ঢাকা, রবিবার , ২৬ মে ২০১৯, | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ | ২০ রমযান ১৪৪০

‘৯২-৯৩ এর নচি শ্রবণ কিংবা ‘০২ এ কোলকাতায় নচিকেতার সঙ্গে

।। হাসান আহমেদ।।

 

তখন ভেঙ্গে পড়ার দিন। তখন ভেঙ্গে গড়ার দিন। সব কিছু নবম শ্রেণী পড়ুয়া কিশোরের চোখে রঙ্গীন। এরশাদ পড়ে গেছে সম্মিলিত আন্দােলনের তোড়ে। নতুন সরকার এসেছে। অথচ যার সত্যি আসবার কথা ছিল সে আসতে পারেনাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। দূর ছাই তখন কি এত কিছু বুঝি! বরং তার একটি বক্তব্য টেলিভিশনে যা তাকে নির্বাচনে পরাজিত করেছিল সেটি এখনও বহুল প্রচলিত। অন্য মেকানিজমও যে কাজ করেছিল বা বাংলা্দেশ এর সব নির্বাচনে কোন না কোন মেকানিজম কাজ করে কিংবা করতে বাধ্য তা ভাবতে তেতো লাগলেও রুঢ় বাস্তবতা।
যাহোক, নচিকেতার কথায় আসি। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ফিতার ক্যাসেট কেনার কথায় আসি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলের বড় স্কুলে পড়তে গিয়ে দ্বিধান্বিত মানসিকতার কবলে পড়ার কথা বলতে আসি। বাবরি মসজিদ ধ্বংস হল ভারতে। তার ভয়ংকর ছাপ পড়ল বাংলাদেশে সে কথা বলতে আসি। এর মধ্যে কানে পৌছে গেল এই বেশ ভালো আছি কিংবা এই তুমি কি আমায় ভালোবাসো। তার ফিতার ক্যাসেট তখনো পৌছেনি বাংলাদেশে। কিন্তু তিনি পৌছে গছেন। ঠিক পৌছে গেছেন। শ্রোতার কানে। কোন ইউটিউব ছাড়া। কিংবা কোন অন্তর্জাল ব্যবহার না করেই। শব্দ-সুরে কিশোরের মনে। তারপর ফিতার ক্যাসেট আসে সে শিল্পীর। কেনে কিশোর। টিফিনের পয়সা বাঁচােনা নচিকেতা। বাড়ি পালায় সে কিশোর প্রথমে ৯৮ সালে। তারপর ফিরে আসে। আবার ২০০০ সালে। চলে যায় ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়া কোলকাতার পথে পথে। এই পালানোর বীজ মনে হয় তখনই পোতা হয়ে যায়। সেই ৯২-৯৩ এ। যা গেঁথে দিয়েছিল একজন নচিকেতা। যার সঙ্গে তার দেখা হয় ২০০২ সালে। ইটিভির সম্ভবত সা-সা রিয়েলিটি শোতে। ব্রেসব্রীজ এর স্টুডিওতে।

আজকের কাগজে প্রদায়কের কাজ করে তখন সেই যুবক। ২০০১ সাল। ৩১ ডিসেম্বর। থার্টি ফাস্ট নাইট এ কোলকাতায় সেই যুবক। যদিও সে গিয়েছিল গঙ্গা-যমুনা নাট্যেৎসব কভার করতে। যদিও তার কাছে তখনও ছিলনা পাসপোর্ট-ছিলনা ভিসা। কিন্তু কিভাবে সে গিয়েছিল? আরণ্যক এর প্রধান প্রিয় মামুন ভাই (মামুনুর রশীদ) এর সঙ্গে তখন পরিচয়। ময়ূর সিংহাসন দেখতে গিয়ে। তাকে যুবক বলল যেতে চাই। কিন্তু ভিসা-পটাসপাের্ট নাই। তিন বললেন কি করে সম্ভব? যুবক বলল, সীমান্ত পার হলেই তো চলে। তারপর আপনাদের গাড়িতে যাব কোলকাতা। তথাস্তু। আজকের কাগজের নাইমুল ইসলাম খান যুবককে কোন ভরসায় কিছু খরচ দিয়েছিলেন অফিস থেকে কে জানে? সল্টলেকে অবস্থান? গঙ্গা যমুনা নাট্যৎসবে অংশগ্রহণ। সেখান থেকে ফ্যাক্সে সংবাদ প্রেরণ। আহ সেই দিন। তারপর পার্ক স্ট্রীটে নিউ ইয়ার পালন দেখা।

সিদ্ধান্ত নেয় যুবক নচিকেতার সঙ্গে দেখা করবে। ইটিভি বাংলার অফিসের ঠিকানা জেনে নেয় সে। ব্রেসব্রীজ। চলে যায় সেখানে। বাসে তার পাশে বসা অপরুপ মায়াবী কিশোরীর কথা আজও ভুলতে পারেনা সে। তারপর ইটিভি বাংলা। নচিকেতা। মেকাপ রুমে সে। একটু পরেই সেটে যাবে সে।
যুবকের পরিচয় হল নীলাঞ্জনা যার প্রথম প্রেম ছিল তার সঙ্গে। নচিকেতা বললেন, চল বাঙ্গালী বাবু প্রােগ্রামের দর্শক হবি। সামনাসামনি নচিকেতার উপস্থাপনা। তার গান শোনা। অনিরবচনীয় সে অভিজ্ঞতা আজো বুদ করে রাখে ৪০ পার হয়ে যাওয়া যুবককে। এখন তার পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া কন্যা শোনে নচিকেতার গান।
আর কখনো দেখা হয়নি সেই যুবকের নচিকেতার সঙ্গে। দুবার শুধু ফোনে কথা হয়েছে। যাদবপুরে নচিকেতার চায়ের দোকানে গেছ যুবক। সে ভাবে খুব শিগগির দেখা হবে তার নচিকেতার সঙ্গে। স্ত্রী-কন্যা-পুত্র সমেত। কিংবা দেখা হবে হঠাৎ বৃষ্টিতে একদম একা। আজকের যুবক তার সঙ্গে বলবে ১৬ বছর আগের স্মৃতি। তার মন বদলে দওয়ার স্মৃতি।নচিকেতা হয়ত হাসবেন। গেয়ে উঠবেন হয়ত, আজ থেকে একহাজার/ শীতবসন্ত শেষ সেই পথে …। হয়তবা যুবকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবেনা নচিকেতার। তার মনে থেকে যাবে ২০০২ এর দর্শন এবং সময় কাটানোর স্মৃতি। সেই যুবক হয়ত ইটিভি বাংলার সে সময়ের ফুটেজ বের করবে। কিংবা যুবকের চির প্রস্থানের পর সেই ফুঁটেজ বের করবে তার কন্যা বা পুত্র। তারা বলবে নচিকেতার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আর কথা হয়েছিল তার বাবার।
শুভ জন্মদিন প্রিয় নচিদা। ৯২-৯৩ কিংবা ‘০২ এর কোলকাতার স্মৃতিমেশা প্রিয় নচিকেতা।

লেখক:  নির্বাহী সম্পাদক, আজ২৪.কম


%d bloggers like this: