলেন অন্যতম।

তিনি বামপন্থীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। বাম ফ্রন্টের কর্মসূচিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রামেগঞ্জে। তার অসুস্থতার পর পার্টির নেতৃবৃন্দ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলকে বিলুপ্ত করে তিনটি সংগঠন মিলে গড়ে তোলেন গনতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি। যে পার্টির সভাপতি করা হয় নির্মল সেনকে। মৃত্যুকালেও তিনি গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সভাপতি ছিলেন।

৮ম শ্রেণীতে পড়াকালে ‘কমরেড’ পত্রিকায় লেখার মধ্য দিয়ে নির্মল সেনের লেখালেখিতে হাতেখড়ি। তিনি গুণী কলাম লেখক ছিলেন। তার প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনীর বই আছে বেশ কয়েকটি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এদেশের সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির প্রেক্ষিতে তৎকালীন দৈনিক বাংলায় লেখা তার কলাম ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ তখন তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ-সমাজ ও রাষ্ট্র, বার্লিন থেকে মস্কো, পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ, মা জন্মভূমি, লেনিন থেকে গর্বাচেভ, আমার জবানবন্দী, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই, আমার জীবনে ৭১-এর যুদ্ধ- এসব তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

নির্মল সেন ২০০৩ সালে ব্রেইনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। দেশে-বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার এক পর্যায়ে তিনি কোটালীপাড়ার দীঘির গ্রামে নিজ বাড়িতেই থাকতেন। সেখানে ২০১২ সালে ২৩ ডিসেম্বর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৪ ডিসেম্বর তাকে ঢাকায় ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পরলোকগমণ করেন কমরেড নির্মল সেন। জাতীয় প্রেসক্লাব ও শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার ইচ্ছানুযায়ী মরদেহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (পিজি হাসপাতাল) দান করা হয়।

নির্মল সেনের স্বপ্ন ছিল শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ। অথচ আজ তার প্রয়াণ দিবসে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নেই। তবু এই কমরেডের স্বপ্ন পথ দেখাবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে। শোষণমুক্তির স্বপ্নের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তিনি। লাল সালাম কমরেড নির্মল সেন।

আজ ২৪ ডেস্ক


%d bloggers like this: